নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়তো নিহত হয়েছেন, কিন্তু তার জায়গায় আরেকজন আসবেন। নিহত সামরিক কমান্ডারদেরও নতুন করে প্রতিস্থাপন করা হবে। ৪৭ বছরে গড়ে ওঠা একটি শাসনব্যবস্থা শুধু বিমান হামলার কারণে সহজে ভেঙে পড়বে না। ইরানের এখনো আমেরিকা ও ইসরাইলের বিমান হামলার জবাব দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে এবং এই যুদ্ধ কোন দিকে গড়াবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্র, যা আগে থেকেই দুর্বল ও অজনপ্রিয় ছিল, এখন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের ভেতরে ও আঞ্চলিক পর্যায়ে তাদের প্রভাব ১৯৭৮-৭৯ সালের বিপ্লবে আমেরিকাসমর্থিত শাহকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল শাসনব্যবস্থার পতন, তবুও তা না ঘটলেও এই বিশাল হামলা মধ্যপ্রাচ্যে এমন কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে তুলনীয়।

শনিবার সকালে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র বৈরিতা বজায় রেখেছিলেন। তাদের তিনি নিয়মিত ‘মহান শয়তান’ বলে অভিহিত করতেন। তিনি ইসরাইলকে ঘিরে একটি আঞ্চলিক প্রক্সি মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন ও অর্থায়ন করেছিলেন। তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজা ও পশ্চিম তীরের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ, ইয়েমেনের হুতিরা- সবাই ইসরাইলের স্বার্থে আঘাত হানার পাশাপাশি ইরানকে সুরক্ষা দেয়ার কাজ করত।

ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে এবং ইউরেনিয়াম প্রায় বোমা-গ্রেড পর্যায়ে সমৃদ্ধ করে, যদিও তারা কখনো বোমা বানানোর ইচ্ছা অস্বীকার করেছে। তারা এত শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল যে সৌদি আরব, মিশর ও উপসাগরীয় সুন্নি নেতারা এমনকি তাদের হুমকি দেয়া শিয়া ইসলামি শাসনের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করেছিল।

ইরানের পতন শুরু হয় দুই বছর আগে, যখন গাজা থেকে হামাসের আক্রমণের জবাবে ইসরাইল কঠোর ও ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া জানায়। এরপর ইসরাইল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা দুর্বল করে, হিজবুল্লাহকে পরাজিত করে এবং সিরিয়ার বিপ্লব থেকে সুবিধা নেয়, যা তেহরানের মিত্র বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

এখন আয়াতুল্লাহর মৃত্যু এবং আকাশপথে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব আরও কমেছে। এর পরিণতি আগামী মাস ও বছরগুলোতে স্পষ্ট হবে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, আমরা যেভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে চিনি, তা আর টিকবে না। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য আর আগের মতো থাকবে না। ৪৭ বছর ধরে অঞ্চলটি একটি শত্রুভাবাপন্ন ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শাসনের সঙ্গে বসবাস করেছে, যাকে প্রথমে বিচ্ছিন্ন করার এবং পরে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তার মতে, শাসনব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে নতুন কিছু আবির্ভূত হতে পারে। তবে সেই নতুন নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের প্রতি আরও কম বন্ধুসুলভও হতে পারে, বিশেষ করে যদি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, মধ্যমেয়াদে ইরান গুরুতরভাবে দুর্বল থাকবে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বেশি মনোযোগী হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলায় ব্যস্ত থাকবে। তবে স্বল্পমেয়াদে ইরান আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, কারণ বর্তমান নেতৃত্ব শাসন টিকিয়ে রেখে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চাইবে।

ইরান ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য যুদ্ধের খরচ দ্রুত বাড়ানোর চেষ্টা করবে, যাতে তারা পিছু হটে- এমনটাই বলেন ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের এলি জেরানমায়েহ। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে হামলা বাড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, এতে আরব বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে যুদ্ধ শেষ করার জন্য।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, ইরানের লক্ষ্য হলো হামলা সহ্য করা, অবস্থান ধরে রাখা, যুদ্ধ বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়া এবং উদ্বিগ্ন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতার অপেক্ষা করা।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ বলেন, হিজবুল্লাহ, ইরাকি ও সিরীয় মিলিশিয়া বা হুতিরা সরাসরি যুক্ত হলে এটি দ্বিপক্ষীয় সংঘাত না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে পারে, তাহলে তেলের দাম ও মুদ্রাস্ফীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত ইরান আঞ্চলিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার মতো শক্তি বা সম্পদ পাবে না। এতে লেবানন, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ইসরাইল আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে এবং সুন্নি দেশগুলোকে তাকে মেনে নিতে হবে। বছরের শেষে নির্বাচনের পর ইসরাইলে নতুন ও আরও মধ্যপন্থী সরকার আসতে পারে। ইরান দুর্বল হলে, গাজায় যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ বাড়তে পারে।

ইসরাইল শাসন পরিবর্তন পছন্দ করবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তারা বিভক্ত ও বিশৃঙ্খল ইরানেও সন্তুষ্ট থাকবে। যদি বিপ্লব না ঘটে, তবে নতুন ইরানি সরকারকে শক্তিশালী ইসরাইল ও অবিশ্বস্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে হবে। পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি তাদের আঞ্চলিক শক্তি প্রতিষ্ঠার মূল উপাদান ছিল। যুদ্ধের চাপেও তারা এ বিষয়ে ছাড় দেবে কি না তা স্পষ্ট নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি জনগণকে শাসন উৎখাতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, আমরা শেষ করলে তোমরাই তোমাদের সরকার দখল করো।

কিন্তু ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ একই আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইরাকিরা জেগে উঠেছিল। কিন্তু পরে সাদ্দামের বাহিনী হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে- এমনটাই মনে করিয়ে দেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক আইভো ডালডার।