ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানে খুশি ছিলেন ভোটাররা। ভোটের আগের দিন সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ-আতঙ্ক থাকলেও ভোটের দিন চিত্র ছিল ভিন্ন। অনেকেই মনে করেন- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে এসে ভোট প্রদান করেছেন। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়াও ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলেই মনে করেন সাধারণ মানুষ।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার কয়েকটি সরেজমিনে দেখা গেছে- ভোট কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে সেনাবাহিনীর টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। একটি কেন্দ্র ভোট প্রদান করে সেনাবহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘আপনারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নির্ভয়ে ভোট দেবেন। আজকে আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন।’ সকাল সোয়া ১০টার দিকে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। সেনাপ্রধানের এই আহ্বানে মানুষের মাঝে আরও স্বস্তি ফিরে আসে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর আন্তরিকতা নিয়ে অপরাধ দমনে এগিয়ে আসায় প্রশংসিত হয়েছে। অনেকেই অতীতের কয়েকটি নির্বাচনের চেয়ে এবারের বহুল কাক্সিক্ষত ভোটে সেনাবাহিনীর তৎপরতাকে দেশের জন্য কল্যাণকর বলে মনে করেছেন। সেনাবাহিনী ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটের ভূমিকাও ছিল প্রশংসিত। বিশেষ করে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের তৎপরতায় দুষ্কৃতকারীরা ভোট কেন্দ্রের আশেপাশেও আসতে সাহস দেখায়নি।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে সেনাপ্রধান বলেছেন, আপনারা যারা মিডিয়ার লোক, ভোট দিতে পারছেন না, আপনারা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। দেশের পরিস্থিতি জনগণকে জানাচ্ছেন। জনগণ আশ্বাস্ত হচ্ছেন এবং ভোট দিতে যাওয়ার জন্য উৎসাহি হচ্ছেন। এদিন ৩২ বেলা সোয়া ১০টার দিকে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন সেনাপ্রধান।
গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার সরকার পতনের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা চাঁদরে ঢেকেে দেয়া হয় দেশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নির্ভয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে এসে ভোট দেয়ার ওপর নির্ভর করছে করছে নির্বাচ সুষ্ঠু হওয়ার মানদন্ড। এই বিষয় মাথায় রেখে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকে। রাজধানীসহ সারাদেশকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে নিরাপত্তা ছক তৈরি করা হয়। ছিল পোশাকের পাশাপাশি সাদাপোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারি। ডগ স্কোওয়াড, সোয়াদ টিম, বোম্ব ডিসপ্পোজাল ইউনিটসহ তৎপর রয়েছে চৌকশ টিম। বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকার পরও একটি পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ আসছে।
এর আগে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শিশুমেলা এলাকায় শেরেবাংলা নগরের ২৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাম্প কমান্ডার মেজর ফুয়াদের চেকপোস্টকালে তিনি সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সড়কে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। প্রতিটি ভোটার এবং ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তায় আমাদের মূল উদ্দেশ্য। এই এলাকায় যত ভোটার আছেন তারা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারে তাদের নিরাপত্তার জন্যই আমরা নিয়োজিত আছি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সেনাবাহিনী চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করছে। এ সময় সড়কে চলাচলকারী মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য গাড়ি তল্লাশি করছেন তারা। চেকপোস্টকালে তিনি সাংবাদিকদের জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে সড়কে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। প্রতিটি ভোটার এবং ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তায় আমাদের মূল উদ্দেশ্য। এই এলাকায় যত ভোটার আছেন তারা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারে তাদের নিরাপত্তার জন্যই আমরা নিয়োজিত আছি। আমরা সকাল থেকে এখানে চেকপোস্ট করছি। চেকপোষ্টে যেসব গাড়ি চলাচল কথা নয় এবং সরকার কর্তৃক যেসব যানবাহনকে সীমিতকরণ করা হয়েছে তাদেরকে ধরছি এবং আইনের হাতে সোপর্দ করছি। তিনি আরো বলেন, আমরা এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এবং ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে এবং প্রত্যেকটি কেন্দ্রে টহল টিম রয়েছে। ভোটকেন্দ্রে কোনো বিশৃঙ্খলা হলে সে ক্ষেত্রে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। আমরা এটাকে মোটেও কোনো ছাড় দেব না বা প্রশ্রয় দেব না, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশনে যাব এবং যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করব। সকাল থেকে কোনো ধরনের তবে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল পেয়েছি সেগুলোকে আমরা জব্দ করেছি।
বডি ওর্ন ক্যামেরায় সবকিছু রেকড : ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং সদস্যদের বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার—সব মিলিয়ে নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন সাধারণ ভোটাররা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটাররা নির্বিঘ্নে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন। কোথাও এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু রাখতে এবার বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ, আনসার, র্যাব ও বিজিবি ও সেনা সদস্যরা মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যের শরীরে বডি ওর্ন ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়েছে, যাতে কেন্দ্রের ভেতর-বাইরের কার্যক্রম রেকর্ড থাকে। একাধিক ভোটার বলেন, আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার নিরাপত্তা বেশি চোখে পড়ছে। কেন্দ্রে ঢোকা থেকে বের হওয়া পর্যন্ত কোনো ঝামেলা হয়নি। বারিধারায় ডিওএইচএসে স্কলার্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোটকেন্দ্রে সোবহান ইসলাম নামের একজন ভোটার বলেন, বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকায় কেউ অনিয়ম করতে সাহস পাবে না। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে। দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বডি ওর্ন ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও প্রয়োজন হলে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এতে ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার অভিযোগ উঠলে দ্রুত যাচাই করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি। ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, সকাল থেকে ভোটকেন্দ্রগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে উল্লেখ করে, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও ফলাফল মেনে নেওয়ার বক্তব্য এসেছে। টিভি স্ক্রিনে দেখলাম, উভয় দলই বলছে ফলাফল যাই হোক তারা মেনে নেবে। যেহেতু স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোট হচ্ছে সবাই সেটা মেনে নেবেন এটাই স্বাভাবিক।
জীবনের প্রথম ভোট র্যাব মহাপরিচালকের : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়ে নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। তিনি বলেন, জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। পেশাগত কারণে আগে কখনো ভোট দেওয়া হয়নি। রাজধানীর গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। র্যাব মহাপরিচালক বলেন, ব্যালট বক্স ছিনতাই হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কেউ চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ফলাফলের পর কেউ ঝামেলা করার চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা যে প্রত্যাশা করেছিলাম তার চেয়ে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হয়েছে।