আজ ১০ ডিসেম্বর বুধবার। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন ময়মনসিংহ, মাদারীপুর, ভোলা ও নড়াইলের মতো বেশ কয়েকটি জেলা পাকিস্তানী শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত হয় এবং মিত্র বাহিনীর বিমান হামলায় চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে পড়ে; একই সময়ে, ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু হয়, যা ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা।
১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ শত্রু মুক্ত হয়। এর আগে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলার জন্য ময়মনসিংহের দিকে এগিয়ে প্রবল আক্রমণ শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকার দিকে পালিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনারা। পালিয়ে যাওয়ার সময় পাকিস্তানী বাহিনী মুক্তিবাহিনীর চলাচলের বিঘ্ন ঘটানোর জন্য শম্ভুগঞ্জ সেতু উড়িয়ে দেয়।
১০ ডিসেম্বর সিলেটে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনী একে একে কুরিগাঁও, বাদাঘাট, মিতিমহল, নোয়াগাঁও ও চালতাবাড়ি মুক্ত করে। ১০ ডিসেম্বর খুলনায় মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট আরেফিনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল খুলনা বেতার ভবন আক্রমণ করে। এসময় সেখানে মুক্তিবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল। দুইপক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ১০ ডিসেম্বর বগুড়ার শান্তাহার রেলস্টেশনে বোমা হামলা চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিমান। এসময় স্টেশনে থাকা বেশ কয়েকজন পাকিস্তানী সেনা নিহত হয়। বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় শান্তাহার রেলওয়ে জংশনের লোকোশেড এবং মেশিনারিজ। বিমান হামলায় রেলওয়ের একজন কর্মচারীও আহত হন।
১০ ডিসেম্বর বিকাল ৪টার দিকে জামালপুরে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লেয়ারের নির্দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর ৩১ বেলুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতান মাহমুদের আত্মসমর্পণের আহবান জানিয়ে জহিরুল হক মুন্সীকে পাঠানো হয়। আত্মসমর্পণের চিঠি নিয়ে গেলে পাকিস্তানী বাহিনী চিঠি বহনের অপরাধে বাহক কৃষকের বেশে যাওয়া দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল হক মুন্সীর ওপর চরম পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। এক পর্যায়ে তিনি উপস্থিত বুদ্ধিমত্তায় বেঁচে গেলে পাকিস্তানী কমান্ডার সুলতান মাহমুদ ৭ পয়েন্ট ৬২ চাইনিজ সাব-মেশিনগানের বুলেট একটি কাগজে মুড়ে পাঠিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এরপর মুক্তিবাহিনী জামালপুর শহর দখলের লক্ষ্যে পাকিস্তানীদের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। একইসঙ্গে চলে ভারতীয় বাহিনীর বিমান হামলা। ১০ ডিসেম্বর সাভারের নয়ারহাটে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিমান রেডিও ট্রান্সমিশনের ওপর বোমা হামলা চালালে বেতারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
১০ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তবাহিনী দিনাজপুর, রংপুর এবং সৈয়দপুরে হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সব রসদ বন্ধ করে দেয়। ১০ ডিসেম্বর ভোলা শত্রুমুক্ত হয়। আগের দিন মুক্তিবাহিনী ভোলা শহর চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। এদিন ভোরের দিকে পাকিস্তানী বাহিনী মুক্তিবাহিনীর ওপর হামলা চালালে মুক্তিবাহিনীও তাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। এসময় মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার কাজী জয়নাল আহমেদের নেতৃত্বে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল তাদের ধাওয়া করে। পাকিস্তানী বাহিনী চাঁদপুরের দিকে পালিয়ে যায়। ১০ ডিসেম্বর মাদারীপুর শত্রু মুক্ত হয়।
১০ ডিসেম্বর নড়াইল মুক্ত হয়। এর আগে নড়াইলকে হানাদারমুক্ত করার জন্য ফজলুর রহমান জিন্নাহ'র নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল চিত্রা নদীর পূর্ব দিক থেকে কাভারিং সাপোর্টে, অন্য গ্রুপ সদর থানা কমান্ডার শরীফ হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ চালায়। এসময় মুক্তিবাহিনীর প্রথম আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেও পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর ত্রিমুখী হামলায় টিকতে না পেরে বিকেলের দিকে মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
১০ ডিসেম্বর ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটানা বিমান হামলায় চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে পড়ে। কয়েকটা জাহাজে করে পাকিস্তানী সেনারা পালাবার সময় বঙ্গোপসাগরে ধরা পড়ে। একটি জাহাজে নিরপেক্ষ দেশের পতাকা উড়িয়ে হানাদার বাহিনী সিঙ্গাপুরে পালাবার পথে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। ১০ ডিসেম্বর ভারতের কৈলাস থেকে হেলিকপ্টার নিয়ে সিলেট পরিদর্শনের সময় গুলীর আঘাতে হেলিকপ্টারটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু হেলিকপ্টারের পাইলট ক্যাপ্টেন সাহাবউদ্দিন নিরাপদে হেলিকপ্টারসহ অবতরণ করেন।
১০ ডিসেম্বর নবম বেঙ্গলের মুক্তিযোদ্ধারা কুমিল্লা শহরের রেলওয়ে ক্রসিং থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় মেজর আইন উদ্দিনের নেতৃত্বে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ৩টি ট্যাংক রেলওয়ে ক্রসিং থেকে হানাদার বাহিনীর একটি দল ট্যাংকের উপর গোলা নিক্ষেপ শুরু করে। এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে যায়। পরে মুক্তিবাহিনী পুরো এলাকা রেকি করে। ১০ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ শত্রু মুক্ত হয়।
১০ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহী। তিনি সেখানে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি করেন। ১০ ডিসেম্বর রেডিও পিকিংয়ের এক ঘোষণায় বলা হয়, ভারত যদি বিশ্বমত উপেক্ষা করে ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে মিত্র হিসেবে পাশে পেয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। তবে ভারতকে চরম শিক্ষা পেতে হবে।
১০ ডিসেম্বর চীনের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিপো ফেই বলেন, 'ভারতের কার্যকলাপে তার সম্প্রসারণবাদী নগ্নরূপ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সমাজতন্ত্রী সাম্রাজ্যবাদীরা নির্লজ্জের মতো ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের ত্রাণকর্তার ভূমিকা গ্রহণ করে বর্বরোচিত কাজ করেছে।' ১০ ডিসেম্বর জানা যায় মার্কিন সপ্তম নৌ বহর মালাক্কা প্রণালীর পূর্বে অবস্থান করছে।