বিতরণ লাইনের ৬০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ
৬০ বছরের পুরনো জংধরা পাইপে সরবরাহ করা হয় গ্যাস
আলোর মুখ দেখেনি লাইন মেরামত প্রকল্প
জরাজীর্ণ লাইন,অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সংযোগের কারণে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে করে প্রাণহানি যেমন বাড়ছে তেমনি বিস্ফোরণ ঘটে গ্যাসের আগুনে পুড়ছে মানুষ। গ্যাস দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটছে তিতাসের গ্যাস লাইনে। গ্যাসের এই বৃহৎকোম্পানীর সংযোগ লাইন দীর্ঘ দিনের পুরোনো। পরিসংখ্যান বলছে, তিতাসের বিতরণ লাইনের ৬০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। তিতাসের ২৮ লাখ ৭৭ হাজার গ্রাহক নিজেরাই জানে না কে কখন গ্যাসের আগুনের দগ্ধ হয়।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন সেবা সংস্থার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, পুরোনো লাইন এবং মেরামতের অভাবে শুধু রাজধানীতে প্রতি মাসে তিতাস গ্যাস বিতরণ লাইনে ছিদ্র হয় ৪০০ এর বেশি। এছাড়া অবৈধ লাইন নিতে ঢাকায় ছিদ্র আছে কয়েক হাজার। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ নরসিংদী, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানের একই চিত্র। তবে পুরো তিতাস নেটওয়ার্কে কি পরিমাণে ছিদ্র বা ত্রুটি আছে তার কোনো হিসাব নেই।
সর্বশেষ গত ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর আগারগাঁও এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে পৃথক গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের ছয় সদস্যসহ ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। দগ্ধদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।
আগারগাঁওয়ে একটি টিনশেড ঘরে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের ছয়জন এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরে বহুতল ভবনের নিচতলায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন।
বার্ণ ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান জানান, তাঁদের শরীরের ২০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে।
তিতাসের সূত্র বলছে, ‘মাটির নিচে থাকা দীর্ঘ ৬০ বছরের পুরনো পাইপগুলোতে জংধরে লিকেজ সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে রাস্তার সংস্কার ও মেরামত কাজের সময়ও তিতাসের পাইপ লিকেজ হয়েছে। বিতরণ লাইনে কোথাও লিকেজ হওয়ার খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে তা মেরামত করা হয়।
রাজধানীতে অগ্নিকান্ড, বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে প্রায় দেখা গেছে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিস্ফোরণ, দুর্ঘটনার জন্য এ কারণগুলোকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয় তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষত, রাজধানীজুড়ে কয়েক দশকের মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাসের লাইন, অবৈধ উপায়ে গ্যাস নিতে গিয়ে লাইনকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রাখায় এসব দুর্ঘটনা ঘটছে।
দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল)। সংস্থাটির গ্যাস সরবরাহের এলাকা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ। সংস্থাটির আওতায় শিল্প, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটি ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করছে।
তিতাসের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, যেসব পাইপলাইনে তিতাস গ্যাস সরবরাহ করছে, তার বেশির ভাগের মেয়াদ ছিল ৩০ বছর। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার ১০ বছর অতিক্রান্ত হলেও ওই সব পাইপলাইন না বদলিয়ে,তাতেই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যে কারণে গ্যাসের ব্যবহার কমলে তার চাপ পাইপলাইনের ওপর পড়ছে। আর সেই চাপ নিতে না পারায় যেসব এলাকায় গ্যাসের লিকেজ রয়েছে তা দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসছে।
