২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ২০২৫ সালের শুরুতে এসে রাষ্ট্রের সংস্কারের রূপরেখা তৈরি কার্যক্রম শুরু হয়। নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার মূলত রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে একটি স্থায়ী জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসকে সভাপতি করে ঐকমত্য কমিশনের যাত্রা শুরু হয়। দেশের রাজনৈতিক দলসহ রাষ্ট্রের অংশীজনদের নিয়ে দীর্ঘ কয়েক মাস আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে তৈরি করা সুপারিশ মালা প্রদানের মাধ্যমে ৩১ অক্টোবর শেষ হয় এর মেয়াদ। কঠিন বাস্তবতা হলো এই সংস্কার কতটুকু বাস্তবায়িত হলো কিংবা ভবিষ্যৎ এ রাষ্ট্রের ক্ষমতাপ্রাপ্তরা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে তা বছর শেষে লাখ টাকার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তৈরি করা সংস্কারের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা গেলে জাতি পাবে এর সর্বোচ্চ সুফল। চিরচারিত নিয়ম অনুযায়ী- সব ভাল কাজে যেমন চ্যালেঞ্জ থাকে; তেমনি এই সংস্কারেও বাধার পাহাড় ডিঙ্গাতে হয়েছ্।ে বছর শেষে জরিপের মত বলছে, অধিকাংশ মানুষ সংস্কারে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে। আর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগীরাই সংস্কার কার্যক্রমে বাধা দিয়েছে।

আরেকটু পেছন থেকে শুরু করতে গেলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পলায়নের তিন দিন পর ৮ আগস্ট গঠিত হয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, তাঁরা সংস্কার চান, যে সংস্কার দেশের ১৮ কোটি মানুষ চায়। তার এই সংস্কারকে স্বাগত জানায় সারাবিশ^। দেশের আপামর জনতা এবং দেশ বিদেশের অংশীজনরা। তবে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক শুরু হওয়া মানবাধিকার, ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার ও প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও এর বাস্তবায়নে মিশ্র ফল ও নানা চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কমিশন হলো: সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যখাত, নারীবিষয়ক, শ্রম ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন; যাদের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন খাতের আমূল পরিবর্তন আনা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘ বৈঠকের পর সাফল্যের সাথে সকল সক্রিয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লাগাতার বৈঠকের মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি ও বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়।

বলা হয় ২০২৫ সালটি বিভিন্ন খাতে সংস্কারের বছর। কিন্তু এই সংস্কারগুলো নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, অসন্তুষ্টি। একারণে এ সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে সামনে আসে বিরাট চ্যালেঞ্জ। অবশ্য বছর শেষের জরিপগুলোতে দেখা যায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্র্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে একটি বড় অংশের মানুষ সন্তুষ্ট। তবে কিছু মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টি রয়েছে। একাংশ বলেছে, তারা সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্টÑকোনোটাই নয়।

তবে একথা সবাই বিশ^াস করে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের গ্রহণ করা সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা হলেই বাংলাদেশের মানুষ তার প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবে। দেশ আগ্রাসনমুক্ত উন্নয়নের সিড়িতে পা দিবে। মিলবে সামাজিক নিরাপত্তাসহ স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।

বছরের শেষ সময়ে এসে নির্বাচনের ট্রেনে উঠেছে বাংলাদেশ। এই সময়ে সংস্কারের কথা গৌণ প্রসঙ্গে পরিণত হয়েছে। এর বাস্তবায়ন এবং সত্যিকার সুফল পেতে হলে সবচেয়ে জরুরি যে সংস্কারÑসেদিকে কার কতটুকু মনোযোগ আছে, সে প্রশ্ন রয়েই যায়। গণতন্ত্রের যে লক্ষ্যÑমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে মানবিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠা, তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার করা। প্রশ্ন হলোÑবাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার কতটুকু এগিয়েছে ? বিশেষ করে ক্ষমতার পালাবদলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শ ও নীতি-ভিত্তিক লড়াইয়ের বদলে টাকা এবং পেশী শক্তির মহড়া তো এখনও দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতার পালাবদল স্বাভাবিক উপায়ে হয়নি। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় একাধিক শাসককে হত্যা করা হয়েছে, কিছু শাসক স্বৈরাচারি হয়ে ওঠায় গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাদের পতন ঘটেছে। ফলে সাংবিধানিক বা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিষয়টি খুব কমই ঘটেছে। শাসকেরা অধিকাংশ সময়ই ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে প্রতারণা, নির্বাচনকে বিতর্কিত করা, প্রশাসনকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার মতো কাজ করেছে। রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তে ক্ষমতার লড়াইই এখানে প্রাধান্য পায়। এর ফলে, সরকারের সংস্কার কর্মসূচি এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা কোন পথে এগুচ্ছে এবং তার সফলতার সম্ভাবনা কতখানি, তা নিয়ে জনগণের মধ্যে সন্দেহ রয়েই গেছে।

সংস্কার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম সংকট হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শের দুর্বলতা যথেষ্ট স্পষ্ট। এ অবস্থা উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন অপরিহার্য। সেজন্য হয়তো সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা সহ সরকারি নানা কিছুই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে এসব সংস্কারের জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতখানি আশার আলো দেখাতে পারছে, তা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করতে আগ্রহীÑএমন রাজনৈতিক আচরণ এখনও দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে।

নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে জনগণের আস্থা অর্জন করার মতো তেমন কিছু এখনও দৃশ্যমান হয়নি। অতীতের নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম ও ভোট জালিয়াতির কারণে জনগণ নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সুতরাং, নির্বাচনী পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব প্রায় একক ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতৃত্বের বিকাশ না হলে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। দলের ভিতরে একক নেতৃত্বের পরিবর্তে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করতে হলে দলের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চাকে গুরুত্ব দিতে হবে।