আজ ১ ডিসেম্বর সোমবার। বছর পেরিয়ে আবার আমাদের মাঝে এলো বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখ জাতি বিজয় অর্জন করে। এবছর এমন এক সময় জাতির মাঝে বিজয়ের মাস এলো; যখন পুরো জাতি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান। নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার আর আধিপত্যবাদের কবল থেকে রক্ষা পেতে জাতিকে রক্ত দিতে হয়েছে। ছাত্র ও তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে সব শ্রেণি পেশার মানুষকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে নাজরানা। তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে ছাত্র জনতার জীবনপণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আবার দেশ লাভ করে স্বাধীনতা। যাকে আমরা বলি দ্বিতীয় স্বাধীনতা।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে এসেছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ৫৩ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই ডিসেম্বরেই বাঙালির নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই বিজয়কে অর্থবহ করতে ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত লাখো মানুষ শহীদ হয়েছেন। লাখো প্রাণের বিনিময়ে ৭১-এর স্বাধীন বাংলাদেশ, ৭৫-এর ৭ নভেম্বরে আধিপত্যবাদবিরোধী তাবেদারমুক্ত বাংলাদেশ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী বাংলাদেশ এবং ২০২৪-এর ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন প্রতিটি বাঁকে অনেক মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পরও বার বার এদেশের মানুষকে দুঃশাসনে পতিত হতে হয়েছে। স্বৈরাচারের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদের যন্ত্রণা কাতরাতে হয়েছে। বার বার মুক্তি পেতে দিতে হয়েছে জীবন আর রক্তের নাজরানা। সবশেষ দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে গণতান্ত্রিক অধিকারহারা জনগণ ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে অত্যাচারিত মানুষ রক্ত দিয়ে এনেছে তাদের বিজয়। সবশেষ ফ্যাসিবাদবিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের জেরে শেষ পর্যন্ত হাজারো শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ২০২৪ সালে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। গণতন্ত্রকামী স্বাধীনতাপ্রিয় দেশবাসীর কাছে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে বিজয়ের আনন্দ ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।

এবছর বিজয়ের মাস উদযাপন করবে ভয়হীন আর বুকভরা নিঃশ^াস নিয়ে। নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যাশা নিয়ে। কথা বলার স্বাধীনতা নিয়ে। ফ্যাসিবাদের বিচারের রায় কার্যকরের প্রত্যাশা নিয়ে। আগামির সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের আবাহন নিয়ে। আধিপত্যবাদ মুক্ত নতুন বাংলাদেশ গঠনের অপেক্ষা নিয়ে।

এবারের বিজয় দিবসের প্রত্যয় হোক শহিদদের সেই স্বপ্ন পূরণের বাংলাদেশ। শহিদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচন দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের সামনে এক বিশাল সুযোগ।

ইতিহাস বলছে, ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর সকাল পৌনে ৮টায় ঢাকার ইস্কাটনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) কার্যালয়ে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এত সকালে অফিসে কেউ অবস্থান না করায় দুজন সামান্য আহত হওয়া ছাড়া কেউ হতাহত হয়নি। তবে গেরিলাদের এ বোমা হামলায় অফিসের ৩টি কক্ষ ও কাগজপত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এদিন ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান সরকারের এক মুখপাত্র বলে, 'নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার এখনও শেষ হয়নি।

সে বছরের ১ ডিসেম্বর মার্কিন সংবাদপত্র 'নিউইয়র্ক টাইমস' প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় 'বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্দেশে সামরিক বাহিনীর লোকেরা পুনরায় গ্রামবাসীদের হত্যা এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার বর্বর অভিযান শুরু করেছে। গেরিলা সন্দেহে জিঞ্জিরার কতজন যুবককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছে তার সঠিক হিসেব নেই। বুড়িগঙ্গার অপর পারের এই গ্রামটিতে অন্তত ৮৭ জনকে সামরিক বাহিনীর লোকেরা হত্যা করেছে। এদের অধিকাংশই যুবক। নারী এবং শিশুরাও ওদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। এদিন গাজীপুরের কালীগঞ্জে পাকিস্তানিবাহিনী বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের খলাপাড়া গ্রামে ন্যাশনাল জুট মিলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর পৈশাচিক গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় শহীদ হন ১৩৬ জন নিরীহ মানুষ। দিনাজপুরের ময়দান দিঘির কাছে পুটিমারীতে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী সম্মিলিতভাবে দুপুর ১২ টায় পাকিস্তানী বাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে মুক্তিবাহিনীর ৫ জন ও ভারতীয় বাহিনীর ৫৫ জন হতাহত হন। এরপর যৌথবাহিনী ময়দান দিঘি দখল করে। এদিন বিকেলে মুক্তিবাহিনী বোদা থানার কাছে পৌঁছালে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের উপর হামলা চালায়।

সিলেটের শমসেরনগরে শেষরাতের দিকে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় মুক্তিবাহিনীর তীব্র আক্রমণে হানাদার বাহিনী এই এলাকা থেকে পালাতে শুরু করে। পরে মুক্তিবাহিনী টেংরাটিলা ও দুয়ারাবাজার মুক্ত ঘোষণা করে। মুক্তিবাহিনীর অপারেশন অব্যাহত থাকায় পাকিস্তানী বাহিনী এই জেলার গারা, আলিরগাঁও, পিরিজপুর থেকে তাদের বাহিনী গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। ১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া অঞ্চলের মুক্তিবাহিনী, স্থানীয় গেরিলা বাহিনী ও জনগণ ভেলুরপাড়া রেল স্টেশনটি পুড়িয়ে দেয়। পরে ব্রীজ ধ্বংস করে স্লিপার উঠিয়ে রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ১ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি ব্যাপটিস্ট মিশনে ঢুকে হানাদারবাহিনী ধর্মযাজক চার্লস আর. হাউজারসহ বহু বাঙালিকে হত্যা করে। ১ ডিসেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হানাদার বাহিনীর একটি দল বাঙ্কারে রক্ষ্মণাত্মক অবস্থানের সময় বিষধর সাপের ছোবলে ৫ জন হানাদার সেনা নিহত হয়।

১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২নং সেক্টরে ক্যাপ্টেন এমএ মতিনের দল, মিত্রবাহিনী ও ২য় বেঙ্গলের একটি বাহিনী সম্মিলিতভাবে আখাউড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ঘিরে ফেলে আক্রমণ চালায়। দুই পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়।