শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন ও বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে ১১ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে প্রক্সি ভোটের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (এএফইডি)। একইসঙ্গে কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই ব্যালট গণনা শুরুর ঘটনাও তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

গতকাল শনিবার সাংবাদিক সম্মেলন করে সংস্থাটি এসব তথ্য তুলে ধরে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত এই পর্যবেক্ষণে এএফইডি মোট ৫৩ জন পর্যবেক্ষক নিয়োজিত করে। এর মধ্যে ৩০ জন বগুড়া-৬ এবং ২৩ জন শেরপুর-৩ আসনে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে এএফইডির মুখপাত্র হারুন-অর-রশিদ বলেন, সামগ্রিকভাবে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন। অধিকাংশ কেন্দ্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনেই ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং ব্যালট বাক্স খালি দেখিয়ে সিল করা হয়। ভোটের গোপনীয়তাও মোটামুটি বজায় ছিল। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি মানার ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১২ শতাংশ ক্ষেত্রে ভোটার পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এছাড়া ৩২ শতাংশ ভোটকেন্দ্র প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য যথাযথভাবে প্রবেশযোগ্য ছিল না। ১০৩টি পর্যবেক্ষণের মধ্যে মাত্র তিনটিতে সারি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা গেলেও একটি কেন্দ্রে শারীরিক সহিংসতা বা ভয় প্রদর্শনের ঘটনাও চিহ্নিত হয়েছে। এএফইডি জানায়, প্রায় ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে প্রচারের সামগ্রী দেখা গেছে, যা নির্বাচনি আচরণবিধির পরিপন্থী। ১২টি ক্ষেত্রে অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের কেন্দ্রের বাইরে নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে এবং ১৫টি ক্ষেত্রে ভোটারদের ভোট প্রদানে নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রে ভোটারদের দলবদ্ধভাবে একই যানবাহনে আনার ঘটনাও লক্ষ্য করা হয়েছে।

ভোটার উপস্থিতিও তুলনামূলক কম ছিল বলে জানায় সংস্থাটি। পর্যবেক্ষণে সর্বোচ্চ ৬৪ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৩১ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। অনেক কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ভোটার উপস্থিতি ছিল না। শেরপুর-৩ আসনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মাসুদুর রহমান ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি ব্যালট বাক্সে অতিরিক্ত ভোট প্রদান এবং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ তুললেও এর তাৎক্ষণিক প্রভাব ভোটারদের ওপর পড়েনি বলে জানায় এএফইডি। ভোটগ্রহণ শেষে সারিতে থাকা সব ভোটারকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অধিকাংশ কেন্দ্রে দ্রুত গণনা শুরু হলেও কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব হয়েছে এবং কয়েকটি কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই গণনা শুরুর ঘটনাও ঘটেছে। দুটি কেন্দ্র ছাড়া সব কেন্দ্রেই ফলাফল প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়েছে, তবে চারটি ক্ষেত্রে এজেন্টদের আংশিকভাবে গণনা পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়। বগুড়া-৬ আসনে ডাকযোগে ভোটে অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। তিন হাজার ৭৩৬টি ব্যালটের মধ্যে ফেরত এসেছে এক হাজার ৬৮টি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যালট যথাযথ ঘোষণাপত্র ছাড়া জমা পড়ে এবং কিছু বাতিল হয়েছে। এএফইডির মতে, ডাকযোগে ভোটের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলেও অংশগ্রহণ ও নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

সংস্থাটি নির্বাচন প্রক্রিয়া উন্নত করতে কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—কেন্দ্র কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা, সব ভোটকেন্দ্রকে সবার জন্য প্রবেশযোগ্য করা, নির্বাচনের দিনে আচরণবিধি কঠোরভাবে মানা নিশ্চিত করা, পাইলট কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং ডাকযোগে ভোটের আওতা সম্প্রসারণ। এক প্রশ্নের উত্তরে ডেমোক্রেসি ওয়াচের চেয়ারপারসন ও এএফইডির বোর্ড সদস্য তালেয়া রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপী নির্বাচনে কিছু বিচ্যুতি থাকেই, আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। সাংবাদিক সম্মেলনে আরও ছিলেন রাইট যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক এবং ডর্পের চেয়ারপারসন এইচ এম নওমান।