সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ এবং নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন বাস্তবায়নের দাবিতে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ঢাকা মহানগর ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদের নেতৃত্বে মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহবাগে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।

বিক্ষোভোত্তর সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের ৯ দফা দাবির অন্যতম ভিত্তি ছিল এদেশে ছাত্র রাজনীতি হবে ছাত্র সংসদ ভিত্তিক। যারা মব তৈরি করে বা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করতে চায়, তারা মূলত জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এদেশের নির্বাচনবিরোধী শক্তি ভারত ও আওয়ামী লীগের সাথে সুর মিলিয়ে বিএনপি ও ছাত্রদল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ছাত্র সমাজ ও জুলাই প্রজন্মের বিপক্ষে নিজেদের দাঁড় করিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শাকসু আয়োজনের দাবি জানান তিনি।

সমাবেশে কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক মু'তাসিম বিল্লাহ শাহেদী বলেন, "বিএনপি সবসময় ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ভয় পায়। তিন তিনবার ক্ষমতায় এসেও তারা কোনো নির্বাচন দেয়নি, আর এখনো তারা একই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

সমাবেশে কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ছাত্রদলের দ্বিমুখী আচরণের সমালোচনা করে বলেন, মানুষের ভোটাধিকার আদায়ের জন্য ছাত্রদলের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস থাকলেও, বর্তমানে তারা পরাজয়ের ভয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এটি জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। মববাজি আর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র জুলাই প্রজন্ম কোনোভাবেই মেনে নিবে না। একদিকে নির্বাচন কমিশনের সামনে মব তৈরি , অন্যদিকে বিএনপিপন্থী আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন বন্ধের অভিযোগ করেন তিনি।

বিক্ষোভ মিছিলে আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় এইচআরএম সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, শিক্ষা সম্পাদক মুহাম্মদ ইব্রাহিম, শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পাদক হাফেজ আবু মুসা, অর্থ সম্পাদক আনিসুর রহমান এবং গবেষণা সম্পাদক ফখরুল ইসলাম। সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি ও জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, ডাকসু এজিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি মুহা. মহিউদ্দিন। সঞ্চালনা করেন ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপত ও ডাকসুর পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ। এছাড়াও ঢাকা মহানগরী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্ররা এই মিছিলে অংশগ্রহণ করেন।

এর আগে সকালে নির্ধারিত সময়ে শাকসু নির্বাচনের দাবিতে প্রেস ব্রিফিং করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ প্রেস ব্রিফিংয়ে কেন্দ্রীয় সভাপতি লিখিত বক্তব্য দেন।

শিবির সভাপতি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের সবচেয়ে বড় আকাক্সক্ষা ছিল প্রতিটি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সে লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে নিয়মিত ও কার্যকর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা।

তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি দেশের ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র সংসদের ইতিবাচক ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকার ফলে ওই ক্যাম্পাসগুলোতে আবাসন সংকট নিরসন, পরিবহন সমস্যার সমাধান, মাদক ও বহিরাগত মুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, ডাইনিংয়ের খাবারের মানোন্নয়ন এবং একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য হলের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যাপকভিত্তিক কাজ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ ছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা, লাইব্রেরির পাঠ-পরিবেশকে আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মেধা বিকাশে নানাবিধ ছাত্রকল্যাণমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশে যতগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেখানে এমন গঠনমূলক কার্যক্রম দেখা যায়নি। এসব ইতিবাচক ও দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখে প্রতিটি ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ছাত্র সংসদের আকাক্সক্ষা তীব্রতর হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীরাও তাদের কাক্সিক্ষত প্রতিনিধিত্ব নির্বাচিত করতে এবং ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তাদের প্রবল দাবির প্রেক্ষিতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ছাত্রদল পরাজয়ের ভয়ে বারবার নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। আপনারা দেখেছেন, এভাবে তারা প্রতিটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধের জন্য অপচেষ্টা চালিয়েছে।

নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কার্যক্রম প্রভাবমুক্ত রাখতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত ১২ জানুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পেশাজীবী ও সংগঠনের নির্বাচন আয়োজন না করার নির্দেশ দিলেও শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পূর্বঘোষিত তারিখেই শাকসু নির্বাচন আয়োজনের অনুমোদন দেয় ইসি।

তিনি বলেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নির্বাচন বন্ধের দাবিতে ইসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। অন্যদিকে এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গতকাল নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক দাবিকে উপেক্ষা করে নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ও লেজুড়বৃত্তির উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই তারা এই জনবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। এটি শুধু শাবিপ্রবি নয়; বরং সারা দেশের শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের মূলে কুঠারাঘাতের শামিল।একদিকে তারা শিক্ষার্থীদের প্রতিটি গণতান্ত্রিক পদক্ষেপে বাধা দিচ্ছে, অন্যদিকে ক্যাম্পাসে আধিপত্যবাদী ও পেশিশক্তি নির্ভর ছাত্ররাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সাকিব হত্যাকা- থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসগুলোতে মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাজনীতির কারণে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে আজ প্রত্যাখ্যাত। নিজেদের পরাজয় ও গ্লানি থেকে শিক্ষা না নিয়ে তারা এখন পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বন্ধের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘ ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে, যে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন; অথচ আজ ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান করছে। তাদের কর্মকা- দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তারা মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও কার্যত শিক্ষার্থী মতামত ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা করে না। এটি তাদের দ্বিচারিতা এবং ছাত্রসমাজের প্রতি চরম উপহাস। তারা মূলত শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটকে ভয় পায় বলেই আজ নির্বাচন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি আজ নির্বাচন বানচালের জন্য আন্দোলন করছে।

এমন পরিস্থিতিতে পেশিশক্তির জোরে কিংবা আদালতকে ব্যবহার করে এই নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা করা হলে শাবিপ্রবির ৯ হাজার শিক্ষার্থীসহ সচেতন ছাত্রসমাজ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। আমাদের দাবি স্পষ্টÑশাকসু নির্বাচন নির্ধারিত তারিখেই অর্থাৎ আগামীকালই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ, হুমকি কিংবা পেশিশক্তির কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিঘœ ঘটানো হলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা এবং একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন উপহার দেওয়া। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি ‘শাকসু’ নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে ছাত্রশিবির কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

এসময় অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, এইচআরএম সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক হাফেজ ডা. রেজওয়ানুল হক, কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।