সড়ক পথের পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে নতুন মন্ত্রীর বক্তব্যে দেশব্যাপী তোলপাড় চলছে। সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বৃহস্পাতিবার বলেছেন, সড়কে বিভিন্ন পরিবহন থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া হলে, সেটা চাঁদা নয়। বরং টাকা দিতে বাধ্য করা হলে, সেটা চাঁদা। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, পরিবহন খাতে নানা উপায়ে বছরে হাজার কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। এই খাতের বিশৃঙ্খলার পেছনে মূল কারণ চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনা যাবে না। সড়ক মন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীতে গতকাল শুক্রবার কথা বলেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি গতকাল তার নিজ এলাকা লক্ষীপুরে বলেছেন, সারাদেশে সড়কে চাঁদাবাজির কোন সুযোগ নেই। আর লক্ষ্মীপুরেতো নাই-ই। একই সাথে সড়ক মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী এবং সদ্য জাতীয় নির্বাচনের পরাজিত প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা।

সড়ক ও মহাসড়কে চাঁদা আদায়কে ‘সমঝোতা’ বা ‘অলিখিত বিধি’ হিসেবে উল্লেখ করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন ডা. তাসনিম জারা। তিনি বলেছেন, মন্ত্রী যেটিকে সমঝোতা বলছেন, তা বাস্তবে সাধারণ চালকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি সুপরিকল্পিত পদ্ধতি।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই মন্তব্য করেন। ডা. তাসনিম জারা বলেন, “কোনো চালক যখন নির্দিষ্ট রুটে গাড়ি চালাতে যান, তখন তাকে নির্দিষ্ট সংস্থাকে টাকা দিতেই হয়। একে ‘সমঝোতার’ মোড়ক দেওয়া মানে হলো একটি অনিয়মকে বৈধতার ভাষা দেওয়া।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই অবৈধ লেনদেনের সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটে। বাসভাড়া বৃদ্ধি এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হলো সড়কের এই অলিখিত চাঁদা। শেষ পর্যন্ত এই অর্থের দায়ভার সাধারণ যাত্রী ও ভোক্তাদেরই বহন করতে হয়।

মন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ‘যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের আধিপত্য থাকে।’ তাহলে কি আমরা ধরে নেব, এই অর্থ আদায় প্রক্রিয়া রাজনৈতিক ক্যাডারদের পৃষ্ঠপোষকতার একটি মাধ্যম?”

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন তাসনিম জারা। রাস্তায় সরাসরি টাকা তোলা বন্ধ করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা বার্ষিক রেজিস্ট্রেশন ফি-র সাথে যুক্ত করে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কল্যাণ তহবিল সংগ্রহ করা হোক। সংগৃহীত কোটি কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ অডিট নিশ্চিত করা এবং সেই অর্থ কার কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে তা প্রকাশ করা।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাসনিম জারা বলেন, অনিয়মকে ‘অলিখিত বিধি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে হতাশ করবেন না। সরকারের মূল দায়িত্ব হলো সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়।

জানা গেছে, সড়কপথের ওপর ভর করে বড় হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা সড়কপথের ওপর নির্ভর। তাই বাড়ছে বাস-ট্রাক ব্যবসার চাহিদা। এই খাতের ব্যবসায়ীরা পরিবহন নিবন্ধন থেকে শুরু করেন উৎকোচ দেয়া। অফিসের উৎকোচ সড়কে নেমে হয়ে যায় চাঁদা। পরিবহনের চাকা ঘুরলেই নেতা, পুলিশ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, শ্রমিক-মালিক সংগঠন; টাকার ভাগ যায় সব টেবিলে।

টিআইবির একটি গবেষণা বলছে, শুধু যাত্রী পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরাই প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা চাঁদা দেয়। পণ্য পরিবহনের হিসেব করলে চাঁদার অংক ছাড়াবে ৩ হাজার কোটি টাকা।

টিআইবির গবেষণা বলছে, দেশের আন্তঃজেলা-দূরপাল্লা রুটের বাসের ক্ষেত্রে বাস প্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ১ হাজার ১৯ টাকা, আন্তঃজেলা-আঞ্চলিক রুটের বাসের ক্ষেত্রে ১ হাজার ১৩৩ টাকা এবং সিটি সার্ভিসের বাসের ক্ষেত্রে গড় ঘুষের পরিমাণ ৫ হাজার ৬৫৬ টাকা। বছরের হিসেবে ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা গুনতে হয় পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের।

টিআইবি’র পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যে হিসাব দিচ্ছি তা কম বাস্তবে এর থেকেও বেশি। এখানে চাঁদাবাজি সড়ক পথে স্বাভাবিক করে ফেলা হয়েছে। ফলে এর প্রভাবটা দ্রব্যমূল্য ও সেবাখাতের উপর পরে। আর এর দ্বিতীয় দফায় প্রভাব পরে জনগনকেই এর বোঝা বইতে হয়।’

টিআইবির গবেষণার থেকেও ভয়াবহ চিত্র বাস্তবে। পণ্য পরিবহনের চাঁদাবাজির চিত্র ছিল না টিআইবির গবেষণায়। অভিযোগ রয়েছে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, পুলিশ, সবাই নেয় টাকা এই খাত থেকে।

