জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই : মন্ত্রী
জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি, খোলা বাজারে বিক্রি ও পাচার রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের প্রেক্ষিতে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের সংকট সৃষ্টির লক্ষ্যে অবৈধভাবে মজুদ করছে মর্মে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ সংকট নিরসনে ইতোমধ্যে সরকার যানবাহনভিত্তিক তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। তথাপি পেট্রোল পাম্প/ ফিলিং স্টেশনে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রয়, অধিক মুনাফার লোভে অতিরিক্ত মজুদ, খোলা বাজার বিক্রি, পাচারের প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে’।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘দেশে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
কিন্তু তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সময় যত গড়াচ্ছে, পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের লাইন। আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করে বৃহস্পতিবার থেকে। ওই দিন অনেকেই গাড়ির ট্যাংকি ভর্তি করে নিতে থাকেন। এতে বাড়তি চাপে সংকটের শঙ্কায় তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। আপাত দৃষ্টিতে সমাধান মনে হলেও এতে অনেকেই বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ একবার তেল নিয়ে আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।
আতঙ্কিত লোকজনের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে দেখা গেছে। অনেক জায়গা থেকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি তেলের জন্য অপেক্ষমান গাড়ির লাইন প্রধান সড়কজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকায় অসহনীয় যানজট দেখা গেছে নগরজুড়ে।
গতকাল রাজধানীতে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। সিটি ফিলিং স্টেশন, তেজগাঁও, ক্লিন ফুয়েল, তেজগাঁও, পিওপিএলসি, ইউরেকা ফিলিং স্টেশন, মহাখালী, জেওসিএল পাম্পে সকল নিয়ম মেনে তেল সরবরাহ চালু আছে। আরএস এন্টারপ্রাইজ, তেজগাঁও, এমপিএল এ গতকাল (৭ মার্চ) রাত থেকে তেল নেই। রয়েল ফিলিং স্টেশন, তেজগাঁও, এমপিএল, তশোফা ফিলিং স্টেশন এ তেল নেই। সোহাগ ফিলিং স্টেশন মহাখালী ৩৫০০ লিটার অকটেন স্টোর করে রেখেছিলো, পরিমাপ নিয়ে পুনরায় চালু করা হয়। তেল মজুত আছে, কিন্তু রেশনিং করে চলতে হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০তম কারাবন্দি দিবস উপলক্ষে উত্তরাঞ্চল ছাত্র ফোরাম এ সভার আয়োজন করে।
মন্ত্রী বলেন, সব একেবারে না খেয়ে, চলার মতো ব্যবস্থা করে যদি একবার চলি, তাহলে আমরা দীর্ঘদিন চলতে পারবো। আমাদের তেল মজুত আছে, কিন্তু রেশনিং করে চলতে হবে। অলরেডি আজ বেলা ১১টায় একটা জাহাজ নোঙর করেছে। আরেকটা জাহাজও নোঙর করার কথা। জাহাজগুলো থেকে তেল ডেলিভারি করার পরে আমার মজুত আরও বাড়বে। কিন্তু এর অর্থ এই না যে, আমরা যত ইচ্ছে তত ব্যবহার করবো। রেশনিং পদ্ধতি আমরা চালিয়ে যাবো।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আমরা একটা ভঙ্গুর এবং ঋণে জর্জরিত একটি বাংলাদেশ পেয়েছি। আমরা এমন এক সময়ে এসে সরকার গঠন করেছি, তার কয়েকদিন পরেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। জ্বালানির উৎপত্তিস্থল হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। আমি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছি, এখন প্রতিদিন আমাকে জবাবদিহি করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, পেট্রোল পাম্পের পাশে বিশাল লাইন দেখা যায়। আমরা বলেছি, যেহেতু যুদ্ধ লেগেছে এবং যুদ্ধকালীন অবস্থার মধ্যে বসবাস করছি, যেখান থেকে পেট্রোলিয়াম আসে, সেখানে যুদ্ধ লেগেছে। এই যুদ্ধ কতদিন চলবে জানি না। তবে, আমার কাছে যে মজুত আছে, সেটা সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করার জন্য জনগণের কাছে আহ্বান জানিয়েছি। আমরা রেশনিং শুরু করেছি।
বিদ্যুৎ নিয়ে তিনি বলেন, সেহরি এবং তারাবির সময় কোনো লোডশেডিং হবে না। মাত্র ২০ দিন হয়েছে আমরা ক্ষমতায় এসেছি, একটা ভঙ্গুর অবস্থায় দেশকে পেয়েছি এবং ৭৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। সেই সিস্টেমকে আমরা ইনশাআল্লাহ এখনো ভালো রেখেছি। ভবিষ্যতেও এই সিস্টেম ভালো থাকবে। এর জন্য আমরা জনগণের সহযোগিতা চাই।
বিরোধীদল আতঙ্ক ছড়িয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, হয়তো এই যুদ্ধের কারণে আমরা বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেবো। আমি আশ্বস্ত করেছি, আপাতত আমরা বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছি না।
পেট্রোল পাম্পে পুলিশ চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি :
এদিকে জ্বালানি তেল বিপণনে ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশি টহল জোরদার করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।
রোববার পাঠানো এ চিঠিতে বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেল বিপণনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে ডিলাররা বিগত সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তাছাড়া কিছু কিছু ভোক্তা ডিলার/ফিলিং স্টেশন থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন বলে খবর প্রকাশ হচ্ছে।
এরইমধ্যে ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তা প্রান্তে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সীমিতকরণ করে বিপিসি থেকে একটি প্রেস রিলিজ জারি করা হয়েছে। এছাড়াও বিদ্যমান সংকটকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের ক্রেতাদের সঙ্গে ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদের বিভিন্ন ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা সৃষ্টি হচ্ছে। সে প্রেক্ষিতে দেশের ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে পুলিশি টহল জোরদার করা প্রয়োজন।
এমতাবস্থায়, দেশের সব ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশি টহল জোরদার করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।