সূত্র বলছে, ‘গ্যাসের ওভার ফ্লো এর আগেও ঘটেছে। তবে তা বৃহৎ আকারে ঘটেনি। এগুলো টেকনিক্যাল মেইনটেন্যান্স ব্যাপার। তবে এখন বড় যেসব ঘটনা ঘটছে তার জন্য দায়ী পুরনো পাইপলাইন অপসারণ না করা। এছাড়া রাজধানীতে পুরনো লাইনের ক্ষতি বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের মাটি খোঁড়াখুঁড়ির কার্যক্রম। এসব অবকাঠামো নির্মাণের কারণে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সুত্র জানায়, রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা তিতাস গ্যাসের ৬০ শতাংশের বেশি পাইপলাইনের টেকনিক্যাল লাইফ শেষ হয়ে গেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ায় বিতরণ লাইনগুলো এখন গ্যাসের চাপ নিতে পারছে না। এজন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মাটির নিচ থেকে প্রায়ই গ্যাস বের হতে দেখা যাচ্ছে। পাইপের বিভিন্ন স্থানের ছিদ্র দিয়ে ধীরে ধীরে গ্যাস বের হয়ে আশপাশের শূন্যস্থানে জমা হচ্ছে। আগুন, উচ্চতাপ বা অন্য কোনো গ্যাসের সংস্পর্শে এলেই ঘটছে বিস্ফোরণ। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন পরিবর্তন না করতে পারলে গ্যাস থেকে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তারা।
তিতাস সূত্রে জানা গেছে, বৃহত্তর ঢাকা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকায় ১৩ হাজার ১৩৮ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে ২৮ লাখ ৭৭ হাজার ৬০৪ জন গ্রাহককে গ্যাস সরবরাহ করে সংস্থাটি। এর মধ্যে আবাসিক সংযোগ আছে ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৮টি। গত অর্থবছরে ঢাকার ১ হাজার ৬৮২ কিলোমিটার পাইপলাইনের মান কোন পর্যায়ে আছে, এর ওপর একটি জরিপ করেছে তিতাস। এতে পাইপলাইনের ওপর ৯ হাজার ৯২৬টি স্থানে গ্যাসের উৎস (মিথেন) শনাক্ত হয়। যার মধ্যে ৪৫৯টি ছিদ্র ধরা পড়ে, যা সংস্কার করা হয়। পাইপলাইনে ছিদ্র রয়েছে কিনা, সেটি একধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। এজন্য পাইপলাইনের ওপর দিয়ে যন্ত্রটি চালিয়ে নেয়া হয়।
২০২১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে একটি মসজিদের নিচে গ্যাস পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে গ্যাস জমে বিস্ফোরণের পর অগ্নিকান্ডে মারা যান ৩৪ জন। এরপর গ্যাস বিতরণ লাইনে ১ হাজার ৬২২টি ছিদ্র শনাক্ত করার কথা জানায় তিতাস। পরে ওইসব ছিদ্র মেরামত করা হয়। গত অর্থবছরে তিতাসের জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অভিযোগ আসে ৬ হাজার ৮৬২টি, এর মধ্যে গ্যাসের পাইপলাইনে ছিদ্রের ঘটনা ৪ হাজার ৮৯১টি। আর অগ্নিদুর্ঘটনার ঘটনা ৩১১টি। কয়েক বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন পুনরায় বসানোর আলোচনাও চলছে।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ্ আল আরেফীন জানান, তিতাসের নির্দিষ্ট একটা পরিকল্পনা যদি থাকে তাহলে আমরা দুর্ঘটনা রোধ করতে পারি। পাশাপাশি সবাইকে সচেতন হতে হবে। চোরাইভাবে বা অবৈধ সংযোগ নেয়া যদি বন্ধ করা যায় এবং নিয়ম অনুযায়ী যদি আবেদন করে মানুষ বৈধভাবে গ্যাসের সংযোগ নেয় তাহলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব।
বুয়েটের অধ্যাপক রাজিয়া সুলতানা জানান, গ্যাস দুর্ঘটনা কমানোর একমাত্র রাস্তাই হচ্ছে নিয়মিত তদারকি করা। গ্যাসের লাইন ঠিক রাখা, দেখা, চেক করা। বারেবারে দেখা যে এগুলো ঠিক আছে কিনা। গ্যাস লিকেজ হলে যেন ধরা যায়, সেজন্য প্রাকৃতিক গ্যাসে গন্ধ যুক্ত করার কথাও বলেন তিনি।