গবেষণায় আরও এসেছে, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিবহন খাতের চাঁদার নিয়ন্ত্রণ করতেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। আওয়ামী লীগের পতনের পর এর নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে বিএনপিপন্থী পরিবহননেতাদের হাতে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মোট চাঁদা আদায় করা হয় ছয় হাজার ৯৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত যানবাহনের মাধ্যমে প্রায় ১৯ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এ ছাড়া অনিবন্ধিত অটোরিকশা, অটোটেম্পো রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ, ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক ছয় লাখ, নছিমন-করিমন-আলমসাধু ও ভটভটি তিন লাখ। ফলে দেশে অনিবন্ধিত যান রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ। এসব যানবাহন থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত ২৪৯টি ইউনিয়ন বেআইনিভাবে নিয়মিত হারে চাঁদা আদায় করে।

এসব চাঁদার এক-পঞ্চমাংশ কল্যাণ তহবিলের নামে ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দিতে হয়। গত ১৫ বছরের বেশি সময়ে এই খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা হিসেবে শ্রমিক ফেডারেশনে জমা হয়েছে, কিন্তু এসব টাকার সর্বজনীন সুফল শ্রমিকরা পাননি।

ঢাকা শহরের ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ২ কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করা হয়। প্রতি মাসে এটি ৬৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, আবার কখনো তা বেড়ে ৮০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায় বলে একটি সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে।

পরিবহন খাতের সূত্রগুলো বলছে, দেশে সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক যানবাহন আছে ৯ লাখের বেশি। বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় হয়। এর বাইরে অঘোষিত চাঁদার তো কোনো হিসাব নেই। মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণের কথা বলে এসব চাঁদা আদায় হলেও করোনাভাইরাসের দুর্দিনে তাদের পাশে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোকে দেখা যায়নি।

পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয়ের বাইরে যেকোনো ‘ছায়া’ খরচ অবৈধ। চাঁদা কিংবা কল্যাণ খরচ যেভাবেই দেখানো হোক না কেন, তা জনগণের ওপর চাপ তৈরি করে। পরিবহন খাতে পুলিশ, মালিক-শ্রমিক, রাজনৈতিক পক্ষের নামে চাঁদা তোলা হয়, এটা প্রকাশ্য।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের শক্ত রায় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। শুরুতেই চাঁদাবাজি বন্ধের সদিচ্ছা দেখাতে হবে। নতুবা পরে পারবে না। আর চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলাও আসবে না।

শ্রমিক কল্যাণ সম্পর্কে অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, আইন অনুসারে নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতন পাওয়া শ্রমিকের অধিকার। এটা নিশ্চিত করা গেলেই কল্যাণ হয়। চাঁদা তুলে কল্যাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি আরও বলেন, কল্যাণের নামে যে চাঁদা তোলা হয়, এর কোনো নিরীক্ষা হয় না। ফলে কীভাবে এবং কারা খরচ করে, তা কেউ জানে না।

চাঁদা বৈধতার ইতিহাস

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০২ সালের দিকে বিএনপি সরকারের তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সভায় পরিবহন খাতে চাঁদার বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর জন্য একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। তারা একটি সুপারিশও তৈরি করেছিল। কিন্তু বৈধতার প্রশ্ন নিয়ে সমালোচনা হলে তৎকালীন সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সৈয়দ আবুল হোসেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান। তারা ২০১১ সালের দিকে বিএনপি সরকারের সময় করা সুপারিশ পরিমার্জন ও সংশোধন করে নতুন সুপারিশ তৈরি করেন এবং একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেন।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, পরিবহন মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ৪০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন সর্বোচ্চ ২০ টাকা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ১০ টাকা করে চাঁদা তুলতে পারবে। কোনো টার্মিনালের শ্রমিক কমিটি থাকলে স্থানীয় শ্রমিক ইউনিয়ন ও ফেডারেশন আলোচনা করে সর্বোচ্চ ৭০ টাকা চাঁদা নিতে পারবে।তবে সমালোচনার মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই নীতিমালা অনুমোদন দেয়নি। পর্যায়ক্রমে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে ৭০ টাকা চাঁদা তোলার বিষয়টি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।

কি বলেছিলেন নতুন সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রী

সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়।”

তিনি বলেন, মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। উত্তোলন করা টাকার কতটুকু ব্যবহার করা হয়, সেটা নিয়ে হয়ত বিতর্ক আছে। কিন্তু, তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে।

মন্ত্রী রবিউল আলম আরও বলেন, “শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অনেক সংস্থা আছে। তারা এটা সমঝোতার ভিত্তিতে করে থাকে। সেখানে আবার প্রাধান্য পায় যখন যার প্রভাব থাকে, [প্রভাব আছে] এমন মালিকদের বা দলের প্রভাব থাকে।

‘’যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে। কিন্তু এটা চাঁদা আকারে আমাদের কাছে দেখার সুযোগ হচ্ছে না। কারণ তারা সমঝোতা ভিত্তিতে করছে’’- যোগ করেন তিনি।

রবিউল আলম বলেন, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কোনো জায়গায় বাইরে থেকে কেউ চাপ দিয়ে চাঁদা নেবে বা সুবিধা নেবে সে সুযোগ নেই। কিন্তু মালিকরা যদি সমঝোতার ভিত্তিতে সেটা করে, তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখব, যে সেখানে কেউ বঞ্চিত হচ্ছে কি না, এবং সেই অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে কি না।