ইরানের অর্থনীতির বিপর্যয়ের প্রতিবাদে সহিংস বিক্ষোভের পর এবার দেশের বিভিন্ন শহরে বিদেশী হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে ও সরকারের পক্ষে রাজপথে নেমেছে দেশটির লাখো মানুষ। এদিকে দেশটির প্রেসিডেন্ট দেশের দুর্বল অর্থনীতির পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএন বিক্ষোভে প্রাণহানির সংখ্যা ৫শ’ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে। রয়টার্স, আল-জাজিরা, এপি।

ইরানের অর্থনীতির বিপর্যয়ের প্রতিবাদে সহিংস বিক্ষোভের পর এবার দেশের বিভিন্ন শহরে বিদেশী হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে ও সরকারের পক্ষে রাজপথে নেমেছে দেশটির লাখো মানুষ। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ খামেনীর নেতৃত্বাধীন সরকারের সমর্থনে বিপুল জনসমাগম হয়েছে দেশটির বিভিন্ন শহরে।

কেরমান ও জাহেদানসহ বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভে মানুষকে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনীর ছবি বহন করতে দেখা যায়। তাদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। রাষ্ট্রীয় প্রেস টিভি জানিয়েছে, কেরমানের রাস্তায় মিছিলরত জনতা ‘আমেরিকার পতন’ কামনা করে স্লোগান দিচ্ছিল। সরকারি সংস্থাগুলো সোমবার দেশজুড়ে শাসকগোষ্ঠীর সমর্থনে মিছিলের ডাক দেয়।

দেশটিতে অর্থনৈতিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়। পূর্বাঞ্চলীয় শহর বিরজান্দে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির ফুটেজে জনতাকে ‘আমাদের জাতি জেগে উঠেছে এবং দাঙ্গাবাজদের ঘৃণা করে’ ও ‘আমরা বিপ্লবী সৈনিক, আমরা ফেতনাবাজদের ঘৃণা করি’এমন স্লোগান দিতে শোনা যায়। ফার্স বার্তা সংস্থার বরাতে জানানো হয়, মধ্য ইরানের শহর আরাকে মাইক্রোফোনে একজন বক্তা জনতাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সবারই সমস্যা আছে, কিন্তু তারা বিদেশীদের হাতে নিজের ভাগ্যের সিদ্ধান্ত তুলে দেয় না। তারা আমেরিকা ও ইসরাইলের হাতে দাবার চাল তুলে দেয় না।’

এদিকে, ইরানের অর্থনীতির বিপর্যয়ের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সোমবার আরাগচি বলেছেন, দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ দমনের পর বর্তমানে পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তবে তিনি দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি। আরাগচির দাবি, শুরু হওয়া অহিংস আন্দোলনকে পরে ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংস ও রক্তক্ষয়ী রূপ দেওয়া হয়েছে। যাতে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হস্তক্ষেপের সুযোগ পান। তেহরানে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন আরাগচি। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও অনুমতি নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তার বক্তব্য সম্প্রচার করেছে।

আব্বাস আরাগচি আরও বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, তবে সংলাপের পথও খোলা রেখেছি।’

এর আগে আরাগচি দেশটির বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে ‘সন্ত্রাসী যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি ভবন, পুলিশ স্টেশন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বেসামরিক মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অডিও রেকর্ডিংও পেয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।’

বিক্ষোভের মধ্যে বড় ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি দেশজুড়ে টানা দুই সপ্তাহের সহিংস বিক্ষোভের মধ্যে দেশের দুর্বল অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার সরকার জনগণের কথা শুনতে প্রস্তুত এবং চলমান অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

গত রোববার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দিতে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করা হলেও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানের মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের পর দেশটিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে হঠাৎ মুদ্রার পতনে নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছে। শুরুতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ হলেও পরবর্তীতে এসব আন্দোলন সরকারবিরোধী রূপ নেয়।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। আমাদের উচিত তাদের সঙ্গে বসা এবং দায়িত্ব থাকলে তাদের সমস্যার সমাধান করা। তবে আরও বড় দায়িত্ব হলো, কিছু দাঙ্গাবাজ যেন পুরো সমাজকে ধ্বংস করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।

তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে এবং জনগণকে তথাকথিত ‘দাঙ্গাবাজ ও সন্ত্রাসীদের’ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।

আল জাজিরা জানিয়েছে, ২০২২-২৩ সালে মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, তার পর থেকে এটিই ইরানে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ বলে মনে করা হচ্ছে।

আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান, ইরানি কর্তৃপক্ষ গত এক সপ্তাহ ধরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বিদেশী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহিংস গোষ্ঠীর পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, সরকারি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও জনগণের ক্ষোভকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করেছেন, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ১০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।

ইরানে বিক্ষোভে নিহত পাঁচ শতাধিক

এদিকে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রাণহানির সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ এ তথ্য জানিয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা এ খবর জানিয়েছে।

এইচআরএএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহের অস্থিরতায় অন্তত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। এ সময় গ্রেফতার হয়েছেন ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ।

উল্লেখ্য, ইরান সরকার কোনও আনুষ্ঠানিক নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। রয়টার্সও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

রয়টার্সের সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালের পর এটিই ইরানের শাসকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় গণআন্দোলন। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সরকারকে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও হত্যা করা হলে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন। তবে এই হুঁশিয়ারি বাস্তব নীতিতে রূপ নেবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্পের বারবার হুঁশিয়ারি জবাবে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভুল হিসাব না করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেছেন, ইরানে হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল) সহ যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হবে।