চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ৭ নভেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে পাঁচজন সদস্যও পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে কমিশন অচল পুনর্গঠনের অভাবে। দাফতরিক কাজকর্ম ছাড়া মানবাধিকার নিয়ে কোন অভিযোগের নিষ্পত্তি হচ্ছে না গত ১৪ মাস ধরে। ফলে কমিশনের কাছে আসা নানা ধরনের ৪৭১টি অভিযোগ পড়ে আছে। ফাইলবন্দী এসব অভিযোগ নতুন কমিশনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে একদিকে, অপরদিকে সেবা বন্ধ। কমিশনের হাতে থাকা অভিযোগের মধ্যে সবচে বেশি অভিযোগ জমিজমা-সম্পত্তি দখল নিয়ে। এরপর রয়েছে, চাকরি, বেতনভাতা, ইউনিয়ন, কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত, মিথ্যা মামলা ও পুলিশের বিরুদ্ধে।

জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইউশা রহমান দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, কমিশনের দৈনন্দিন কাজকর্ম চলছে। তবে, কমিশনের ওপর অর্পিত যে সব দায়িত্ব রয়েছে, তার সমাধান হচ্ছে না। কমিশনের অভাবে গত একবছরে (জানুয়ারী-ডিসেম্বর‘২০২৫) জমা পড়া ৪৭১ টি নানা ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির এখতিয়ার শুধুমাত্র কমিশনের। তাই আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভিযোগগুলো ফাইলবন্দী করে রেখেছি। নতুন কমিশন আসলে ওইসব অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সূত্র জানায়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় জমা পড়ে থাকা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, হত্যা ঘটনা নিয়ে অভিযোগ ২টি, ধর্ষণের অভিযোগ ৭টি, যৌতুকের জন্য নির্যাতন নিয়ে অভিযোগ ৪ টি, যৌন হয়রানির ১টি, পারিবারিক সহিংসতার ১৫টি, নারীর প্রতি সহিংসতার ২টি, পারিবারিক বিষয় যেমন: দাম্পত্যকলহ, তালাক, ভরণপোষণ ইত্যাদি নিয়ে ১৩টি, শিশু নির্যাতনের ৩টি, বাল্য বিবাহ‘র ১টি, শারীরিক নির্যাতন/স্কুল কলেজে শাস্তির ৩টি, নিখোঁজ/গুম নিয়ে ৬টি, বিচার বহির্ভূত হত্যা নিয়ে ১টি, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ৩৫টি, মিথ্যা মামলার অভিযোগ ৫৫টি, অপহরনের ৪টি, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ১টি, ক্ষুদ্র-নৃ-তাত্ত্বিক/দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে ১টি, স্বাধীনভাবে চলাচলে বাধা/ মত প্রকাশে বাধার ২টি, নিরাপত্তা ও হুমকির ৩৭টি, চাকরি/বেতন-ভাতা/ইউনিয়ন/কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত অভিযোগ ৫৪টি, জমিজমা/সম্পত্তি দখলনিয়ে অভিযোগ ৭২টি, হাসপাতাল/চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত ১০টি, বিভিন্ন ভাতা সম্পর্কিত ১টি, প্রবাসী শ্রমিক নিয়ে অভিযোগ ৬টি, আইনগত সহায়তা নিয়ে ৩টি, সম্পত্তির উত্তরাধিকার বিষয়ক ১০টি, পরিবেশ সংক্রান্ত ৪টি, দুর্নীতি সংক্রান্ত ১৭টি, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত ২১টি, বেসরকারী মানবাধিকার সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ ১টিসহ অন্যান্য অভিযোগ ৭৯টি।

সুত্রমতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে কোনো অভিযোগ এলে প্রথমে তা যাচাই-বাছাই করা হয়। কমিশনের তিনটি বেঞ্চে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়। একটি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ১ নম্বর বেঞ্চ এবং একটি সার্বক্ষণিক সদস্যের নেতৃত্বে ২ নম্বর বেঞ্চ। আরেকটি আছে আপস বেঞ্চ, যেখানে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। সেটিও একজন সদস্যের নেতৃত্বে। এখন কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষণিক সদস্য ও সদস্যরা না থাকায় একটি বেঞ্চও কার্যকর নেই।

জানা গেছে, বিগত ১৪ মাস ধরে দেশজুড়ে মানবাধিকার লংঘনের ছোটবড় অনেক ঘটনাই ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ উঠলেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। কারণ, কাগজে-কলমে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে কমিশনই নেই। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নভেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পদত্যাগ করেন। এরপর কমিশন পুনর্গঠন করা হয়নি। ফলে মানবাধিকারবিষয়ক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার একেবারে শেষ সময়ে এসে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন ও কমিশনার নিয়োগে তোড়জোড় শুরু করেছে।

সুত্র জানায়, দীর্ঘ সময় ধরে অকার্যকর হয়ে থাকা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জন্য নতুন চেয়ারম্যান ও ৫ জন কমিশনার খুঁজতে গত ১২ জানুয়ারী টনক নড়ে আইন মন্ত্রনালয়ের। গঠন করা হয় বাছাই কমিটি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ছয় সদস্যের এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুবকে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কুবলেশ্বর ত্রিপুরা। এছাড়া জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি বা তার মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি এই কমিটির সদস্য হবেন। আইন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে বলা হয়, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে।

এর আগে, সরকার গত ডিসেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর সংশোধিত গেজেট জারি করে। নতুনভাবে জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভাগ গঠন, স্বাধীন বাজেট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্বাধীনতাবঞ্চিত ব্যক্তিদের সুরক্ষায় বিস্তৃত ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে সেখানে।

মানবাধিকার কমিশনের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বা অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও তদন্ত করতে পারে কমিশন। মধ্যস্থতা ও সমঝোতার মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি, ক্ষতিগ্রস্তকে আইনি সহায়তা দেওয়া, নারী ও শিশু অধিকারসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, কারাগার ও আটককেন্দ্র পরিদর্শন করে তা উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করাসহ মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া আছে।

আইন মন্ত্রণালয় সুত্র জানিয়েছে, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যক্তিদের জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করে গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। গত ২৫ জানুয়ারি ছিল তথ্য জমা দেওয়ার শেষ সময়। ৫০টির বেশি আবেদন পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার বাছাই কমিটির সভা হয়েছে। গতকাল শনিবার আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই নতুন কমিশন পূর্ণগঠন হতে পারে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ অনুযায়ী ১ জন চেয়ারম্যান, ১ জন সার্বক্ষণিক সদস্য এবং ৫ জন অবৈতনিক সদস্যের সমন্বয়ে মানবাধিকার কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে সরাসরি কোনো দ- দেওয়ার ক্ষমতা এই কমিশনের নেই। রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনে প্রতিষ্ঠানটি তার কণ্ঠ উচ্চকিত করতে পারে, সুপারিশ করতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়নি এ প্রতিষ্ঠানকে। এ নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরা নানা সময়ে সমালোচনাও করেছেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, যা ২০০৯ সালের আইনের (পরে সংশোধিত) অধীনে মানবাধিকারের সুরক্ষা ও প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশে গঠিত এই কমিশন অভিযোগ তদন্ত, সুয়ো মোটো (স্বপ্রণোদিত) পদক্ষেপ গ্রহণ এবং মানবাধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক ২০২৫ সালের নতুন অধ্যাদেশের খসড়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নতুন ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক বা অন্যান্য যেকোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা রাখা হয়েছে।