বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, যুগের পর যুগ যারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, সংগ্রাম করছে কেবলমাত্র তাদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব যে স্বাধীনতার মূল্য কতখানি। এ প্রসঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গ টানেন এবং বলেন, আমরা যদি আশপাশে তাকাই তাহলেই বুঝতে পারবো যে স্বাধীনতার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য কতখানি। ফিলিস্তিনের মানুষ। লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে আমরা ২০২৪ সালে দেশ এবং স্বাধীনতা রক্ষা করেছি।

গতকাল শুক্রবার ঢাকার রমনার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারলে কাক্সিক্ষত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে উন্নয়ন সম্ভব উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়া যাবে। সরকারকে গণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সমাজের একটি অংশ নয়, সবার কল্যাণ নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। স্বাধীনতা দিবসে এ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।।

তিনি বলেন অতীতকে নিয়ে পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ আর অতীতকে ভুলে গেলে আমাদের দু চোখ’ই অন্ধ। তাই অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে যেমন চলবে না, তেমনি অতীত পুরোপুরি ভুলে গেলেও ভবিষ্যৎ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিকট অতীতেও আমরা দেখেছি অতীত নিয়ে এতো বেশি চর্চা হয়েছে যে, এটা আমাদের সামনে যে ভবিষৎ আছে সেই ভবিষৎকে বাধাগ্রস্থ করবে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা চলবে। তবে আলোচনা সমালোচনা কিংবা গবেষণার নামে এমন কিছু বলা উচিত নয়, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব বা ইতিহাসকে খাটো করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে শহীদ জিয়ার অবদানের কথাও স্মরণ করে বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার স্বপ্ন লালন করতেন। তার দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ও ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধ তা প্রমাণ করে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত এই নিবন্ধে তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে স্বাধীনতার ঘোষণার ঘটনা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে। সেটি প্রকাশের পর কোনো আপত্তি ওঠেনি। ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত একটি জাতির জন্ম শিরোনামের প্রবন্ধ নিয়েও তৎকালীন সরকার বা অন্য কারও আপত্তি ছিল না বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদান এবং তার কাজকে যেভাবে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে; এর থেকেই প্রমাণ হয় যে, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একজন অনিবার্য্য চরিত্র।

তারেক রহমান উল্লেখ করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হঠাৎ করেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। শহীদ জিয়া প্রথম জীবনে রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তিনি একজন সামরিক সৈনিক ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্¦প্ন যে তিনি আগে থেকেই মনের মধ্যে লালন করতেন; সেটি কিন্তু তার একটি লেখায় ফুটে উঠেছে। স্বাধীনতার চিন্তা এবং চেতনা যে তিনি ধারণ করতেন, একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে তার একটা দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ছিল সেটি আমরা তার একটি লেখা থেকেই পরিস্কারভাবে বুঝতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই গৌরবগাঁথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে গবেষণা ও আলোচনা চলবে, এটাই স্বাভাবিক। আলোচনা বা গবেষণার নামে এমন কিছু করা উচিত নয়, যা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে খাটো করে। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অনিবার্য চরিত্র শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। অতীতে তার অবদানকে খাটো করার চেষ্টা করা হলেও ইতিহাসে তার ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দীর্ঘদিন ধরে লালন করতেন। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত ওই প্রবন্ধে স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তারেক রহমান বলেন, ২৬ মার্চ ১৯৭১ রাত ২টা ১৫ মিনিট এই সময়টি শহীদ জিয়ার লেখায় উল্লেখ আছে, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে।

স্বাধীনতার মূল্য কেবল তারাই বুঝতে পারে, যারা এর জন্য লড়াই করে। ফিলিস্তিনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বছরের পর বছর এমনকি যুগের পর যুগ যারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, সংগ্রাম করছে কেবল মাত্র তাদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব যে স্বাধীনতার মূল্য কতখানি। স্বাধীনতার গুরুত্ব আজও বিশ্বে প্রাসঙ্গিক। ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের বিভিন্ন আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, সব সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।

বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণসহ কর্মসংস্থানের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য। দেশ গঠনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই, তাহলে অবশ্যই একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষকে নিয়ে সহাবস্থানের মাধ্যমে ভালোকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ কোনো এক দলের নয়, এটি ছিল 'জনযুদ্ধ'। লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা রক্ষা সবার দায়িত্ব। আমাদের আকাক্সক্ষা সীমাহীন হলেও সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে যদি আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করি, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হোক ‘সমাজের একটি অংশ নয়, আমরা সবাই মিলে ভালো থাকবো’। আমরা সবাই মিলে ভালো থাকার চেষ্টা করবো এবং ভালো থাকবো ইনশাআল্লাহ।

দুপুর ৩টায় পবিত্র কুরআন থেকে তেলওয়াতের মাধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা শুরু হয়। দোয়া পরিচালনা করেন, জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সভাপতি মাওলানা নেসারুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, বিএনপি মহাসচিব স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সঞ্চালনা করেন প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম প্রমুখ।

আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে রুখে দিতে হবে। এদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না। তারা আজ ভিন্ন মোড়কে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ওপর যেকোনও আঘাত মোকাবিলায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, সব ষড়যন্ত্র ও অপশক্তিকে পরাজিত করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক। একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করতে না পারলে, সেই জাতি সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার ইতিহাস অন্য কোনও ইতিহাসের সঙ্গে মেলানোর সুযোগ নেই। অনেকে সংবিধানের প্রস্তাবনায় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরকে সমান করতে চেয়েছিলেন। আমরা মনে করি, একাত্তরের ইতিহাস অনন্য ও অবিসংবাদিত।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান কৃষকদের হাতে কার্ড তুলে দিচ্ছেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সমৃদ্ধি আনার চেষ্টা করছেন। কর্মসংস্থান ও শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।