বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।

গতকাল শনিবার সকালে রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে হোটেলের কনফারেন্স কক্ষে সুপ্রিম কোর্ট এবং United Nations Development Program (UNDP) -এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ Operationalizing Commercial Court ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, গত দেড় বছরের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সাংবিধানিক স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বিচার ব্যবস্থায় যে মৌলিক রূপান্তর সাধিত হয়েছে, তা দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক মাইলফলক। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এক নতুন প্রাতিষ্ঠানিক যুগে প্রবেশ করেছে।

ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়নের মাধ্যমে বহুদিনের দ্বৈত প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা দূর হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রথমবারের মতো পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন লাভ করেছে। এর ফলে বিচার বিভাগ এখন নিজস্বভাবে পদসৃজন, বাজেট বরাদ্দ, প্রশিক্ষণ উন্নয়ন, নীতিমালা প্রণয়নসহ বিচার সংস্কারকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ধারা হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

তিনি আরও জানান, সারাদেশব্যাপী বিভাগীয় সেমিনার ও জাতীয় প্লেনারি সেশন আয়োজনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দক্ষতা বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইউএনডিপি, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কারিগরি সহায়তা এই প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করেছে।

প্রধান বিচারপতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশংসা করে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাবসমূহ সরকার দ্রুততার সঙ্গে অনুমোদন করেছে, যা শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নির্মাণে জাতীয় ঐকমত্যকে প্রতিফলিত করে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দ্রুত ও আধুনিক বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি ডেডিকেটেড বা বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছিল, যা শিগগিরই বাস্তব রূপ নিতে চলেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সুপ্রিম কোর্টের একটি গবেষক দল বাণিজ্যিক আদালত সংক্রান্ত আইনের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করে, যা পরবর্তীতে সারাদেশব্যাপী রোডশো, BIDA-এর সঙ্গে নিবিড় পরামর্শ, ব্যবসায়িক আইন বিশেষজ্ঞ এবং বাণিজ্যিক অংশীজনদের মতামতের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের আরও পরীক্ষণ ও পরিমার্জনের পর খসড়াটি এখন চূড়ান্ত আইনগত রূপ পেয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে।

ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ জানান, খসড়া আইনটিতে বাণিজ্যিক বিরোধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা, পর্যাপ্ত সংখ্যক বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান, হাইকোর্ট বিভাগে পৃথক আপিল বেঞ্চ, বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা, সীমিত মুলতবি, সারসংক্ষেপ বিচার, মামলার পরিসংখ্যানের স্বচ্ছ প্রকাশ এবং বিচারক আইনজীবীদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মতো আধুনিক বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, কোনো আইন কেবল তখনই কার্যকর হয় যখন তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়। এজন্য বাণিজ্যিক আদালতসমূহের সফল পরিচালনার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ বিকাশ, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন UNDP, Bangladesh Gi Resident Representative স্টেফান লিলার Mr. Stefan Liller) । অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন Embassy of Sweden in Dhaka- এর Head of Politics, Trade and Communication অলি লুন্ডিন (Mr. Olle Lundin), Deputy High Commissioner of Australia to Bangladesh ক্লিন্টন পুকি (Mr. Clinton pobke), বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূত অজিত সিং (Ajit Singh), বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস (Nicholas Weeks) এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার (Michael Miller)।

উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের নিমিত্তে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাবৃন্দের মনোনয়ন প্রদান করে গত ২ ডিসেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।