জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন রাজধানীর রামপুরুায় একজনকে গুলী ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নতুন মোড় এসেছে। এই মামলায় অতিরিক্ত ডিজিটাল এভিডেন্স বা তথ্যপ্রমাণ দাখিলের জন্য প্রসিকিউশনকে পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

একইসঙ্গে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৯ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম ও তারেক আবদুল্লাহসহ অন্য প্রসিকিউটররা।

এদিন এই মামলায় রায় পিছিয়ে নতুন ডিজিটাল এভিডেন্স বা তথ্যপ্রমাণ নেওয়ার আবেদন করে প্রসিকিউশন। এ জন্য চার সপ্তাহ সময় চাওয়া হয়। অন্যদিকে আসামীপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন। তিনি ছয় সপ্তাহ সময়ের আবেদন জানান এবং এই মামলায় একমাত্র গ্রেপ্তার রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের জামিন প্রার্থনা করেন।

আসামীপক্ষের আইনজীবী ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘আমার মক্কেল ১৫ মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন। তার একটি বাচ্চা রয়েছে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। এজন্য তার জামিন চাই।’

জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এ মুহূর্তে আসামীর জামিন দেওয়া যাবে না; কারণ মামলাটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরপর নতুন তথ্যপ্রমাণ দাখিলে প্রসিকিউশনকে পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়ে ৯ এপ্রিল শুনানির পরবর্তী দিন নির্ধারণ করা হয়।

এই মামলায় পলাতক আসামীরা হলেন, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম প্রেস ব্রিফিংএ বলেন, মামলার যেকোনো পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বাদ পড়ে গেলে তা অ্যাডিশনাল এভিডেন্স হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে প্রসিকিউশনের। ট্রাইব্যুনাল আইনই এ সুযোগ দিয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, এই ট্রাইব্যুনালে যোগদানের পর আমি প্রত্যেকটি মামলা আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। যেসব মামলার তদন্ত সঠিকভাবে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, সেগুলো স্ব স্ব প্রসিকিউটরদের সেভাবে চালানোর নির্দেশ দিচ্ছি। যেগুলোর তদন্ত মনে হচ্ছে আবারও হওয়া উচিত, সেগুলো সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছি।

তিনি বলেন, মামলাটি আমার যোগদানের আগেই রায়ের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু মামলাটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখি আসামী চঞ্চল চন্দ্র সরকারের একটি ভিডিও রেকর্ডিং রয়েছে, যেখানে তিনি কীভাবে গুলী করেছেন, কার নির্দেশে করেছেন- সেসব বিষয়ে সরাসরি স্বীকার করছেন। অত্যন্ত শক্তিশালী এই প্রমাণটি এভিডেন্সে আনা হয়নি। এজন্য এটি আমাদের দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিষয়টি সম্প্রতি নজরে এসেছে। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করা হয়েছে, যেন ভিডিওটি মামলায় সংযুক্ত করে উপস্থাপন করা যায়। এজন্য চার সপ্তাহ সময় চাওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিয়েছেন।

শুরু থেকেই সাক্ষ্যগ্রহণের প্রয়োজন হবে কিনা জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাক্ষ্যগ্রহণ প্রয়োজন হবে না। এটা আমরা যদি টেন্ডার করি, তাহলে সরাসরি এভিডেন্সে দিতে পারবো। ডিফেন্সকে শুধু আমাদের নোটিশ দিলেই হবে।

গাফিলতি কিনা সাংবাদিকদের প্রশ্নে আমিনুল ইসলাম বলেন, এটা গাফিলতি নয়। ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে। এভিডেন্সটা হয়তো তখন ছিল না। যেহেতু বিষয়টি আমার কাছে আসছে, এজন্য তাৎক্ষণিকভাবে মনে হলো এভিডেন্সটা উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

জয়-পলকের মামলায় প্রথম সাক্ষ্য শেষ : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা শেষ হয়েছে।

গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। প্যানেলের বাকি সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মামলার বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। এ সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ কিংবা আলামত কবে, কখন, কোথায় থেকে জব্দ করেছেন তা ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন। এছাড়া জয় ও পলকের ফোনালাপসহ অন্যান্য ডিজিটাল এভিডেন্স কীভাবে পেয়েছেন, সেসবের বিবরণ দেন।

পরে আসামী পলকের পক্ষে জোহাকে জেরা করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো ও জয়ের পক্ষে করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মনজুর আলম।

জেরায় আমিনুল গণির প্রশ্নে জোহা বলেন, নিজেদের সার্ভার থেকে এ মামলা সংক্রান্ত রেকর্ড দিয়েছে এনটিএমসি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হওয়ার আগে আমি সরকারের আইসিটি বিভাগের অধীনে একটি প্রকল্পে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলাম।

পলকের ভয়েস সংক্রান্ত কোনো অডিও-ভিডিও বা মোবাইল ফোন জব্দ করেছেন কিনা- আইনজীবীর প্রশ্নে না সম্বোধন করেন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমি সরাসরি জব্দ করিনি। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কল রেকর্ড জব্দ করেছি। তাদের কথপোকথনের মধ্যে বি-পার্টি হিসেবে পলকের ভয়েস রয়েছে। এছাড়া পলকসহ এ মামলার সব ভয়েসের ফরেনসিক পরীক্ষা করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

তানভীর হাসান জোহা কখনও ডিজিএফআই বা এসবিতে ছিলেন কিনা জানতে চান আইনজীবী টিটো। জবাবে ছিলেন না বলে জানান তিনি।

জেরা শেষে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১০ মার্চ দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, সুলতান মাহমুদ, গাজী এমএইচ তামিমসহ অন্যরা।