আজ ২৫ ডিসেম্বর, খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বীদের বড়দিন। সারা বিশে^র মতো বাংলাদেশেও আনন্দঘন পরিবেশ ও ধর্মীয়ভাবগম্ভীর্যের সাথে দিনটি উদযাপন করা হয়। বড় দিনের মূল আকর্ষণ হলো গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা, যা মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে বড় দিনের সকালে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যিশু খ্রিস্টের জন্ম উদযাপন করা হয়। ক্রিসমাস-ট্রি, রঙিন আলো, বেলুন ও অন্যান্য সজ্জা দিয়ে গির্জা, বাড়ি ও শপিংমল সাজানো হয়। পরিবার, বন্ধু এবং প্রিয়জনদের মধ্যে উপহার বিতরণ করা হয়, যা ভালোবাসা ও ভাগ করে নেওয়ার প্রতীক।

এদিন পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে বিশেষ খাবার ও পানীয়ের আয়োজন করে। অনেক জায়গায় সান্তা ক্লজ শিশুদের ও অন্যদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে গান, নাচ এবং যিশুর জীবনের উপর ভিত্তি করে নাটক পরিবেশিত হয়। তারকা হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো বিশেষ আয়োজন ও ভোজের ব্যবস্থা করে থাকে। বড় দিন মূলত যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন উদযাপন, যা পুনর্জন্ম, ক্ষমা, শান্তি এবং মানবজাতির মধ্যে নতুন সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়।

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিশ্বাস করেন, সৃষ্টিকর্তার মহিমা প্রচারের মাধ্যমে মানবজাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতেই প্রভু যিশুর পৃথিবীতে আগমন ঘটেছিল। ২৫শে ডিসেম্বর বেথলেহেম শহরে যিশু খ্রিস্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসে প্রথম বড়দিন পালিত হয়েছিল ৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে। যিশু খ্রিস্ট পৃথিবীতে এসেছিলেন মানুষকে পাপ থেকে মুক্তি দিতে এবং মানবিক বন্ধন দৃঢ় করতে, তাই তাঁর জন্মদিন বড়দিন হিসেবে পালিত হয়। কালের বিবর্তনে এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব না থেকে বিশ্বব্যাপী একটি বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে, যেখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও অংশ নেয়।

বড়দিনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার গির্জাগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। গির্জাগুলোতে খ্রিষ্টীয় ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা ও আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে শুভ বড়দিন পালন করা হবে। সকাল থেকেই গির্জায় গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেবেন ভক্তরা। উপহার দেওয়া, সংগীত, বড়দিনের কার্ড বিনিময়, গির্জায় উপাসনা, ভোজ, এবং বড়দিনের বৃক্ষ, আলোকসজ্জা, মালা, মিসলটো, যিশুর জন্মদৃশ্য এবং হলি সমন্বিত এক বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার প্রদর্শনী আধুনিককালে বড়দিন উৎসব উদযাপনের অঙ্গ।

বড়দিন উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার শুভেচ্ছা বিনিময় : গণভোটের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল বুধবার বড়দিন উপলক্ষে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে এই আহ্বান জানান প্র্রধান উপদেষ্টা। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু আর্চবিশপ বিজয় এন ডি’ক্রুজ, ন্যাশনাল ক্রিশ্চিয়ান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের সভাপতি বিশপ ফিলিপ পি অধিকারী, খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ড. বেনেডিক্ট আলো ডি রোজারিও, জাতীয় চার্চ পরিষদ বাংলাদেশ-এর সভাপতি খ্রিস্টোফার অধিকারীসহ দেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় খ্রিস্টান ধর্মের নেতারা তাঁদের শুভেচ্ছা বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সুনাম এবং দেশের অর্থনীতি ও সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে আগামী নির্বাচনও সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আয়োজিত হবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন। আর্চবিশপ বিজয় এন ডি’ক্রুজ তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে যিশু খ্রিস্টকে সার্বজনীন উল্লেখ করে বলেন, যিশু খ্রিস্টের ক্ষমা ও মানবসেবার মহান আদর্শকে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষও এ বছর উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বড়দিন উদযাপন করছে।

প্রধান উপদেষ্টাকে বড়দিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে আর্চবিশপ বিজয় এন ডি’ক্রুজ বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে জনগণ আপনার ওপর আস্থা রেখেছিল। আপনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। আমরা প্রার্থনা করি, একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আপনার প্রচেষ্টা সফল হবে।’ প্রধান উপদেষ্টা উপস্থিত নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে বড়দিন ও আসন্ন নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘আপনারাই সমাজের প্রতিবিম্ব। আপনাদের দেখলে বুঝতে পারি, সবকিছু ঠিক আছে কি না।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে চাই। সে জন্যই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে জুলাই সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে। এই সনদের ওপর গণভোটের মাধ্যমে দেশ আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে জনগণ যে রায় দেবে, পরবর্তীতে সংসদ সেভাবেই সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। প্রধান উপদেষ্টা এ সময় আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

বড়দিন উপলক্ষে খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে আড়াই কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার জন্য অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান ট্রাস্টের নেতৃবৃন্দ। দেশব্যাপী ৮০০টি চার্চের মধ্যে তিন ধাপে এ অনুদান বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানান তারা। পরে বড়দিন উপলক্ষে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে কেক কাটেন প্রধান উপদেষ্টা।