এ বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, আগে গ্যাসের সঙ্গে গন্ধ মিক্সড হত, গ্যাস লিকেজ হলে আমরা গন্ধ পেতাম। এখন সেটা পাই না। গন্ধ না থাকার কোনো কারণ থাকতে পারে। ওই গন্ধটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর না। তারপরও বলব-গন্ধ পেলে এলার্ট হওয়া যায় । ঘরে যদি গ্যাস থেকে যায়, গন্ধ পাওয়া যায়, তাহলে আগুন জ্বালানোর মতো কাজ কখনোই না করার পরামর্শ দেন তিনি।
তিতাস গ্যাস কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের বিতরণ লাইনের অবস্থা ভালো নেই। নুতন ভাবে মেরামত না করা পর্যন্ত যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। তিতাসের আরেকজন কর্মকর্তা জানান, পুরো তিতাস নেটওয়ার্কে ১৩ হাজারও বেশি বিতরণ লাইন আছে। এই ১৩ হাজার লাইনে কি পরিমাণে ছিদ্র আছে তা বলা কঠিন। তবে ২০২৩ সালে মগবাজার, বাংলামোটরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিথেন গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল ওই সময়ে ১ হাজার ৬৮২ কিলোমিটার বিতরণ লাইন পরীক্ষা করে তিতাস ৪৫৯টি ছিদ্র পেয়েছিল।
আলোর মুখ দেখেনি লাইন মেরামত প্রকল্প
তিতাসের ৪০ বছরের বেশি পুরোনো লাইন পরিবর্তন করতে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে তিন বছর আগে।ওই প্রকল্পের আওতায় তিতাসের পুরোনো লাইন তুলে ২ হাজার ৭৮০ কিলোমিটার নতুন লাইন বসানোর কথা। যার জন্য খরচ হবে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা।
তিতাস জানিয়েছে, প্রকল্পটি বারবার পুনর্মূল্যায়ন হচ্ছে। যাতে এর খরচ এবং বাস্তবতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না উঠে। তবে কবে নাগাদ এটির টেন্ডার এবং কাজ শুরু হবে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।এর আগেও বিগত সরকারের সময় তিতাস ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। তিতাস উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব (ডিপিপি) পেট্রোবাংলায় জমাও দিয়েছিল। এ প্রকল্পটি যদি সম্পন্ন হতো তাহলে ঢাকায় ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি হতো তিতাসের। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২ থেকে ২০ ইঞ্চি পুরোনো পাইপলাইনের পরিবর্তে নতুন পাইপলাইন স্থাপন করার কথা ছিল । কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি।
কীভাবে বুঝবেন গ্যাস বের হচ্ছে
দেশের পাইপলাইনে যে গ্যাস সরবরাহ করা হয়, তা নাকে গেলে হালকা গন্ধ পাওয়া যায়। পাইপলাইন ছিদ্র হওয়া ছাড়াও গ্যাস নানাভাবে বের হয়ে আসতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো নিম্নমানের চুলা ও চুলায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাইপ থেকে গ্যাস বের হয়ে থাকে।
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা বলছেন, কোথাও গ্যাস বের হলে বাতাসে গন্ধ পাওয়া যায়। তবে সেটি তীব্র নয়। অনেকে এটি বুঝতেও পারেন না। পাইপলাইন ছিদ্র হয়ে গ্যাস বের হলে সেখানে যদি পানি থাকে তাহলে বুদবুদ দেখা যায়। এভাবেও বোঝা যায় গ্যাস বাইরে চলে আসছে। এ ছাড়া অনেক স্থানে নির্মাণকাজ করতে গিয়েও পাইপলাইন ছিদ্র করে ফেলে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বড় আকারে গ্যাস বাইরে এলে শোঁ শোঁ শব্দ হয়। কিন্তু ছোট আকারে ছিদ্র হলে গ্যাস যে পরিমাণ বের হয়, তা অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এ ধরনের কোনো চিহ্ন ও গন্ধ পেলে সঙ্গে সঙ্গে তিতাসের হটলাইনে কল করা উচিত গ্রাহকের। তাঁদের বক্তব্য হটলাইনটি দিনরাত সব সময় খোলা থাকে।
জরুরি সেবা পেতে কল করুন ১৬৪৯৬
তিতাস গ্যাস কোম্পানি এলাকায় যেকোনো তথ্য অনুসন্ধান বা অভিযোগের জন্য ১৬৪৯৬ এই হটলাইন নম্বরে কল করা যাবে। এই নম্বরটিতে কল করলে রাত–দিন ২৪ ঘণ্টার যেকোনো সময় সেবা পাওয়া যাবে। ঢাকার জন্য জরুরি সেবা দিতে ২৪টি ‘ইমার্জেন্সি’ টিম রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময় তিতাসের হটলাইন নম্বরে কল দেওয়ার হার বেড়ে গেছে। প্রতিদিন এখন গড়ে ৩০০ কল আসছে খোদ রাজধানী এলাকায়।