আজকের সূর্য ডোবার মধ্য দিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে বিদায় নেবে ইংরেজি সাল ২০২৫। আর রাত পোহালেই নতুন বছর। নানা ঘটন- অঘটনের কারণেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে বছরটি। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই বছরটি পার করেছে জাতি। তবে এই বছরে প্রাপ্তিও কম ছিল না। বিশ^জুড়েও যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই ছিল বছরজুড়ে।

বাংলাদেশে ২০২৫ সাল শুরু হয়েছিল নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্রসংস্কারের তোড়জোর দিয়ে। আর শেষ হলো নির্বাচনের প্রস্তুতি দিয়ে। মোটা দাগে বলতে গেলে বছরের আলোচিত ঘটনার মধ্যে ছিল রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম, জুলাই সনদ, নানা দাবি আদায়ে রাজপথে মিটিং মিছিল, নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথককরণ,মানবতাবিরোধী অপরাধে স্বৈরাচার ফ্যাসিবাদী হাসিনার মৃত্যুদ-, নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদী হত্যাকা-, তারেক রহমানের আগমন। সবশেষ বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বছরজুড়ে ছিল গাজায় ইসরাইলী আগ্রাসন ও গণহত্যা, পাক-ভারত যুদ্ধসহ কুটনীতির ঠা-া লড়াই।

২০২৫ সালের শুরুতে প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বের সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি বিশিষ্ট ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে দেন। সেইসাথে নিজের সভাপতিত্বে গঠন করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেখানে দীর্ঘদিন আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে সংস্কার এবং সুপারিশমালা তৈরি করা হয়। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে দুই পর্বের আলোচনায় ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ।

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা তথা সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান এবং বিদ্যমান আইনসমূহের প্রয়োজনীয় সংশোধন, সহযোজন, পরিমার্জন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধনের অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত যে সকল সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য সেগুলো কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করেই দ্রুততম সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

শুরুতে সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও সেই ঐক্যে ফাটল দেখা দেয় স্বার্থের দ্বন্দ্বে। এরপর আস্তে আস্তে সংস্কার গৌণ হতে থাকে। নির্বাচনের দাবি সামনে আসতে থাকে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার দাবিতে চাপ আসতে থাকে।

ডাকসু নির্বাচন ছিল ২০২৫ইং সালের আলোচিত বিষয়। আগের সব ইতিহাস পেছনে ফেলে নজিরবিহীন সুষ্ঠু ভোটের মধ্য দিয়ে শিবিরের পুরো প্যানেল নিয়ে নির্বাচিত হয় ডাকসুতে। সাদিক কায়েম হন ডাকসু ভিপি। একইভাবে রাকসু, জাকসু, চকসু আরও কয়েকটি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে শিবির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জয় পায়। ফলে এসব বিশ^বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেমে আসে স্বস্থি।

এই সময়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরমধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি, আপ বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক দল তাদের নাগরিক অধিকারের জানান দিয়ে সামনে আসে।

বছরজুড়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা নানাভাবে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করেন। ভারতও নানাভাবে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উত্তপ্ততায় কেটেছে বছর। বছর শেষে ইনকিলাব মঞ্চের শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর রাত ০৯:৩০ টায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশে আসেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর ৩০ ডিসেম্বর দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

২০২৫ সাল ছিল নানা দাবিতে রাজপথ উত্তাল। ঠুনকো অজুহাতে এবং দাবি আদায়ে বছরজুড়ে রাজপথে আন্দোলন-অবরোধ করেছে মানুষ। অনেকের ন্যায্য দাবি আদায় হয়েছে। অনেকের হয়নি।

বিদায়ী বছর বিশ^জুড়ে তোলপাড় ছিল ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের হামলা নারী ও শিশু, হত্যা সাংবাদিক নির্যাতন,মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। বছরজুড়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি, অপারেশন সিঁদুরের নামে পাকিস্তানে ভারতের হামলা, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা, হংকংয়ে ভয়ঙ্কর অগ্নিকা-, এপস্টেইন ফাইলের তথ্য উন্মোচন এবং একাধিক অঞ্চলে জেনজিদের আন্দোলনের মতো ঘটনা ২০২৫ সালকে স্মরণীয় করে রাখবে। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে বন্যা, ঝড় ও ভূমিকম্পের মতো বিধ্বংসী ঘটনায় বিদায়ী বছর বিশ্বকে অস্থির ও মানবিক সংকটের মুখে ফেলেছে। সুদানে দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা, বিশেষ করে র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) হামলার ফলে দেশটিতে অসংখ্য নাগরিকের মৃত্যু এবং অভিবাসনে হতে বাধ্য করেছে।

বিদায়ী বছর কিছু বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন নজর কেড়েছে বিশ^বাসীর। এর উদ্ভাবনের অন্যতম মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে জেনারেটিভ এআই। এটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের চেয়ে দ্রুততর সময়ে কন্টেন্ট, ডিজাইন ও সমাধান তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে। মার্কেটিং ক্যাম্পেইন তৈরি থেকে শুরু করে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগÑসব ক্ষেত্রেই চ্যাটজিপিটি এবং ডাল-ইর মতো জেনারেটিভ এআই টুলগুলো শিল্প খাতকে নতুন রূপ দিচ্ছে।

২০২৫ সালে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, যা অভূতপূর্ব কম্পিউটেশনাল ক্ষমতার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ফিন্যান্স, লজিস্টিকস ও ফার্মাসিউটিক্যালের মতো শিল্প খাত জটিল অপ্টিমাইজেশন সমস্যার সমাধান, আণবিক মিথস্ক্রিয়ার সিমুলেশন এবং ক্রিপ্টোগ্রাফিক সুরক্ষা উন্নত করতে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ব্যবহার করছে। অবশ্য কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবু এটি ক্রমাগত উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করছে এবং সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

২০২৫ সালে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা বিশ্লেষণ, বাজারের প্রবণতা পূর্বাভাস ও কার্যক্রম অপ্টিমাইজ করতে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। এআই-চালিত চ্যাটবটগুলো নিরবচ্ছিন্ন গ্রাহক সেবা দিচ্ছে, আর মেশিন লার্নিং মডেলগুলো সাপ্লাই চেইনের দক্ষতা বাড়িয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল অর্জনে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এআই এবং এমএলের গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

২০২৫ সালেও সাইবার নিরাপত্তা শীর্ষ অগ্রাধিকারে ছিল। এআই-চালিত নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলো রিয়েল-টাইমে ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রশমিত করেছে, যা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাইবার আক্রমণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সুরক্ষা দিয়েছে। ‘জিরো ট্রাস্ট আর্কিটেকচার’ ও ‘বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশন’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যা সংবেদনশীল তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।