ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের ইতিহাসে চরম ধরাশায়ির শিকার হয়েছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। এমনকি নিজেদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরেও তাদের ভোটে ধস নেমেছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনও পায়নি দলটি। নির্বাচনের জামানত হারিয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর। গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনে লাঙ্গল প্রতীকে ৩ হাজার ৩৭৫ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন তিনি।
রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীর্ষ নেতাদের অসহযোগিতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা, স্বৈরাচারের দোসরের তকমাসহ নানা কারণে সংসদ নির্বাচনে জাপার ভরাডুবি ঘটেছে। যার জেরে রংপুরে এবার তাদের ঝুড়ি শূন্য। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই জামায়াতে ইসলামী জয়ী হয়েছে। অপর আসনটি পেয়েছে জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলের ভরাডুবির পাশাপাশি শীর্ষ দুই নেতা জি এম কাদের ও শামীম হায়দার পাটোয়ারীও ভোটের লড়াইয়ে টিকতে পারেননি। জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনে তৃতীয় হয়েছেন। একইভাবে মহাসচিব শামীম গাইবান্ধা-১ আসনে তৃতীয় হয়েছেন।
নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে জাপা জিতেছিল যথাক্রমে ২৭ ও ৩৪টি আসন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলটির ২৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর দ্বাদশ সংসদে ১১ আসনে জয় পায় জাপা।
এবার যদিও দলটির এই ফলাফলকে অস্বাভাবিক বলার তেমন সুযোগ মিলছে না। কারণ নির্বাচনে ২০০ আসনে জাপা প্রার্থী দিলেও ভোটের আগ মুহূর্তে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, বগুড়া-২ আসনসহ একাধিক জায়গায় প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। বেশির ভাগ আসনেই প্রার্থীদের নির্বাচনি জনসংযোগ করতে দেখা যায়নি। অনেক স্থানে দলের নেতাকর্মীরা দলছুট হয়ে যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে। এছাড়া, নির্বাচন উপলক্ষে জাপার সমাবেশ হয়নি, দলটি দেয়নি কোনো ইশতেহার। এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে- দলটি কি কেবল নিয়ম রক্ষার্থেই ভোটে অংশ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভোটের মাঠে প্রার্থীদের অনুপস্থিতি, নির্বাচনে না জিততে চাওয়ার মনোভাব, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা, গণভোটে ‘না’ ভোটের প্রচারসহ নানা কারণে জাতীয় পার্টির এমন ভরাডুবি। এ বিষয়ে জাপার শীর্ষ নেতাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভোটের আগের দিন জাপা চেয়ারম্যান বলেছিলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। জাপা দীর্ঘদিন ধরে নানা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে, এখনো হচ্ছে। বিভিন্নভাবে দলটিকে দুর্বল করা হয়েছে। বল প্রয়োগ, মামলা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি, জেল-জুলুম আর দলের মধ্যে ভাগ সৃষ্টি করে তা করা হয়েছে। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ কৌশলে তাদের দুর্বল করেছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই আসনে মোট বৈধ ভোট পড়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ২৫২টি। নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর জামানত রক্ষার জন্য মোট বৈধ ভোটের অন্তত আট ভাগের এক ভাগ বা ১২.৫ শতাংশ ভোট পাওয়া প্রয়োজন। সেই হিসেবে, গাইবান্ধা -৫ (ফুলছড়ি- সাঘাটা) আসনে জামানত টিকিয়ে রাখতে শামীম হায়দার পাটোয়ারীর প্রয়োজন ছিল ২৬ হাজার ৬৫৬ ভোট। কিন্তু তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ৩৭৫ ভোট।
নির্বাচনি ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাইবান্ধা-৫ আসনে ১৪৬টি কেন্দ্রে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে আব্দুল ওয়ারেজ ৮৯ হাজার ২৭৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ফারুক আলম সরকার পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৪৮৩ ভোট।
এদিকে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রংপুরে শুরু হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এর মধ্যেই একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, সামনে একটি লাঙল রেখে তার জানাজার নামাজ পড়া হচ্ছে। কয়েকটি ফেসবুক পেজে ছবিটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, রংপুরের মাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে লাঙলের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হলো। ছবিটির সত্যতা ও সময়-স্থান সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে এটি ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য করছেন নেটিজেনরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনে তৃতীয় হয়েছেন। মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ আসনেও তৃতীয় স্থানে রয়েছেন।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি রংপুর শহরে। ফলে এ আসনে বরাবরই লাঙ্গলের বড় ভোটব্যাংক ছিল। এবার সেখানে বাজিমাত করেছে জামায়াত।
রংপুরের রাজনীতিতে লাঙলের এই পরাজয় ও তা ঘিরে প্রতীকী প্রতিবাদ আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।