ইসির এ ধরনের অভিজ্ঞতা নেই এটি চ্যালেঞ্জিং: সিইসি

একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন করা নিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশন চ্যালেঞ্জে রয়েছে। ইসি কখনো এভাবে বড় ধরনের দু’টি ভোটের আয়োজন করেনি। এটি তাদের জন্য নতুন এবং প্রথম। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজনের মতোই আরেকটি আয়োজন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রস্তুতি ও জনবলও প্রায় দ্বিগুণ লাগবে। গণভোটের বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি আইনের অধ্যাদেশ উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন দিয়েছে। শিগগিরই তা গেজেট আকারে জারি হবে। আইনের বিধান কী ধরনের হবে তার উপর নির্ভর করে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে ইসি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আলাদা দিনে করলে ভালো হবে এবং সুশৃংখল হবে। অন্যথায় বিশৃংখলা হওয়ার আশঙ্কা করছে বিশেষজ্ঞগণ। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ দল ভোটের আগেই গণভোট আয়োজনের জন্য দাবি জানিয়ে আসছে।

সূত্রমতে, ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে একসঙ্গে আয়োজনের জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশন-ইসিকে চিঠি দিয়েছে। সেই সাথে গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি আইন উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন দিয়েছে। আইনে জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট থেকে পৃথক ব্যালট তৈরী করা, একই ধরনের সিল ব্যবহার করাসহ বেশকিছু বিশেষ বিধান করা হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, আইনের গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর ইসি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোটের আয়োজনের বিষয়ে বড় ধরনের প্রস্তুতির বিষয় রয়েছে। ইসি এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এই চ্যালেঞ্জ উত্তীর্ণ হতে না পারলে বড় ধরনের বিশৃংখলা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্রমতে, নির্বাচনের দিনে গণভোট করতে হলে ইসিকে ভোটদানের সময় বাড়াতে হবে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটের যে সাধারণ সময়সীমা, সেই সময়ের মধ্যে কি ভোট শেষ করা যাবে কী না তা ভেবে দেখতে হবে। ভোট গণনায় কত সময় লাগবে। অতীতে যেমন ভোটগ্রহণের পরদিন সকালের মধ্যেই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে, এবার একই দিনে গণভোট হওয়ায় সেই সময়ের মধ্যে কি জাতীয় নির্বাচনের ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা যাবে কি না ? এ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করতে হবে। আর কোন প্রক্রিয়ায় ভোটগ্রহণ ও গণনা করা হবে? এজন্য নির্বাচন গ্রহণকারীদের যে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, সেটি কি আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে সম্পন্ন করা যাবে কি না? এটি একটি বড় ধরনের প্রস্তুতির বিষয়। অপরদিকে প্রতিটা বুথে কী দুটি করে টিম কাজ করবে? তাহলে বুথে কর্মীর সংখ্যা হবে প্রায় দ্বিগুণ। এত জনবল নির্বাচন কমিশন দিতে পারবে কী না? বলা হচ্ছে, বিগত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন, এমন লোকদের এবার দায়িত্ব দেয়া হবে না। ওই জনবল বাদ দিয়ে কি একই দিনে জাতীয় সংসদ ও গণভোটের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মতো পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নির্বাচন কমিশনের আছে বা এই সময়ের মধ্যে তাদের প্রশিক্ষিত করা যাবে? এ বিষয়গুলো ভাবতে হবে। একই দিনে দুটি নির্বাচন হলে এর গণনার পদ্ধতি কী হবে এবং কোন নির্বাচনের ফলাফল আগে ঘোষণা করা হবে, জাতীয় নির্বাচনের নাকি গণভোটের? আর যদি কোথাও বিশৃংখলা দেখা দেয়, ভোট বাতিল করতে হয়, তখন গণভোটের কী হবে? এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ভাবতে শুরু করেছে। তবে অনেক বিষয়ের সহজ সমাধান পাওয়া যাবে আইনে। গণভোটের আইনটি গেজেট আকারে জারি হওয়ার পর এসব বিষয় নিয়ে ইসি পুরোদমে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করা চ্যালেঞ্জিং বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে হবে, একই রিসোর্স ব্যবহার করে। এটা আগে ছিল না। আগের কোন কমিশনকে এই চ্যালেঞ্জ দিতে হয়নি। এটার জন্য অনেকগুলো অতিরিক্ত কাজ করতে হবে। কিন্তু গণভোটটা আমাদের আয়োজন করতে হবে। আমরা একইদিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করব, কারণ আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। আইনি ক্ষমতা পেলেই গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করবেন বলে তিনি জানান।

গতকাল উপদেষ্টা পরিষদে গণভোটের অধ্যাদেশ অনুমোদন হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উভয় ক্ষেত্রে পোস্টাল ব্যালট থাকবে। জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট হবে সাদা কাগজের ওপর কালো প্রতীক। আর গণভোটের ব্যালট হবে রঙিন কাগজের ওপর দৃশ্যমান যেকোনো কালি।

তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরের পাঁচ তারিখের মধ্যে ভোটার তালিকা কমপ্লিট হয়ে যাবে। ৫ তারিখের আগেই যে ভোটার তালিকা পাব, সেই তালিকা অনুযায়ী নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাব। আর অন্যান্য যে দ্রব্যাদি, যেমনÑ লোগো, ব্যালট বক্স, আঙুলের অমোচনীয় কালি, স্টাম্পপ্যাড এগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত আছে। শেষ যে স্টক আমরা পেয়েছি, সেটাও এখন আমাদের দখলে আছে। আমরা এটা ক্রমাগতভাবে আস্তে আস্তে বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেব, যাতে শেষের দিকে চাপ না পড়ে।

তিনি আরও বলেন, প্রথাগতভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাদা পৃষ্ঠার ওপরে কালো প্রিন্টের ব্যালট পেপার হয়। এক্ষেত্রে আমরা একটা রঙিন কাগজ ব্যবহার করব গণভোটের জন্য। রঙিন কাগজের ওপরে যেটা দৃশ্যমান হয়Ñ কালো যদি দৃশ্যমান হয়, সেই দৃশ্যমানতা অনুযায়ী আমরা ব্যালট পেপারটা করব।

সূত্র জানায়, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে বলে ইসিকে অতিরিক্ত ব্যালট বাক্সেরও ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে ইসির সংগ্রহে ৩ লাখ ৪০ হাজারের মতো ব্যালট বাক্স রয়েছে। সংসদ নির্বাচনে সাধারণত ২ লাখ ৮৮ হাজারের মতো ব্যালট বাক্স লাগে। সে হিসেবে ৫০ হাজারের বেশি ব্যালট বাক্স অতিরিক্ত আছে। বুথ ৪০ থেকে ৪২ হাজার বাড়ালেও প্রভাব পড়বে না।

সূত্র আরো জানায়, একটি ব্যালট বাক্সে ১৫০০-এর মতো ব্যালট পেপার রাখা যায়। সংসদ নির্বাচনের ব্যালট হবে আগের মতোই সাদা-কালো। গণভোটের জন্য সবুজ বা গোলাপি রঙের ব্যালট ছাপানোর চিন্তা করা হচ্ছে। তবে বিধিমালা ঠিক হলে এটি চূড়ান্ত করবে কমিশন। সোমবার ডাক বিভাগের সঙ্গে পোস্টাল ভোট নিয়ে বৈঠক করেছে ইসি। একই সিরিয়াল নম্বরের সংসদ ও গণভোটের ব্যালট পেপার যেন একসঙ্গে থাকে ডাক বিভাগকে সেই নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন।

সূত্র জানায়, প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটের প্রাপক জেলা প্রশাসককে করা হবে না। যিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকবেন তাঁর দপ্তরে এই ব্যালট আসবে। যেসব জেলায় বেশি সংসদীয় আসন রয়েছে, সেখানে একাধিক রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগের চিন্তা করছে কমিশন।

তফসিল ঘোষণার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ২৭ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর প্রধানদের সঙ্গে এবং ৩০ নভেম্বর সচিব ও বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে ইসি। ওই বৈঠকে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল তৈরিসহ সার্বিক বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেবে ইসি।

সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোটের আয়োজন করা হলে গণভোট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ দলই এ সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেছে। এ বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মতামত প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামী নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের বলেছেন, একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হলে জাতীয় নির্বাচন বেশি গুরুত্ব পাবে। এতে গণভোটের গুরুত্ব কমবে। মানুষের মনোযোগের অভাবে গণভোটে যদি ভোট কম পড়ে, তাহলে যারা সংস্কার চাইছে না তারা বলবে, যেহেতু ভোট কম পড়েছে, জনগণ গণভোট চায়নি বলে বিবেচিত হোক। এর মাধ্যমে তারা সংস্কার থেকে সরে আসবে।

খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আবদুল বাছিত এ বিষয়ে বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত যথার্থ নয়। এতে সনদ বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হবে। একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে। এতে সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আরও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক মনে করেন, একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট করলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ঝুঁকিতে থাকবে। একই প্রশ্নের মধ্যে আলাদা আলাদা চারটি অংশ রেখে গণভোটকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। এর মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতিও ঝুঁকিতে পড়েছে।

তিনি বলেন, দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট একত্রে অনুষ্ঠিত হলে জনগণের মনোযোগ বিভ্রান্ত হবে। গণভোটের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো মানুষ যথাযথভাবে বুঝে মত প্রকাশ করতে পারবে না। এতে গণভোটের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিঘিœত হবে।