ভেনেজুয়েলায় অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন , ভেনিজুয়েলাকে যেন অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়া না হয়। এছাড়া হামলার পেছনে জায়নবাদী প্রভাবের কথাও বলেছেন ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। এএফপি, এনডিটিভি, রয়টার্স, আল-জাজিরা।

ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘ। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ভেিেনজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে আন্তর্জাতিক আইনের যে ক্ষুণ্ন হয়েছে, তা স্পষ্ট।

এক বিবৃতিতে ওই মুখপাত্র বলেছেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক ভেনিজুয়েলার ‘‘পরিস্থিতি’’ নিয়ে ‘‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’’। ওয়াশিংটনের তত্ত্বাবধানে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দায়িত্ব পালন শুরু করায় বহু ভেনিজুয়েলাবাসী আতঙ্কিত। একই সঙ্গে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম তেল কোম্পানিগুলোর সহায়তায় ভেনিজুয়েলার তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি স্পষ্ট যে এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতিকে ক্ষুণ্ন করেছে রাষ্ট্রসমূহ কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হুমকি কিংবা বলপ্রয়োগ করতে পারে না।

‘‘যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা সরকারের দীর্ঘদিনের ভয়াবহ মানবাধিকার রেকর্ডের কথা উল্লেখ করে হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা দেখিয়েছে; কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায় না। ভেনিজুয়েলার জনগণ ন্যায়সঙ্গত ও ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহি পাওয়ার যোগ্য।’’

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গত প্রায় এক দশক ধরে ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতির বিষয়টি জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদনে যেভাবে উঠে এসেছে, ঠিক একই ভাবে ভেনিজুয়েলার জনগণের অধিকার দীর্ঘ সময় ধরে লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। আমরা আশঙ্কা করছি, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট বর্তমান অস্থিরতা ও দেশে অত্যধিক সামরিকীকরণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে।’

গত ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে রাজধানী কারাকাসে হামলা চালিয়ে মাদুরো ও স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ধরে নিয়ে যায় মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান গত সোমবার ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনার সতর্ক সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আঙ্কারা আন্তর্জাতিক আইনের সব ধরনের লঙ্ঘনের বিরোধী।

মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক শেষে এরদোগান বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, এমন কোনো পদক্ষেপ সমর্থন করি না। অন্য কোনো দেশের সার্বভৌম অধিকার ক্ষুণ্ন করা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে পদদলিত করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ; যা বিশ্বজুড়ে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।’

২০১৬ সাল থেকে এরদোগান ও মাদুরোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রয়েছে। সেই বছর তুরস্কে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর মাদুরো নিজে এরদোয়ানকে ফোন করে তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।

তবে সপ্তাহজুড়ে তুরস্ক সরকারের অবস্থান ছিল কিছুটা নীরব। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে শুধু ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানানো হয়। এমনকি সপ্তাহান্তে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে কথা বললেও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিলেন এরদোগান।

উল্লেখ্য, সাবেক মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার সঙ্গে এরদোগানের বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর সঙ্গে এরদোয়ানের বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

তিনি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করে মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ বলে বর্ণনা করেন এরদোয়ান।

এরদোগান বলেন, ‘ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে আমাদের প্রচেষ্টা তুরস্ক ও ভেনিজুয়েলার বন্ধুত্বপূর্ণ জনগণের জন্য যা সবচেয়ে ভালো ও সঠিক, তা করার দিকেই নিবদ্ধ। প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও ভেনেজুয়েলার জনগণ বারবার প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা আমাদের দেশের অকৃত্রিম বন্ধু।’ তিনি বলেন, তুরস্ক ভেনিজুয়েলার পাশে থাকবে এবং দেশটির স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে আমাদের প্রচেষ্টা তুরস্ক ও ভেনিজুয়েলার বন্ধুত্বপূর্ণ জনগণের জন্য যা সবচেয়ে ভালো ও সঠিক, সেটি করার দিকেই নিবদ্ধ। প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও ভেনিজুয়েলার জনগণ বারবার প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা আমাদের দেশের অকৃত্রিম বন্ধু। তুরস্ক ভেনিজুয়েলার পাশে থাকবে এবং দেশটির স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

বিভিন্ন খবরে জানা গেছে, গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে তুরস্কে নির্বাসনে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। গতকাল ভোরে ট্রাম্পের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ভেনিজুয়েলার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দেশটিতে মার্কিন হামলায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৮০–তে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলে নিয়ে যাওয়ার এ ঘটনার পেছনে ‘জায়নবাদী সুর’ রয়েছে।

মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রদ্রিগেজকে ভেনিজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।

শনিবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে রদ্রিগেজ বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার স্তম্ভিত যে ভেনিজুয়েলা এ ধরনের হামলার শিকার হয়েছে। এ হামলার পেছনে নিঃসন্দেহে জায়নবাদী প্রভাব রয়েছে।’

ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে বিভক্ত মার্কিনরা

সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে আসার ঘটনায় মার্কিনরা প্রায় সমানভাবে পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এক জনমত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল সোমবার রয়টার্স/ইপসোস প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৩ শতাংশ মার্কিন মাদুরোকে ধরে নিয়ে আসার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ ৩৪ শতাংশ বিপক্ষে মত দেন। ৩২ শতাংশ নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেননি।

এমনকি বেশির ভাগ মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনিজুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও বিরোধী। এ–সংক্রান্ত জরিপে ৪৬ শতাংশ তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিপক্ষে এবং ৩০ শতাংশ পক্ষে মত দিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকেরা ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযানের পক্ষে বেশি মত দিয়েছেন। ভেনিজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পক্ষে যাঁরা মত দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ রিপাবলিকান, ১১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ২৩ শতাংশ কোনো দলের সমর্থক নন।

মাদুরোকে ধরে নিয়ে আসার পর এখন ভেনিজুয়েলা কে শাসন করবে, তা নিয়ে একটি জরিপে দেখা গেছে, ওয়াশিংটন দেশটি পরিচালনা করুক এটা বেশির ভাগ মার্কিন চান না।

জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩ শতাংশ মানুষ চান না কারাকাসে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগপর্যন্ত ওয়াশিংটন ভেনিজুয়েলাকে শাসন করুক। তবে এ ক্ষেত্রে ৩৪ শতাংশ সমর্থন করেন, আর ২০ শতাংশ নিশ্চিত নন।

ফলাফল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সৈন্য মোতায়েনের পক্ষে নন। ৪৭ শতাংশ মানুষ সেনা মোতায়েনের বিরোধী এবং ৩০ শতাংশ সমর্থন করেন।

এমনকি বেশির ভাগ মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনিজুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও বিরোধী। এ–সংক্রান্ত জরিপে ৪৬ শতাংশ তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিপক্ষে ও ৩০ শতাংশ পক্ষে মত দিয়েছেন।