প্রায় দেড় যুগ পর দেশের মাটিতে পা রাখলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ সময় পর তার এই আগমনে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ছিল বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। এই উচ্ছ্বাস হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে রাজধানীর তিনশ’ফুট ছাড়িয়ে পুরো রাজধানীতে ছড়িয়ে পরে। এদিন চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সবখাবে তারেক রহমানের আগমণ নিয়ে আলোচনা চলে। তারেক রহমানকে একনজর দেখার জন্য ঢাকার ৩০০ ফিট সড়কে তরুণ-যুবা, বৃদ্ধ-শিশুর ঢল নামে। প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার জন্য সারাদেশ থেকে যে যেভাবে পারেন ঢাকায় আসেন। কেউ আসেন ট্রেনে, কেউ বাসে আবার কেউ আসেন লঞ্চে। আবার কাউকে কাউকে আসতে দেখা গেছে রিকশা কিংবা পায়ে হেঁটেও। যারা একটু কাছে থেকে দেখতে চেয়েছিলেন তারা চলে আসে একদিন আগেই।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে বের হয়ে খালি জায়গায় খালি পায়ে মাটি স্পর্শ করে একমুঠো মাটি হাতে নেন তারেক রহমান। এরপর বুলেট প্রুফ গাড়ি বাদ দিয়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ খচিত লাল সবুজ রংয়ের একটি বাসে চড়ে অপেক্ষমাণ সংবর্ধনা মঞ্চের দিকে রওনা হন। এসময় তাঁর সাথে ছিলেন দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। পুরো রাস্তায় তিনি বাসের সামনে থেকে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান তারেক। এসময় বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। নেতাকর্মীরা স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় পুরো এলাকা। তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বিমানবন্দরগামী ইনকামিং ও আউটগোয়িং সড়কের দুই পাশে অবস্থান নেন বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। স্লোগানে স্লোগানে মুখর পুরো বিমানবন্দর সড়ক।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান যান রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসারত মা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন তিনি। এরপর সেখান থেকে বিমানবন্দর সড়ক হয়ে গুলশানের বাসায় যান তারেক রহমান।

তারেক রহমানকে সংবর্ধনা দিতে আসা নেতাকর্মীরা জানান, তারেক রহমানকে বরণে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল। এই প্রাণচাঞ্চল্য ও উল্লাসকে তারা দেখেছেন এটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে। নেতাকর্মীদের এই উল্লাস আগামী নির্বাচনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এদিন রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা ছিল উত্তেজনা, আবেগ আর অপেক্ষার উত্তাপে মুখর। তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে পুরো বিমানবন্দর এবং ৩০০ ফিট এলাকা রূপ নেয় এক আবেগঘন জনসমুদ্রে।

গতকাল সকাল থেকেই বিমানবন্দরের আশপাশের সড়ক, ফুটপাত ও খোলা জায়গাজুড়ে জড়ো হন বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। হাতে দলীয় পতাকা, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড। স্লোগানে স্লোগানে মুখর চারপাশ- ‘তারেক রহমান ফিরে এসো’; ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’; ‘জিয়া পরিবার এগিয়ে চলো’- এমন নানা স্লোগান চলতে থাকে। এদিন ভোর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে লঞ্চে করে বিএনপি’র হাজার হাজার নেতা-কর্মী সদরঘাটে আসতে শুরু করে। লঞ্চে করে আসা হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে স্বাগত জানাতে সদরঘাট ও এর আশপাশের এলাকায় বিশেষ অভ্যর্থনা বুথ স্থাপন করে বিএনপি। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের প্রতিটি প্রবেশপথ, পন্টুন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশে সারি সারি মিছিল অবস্থান করতে দেখা যায়। এ ছাড়া সদরঘাট থেকে বিমানবন্দর অভিমুখে যাতায়াতের জন্য স্বেচ্ছাসেবকরা নেতাকর্মীদের পথ-নির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করেন।

এদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাক, বাস ও মোটরসাইকেলে কিংবা পায়ে হেঁটে পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কের দিকে ছুটে আসেন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী সমর্থক। আবার যারা মঞ্চের কাছাকাছি যারা যেতে পারেননি তারা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে সড়কের পাশে চলে আসেন এবং অপেক্ষা করেন। এসময় তারা ‘তারেক রহমান আসছে, রাজপথ কাঁপছে’, ‘তারেক রহমান বীরের বেশে, আসছে ফিরে বাংলাদেশে’, ‘তারেক রহমান ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত নেতাকর্মীরা। পুরান ঢাকার সাত্তার মিয়া নামের এক বিএনপির কর্মী বলেন-- আমি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি করা লোক। জীবদ্দশায় জিয়ার আদর্শ আর দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়ে বিএনপিতে এসেছি। এখন তার ছেলেকে দেখতে এখানে এসেছি। তারেক রহমানের সংবর্ধনায় অংশ নিতে ভোলা থেকে আসা মাকসুদুর রহমান বলেন, সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছেছি। এখন রাজধানীর ৩০০ ফিটে যাবার কথা। কিন্তু গাড়ি না পেয়ে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছি।

বিমানবন্দরে ক্ষোভ :

নিরাপত্তার কড়াকড়িতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে অনেকে প্রবাসী পড়েন বিপাকে। অনেক প্রবাসীকে বহন করার জন্য আসা গাড়ি প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনেকদিন পর দেশে ফিরে এমন সংকটে পড়তে হবে তা জানা ছিল না। গাড়ি প্রবেশ করতে না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান তারা।

রাজধানীতে গণপরিবহন সংকট :

এদিকে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজধানীতে যানবাহন কমে যায়। বিশেষ করে কুড়িল থেকে বাড্ডা লিং রোড এই সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর রাইড চালকরা লোকজনকে জিম্মি করে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ ভাড়া আদায় করেন। উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় রমজান আলী ও রফিকুল ইসলাম। আগারগাঁও পর্যন্ত আসার পর আর কোনো যানবাহন পাননি। বাধ্য হয়ে পাঠাও রাইড নিয়ে তারা নর্দা পর্যন্ত আসেন। তার অভিযোগ, এটুকু পথের জন্য তাদের দু'জনকে গুনতে হয়েছে ৫০০ টাকা। যা অন্য সময়ে দুজনে ৩০০ টাকায় অনায়াসে আসা যায়।

তারেক রহমানের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা লোকাল বাস ভাড়া করে অনুষ্ঠানস্থলে রওনা দেন। এতে করে হঠাৎ করেই রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে লোকাল বাসের সংখ্যা কমে যায় এবং কর্মঘণ্টার শুরুতেই সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। সকাল ৮টার পর থেকেই মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও ডেমরার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে লোকাল বাসের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেসব বাস সাধারণত নিয়মিত রুটে চলাচল করে, সেগুলোর একটি বড় অংশ দলীয় কর্মসূচির জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়। অনেকেই নিরুপায় হয়ে রিকশা, সিএনজি কিংবা বেশি ভাড়া দিয়ে বিকল্প পরিবহনে উঠতে বাধ্য হন।

বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা জানান, কোনো কোনো রুটে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাসের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে একটি বাস এলেই যাত্রীদের ভিড় ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এতে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের বেশি সমস্যায় পড়তে দেখা গেছে। কেউ কেউ সময় বাঁচাতে হেঁটে বা রাইড শেয়ারিংয়ের আশ্রয় নেন, তবে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেকের জন্য সেটিও সহজ ছিল না। এদিকে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক কর্মসূচির দিনে বাস ভাড়া দেওয়া নতুন কিছু নয়। তবে একসঙ্গে বড় পরিসরে বাস ভাড়া নেওয়ায় স্বাভাবিক যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। কয়েকজন চালক জানান, মালিকপক্ষের নির্দেশে তারা নির্দিষ্ট কর্মসূচির জন্য বাস নিয়ে বের হন। এতে লোকাল রুটে চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।

পল্টন এলাকায় অপেক্ষমাণ বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদ মাহমুদ বলেন, প্রতিদিন আধা ঘণ্টার মধ্যেই অফিসে পৌঁছে যাই। আজ দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও বাস পাচ্ছিলাম না। পরে বেশি ভাড়া দিয়ে অন্য যানবাহনে যেতে হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য সাধারণ মানুষের এভাবে ভোগান্তিতে পড়া খুবই দুঃখজনক। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ী এলাকার এক বাসের সহকারী কামাল হোসেন জানান, সকাল থেকেই আমাদের বাস প্রোগ্রামের জন্য বুকিং ছিল। মালিক বলেছে, সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। লোকাল যাত্রী তুললে দেরি হবে, তাই রুটে চলিনি। এতে যাত্রীদের সমস্যা হচ্ছে, সেটা আমরাও বুঝি, কিন্তু আমাদেরও নির্দেশ মানতে হয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর বড় সমাবেশ বা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সময় আগাম সমন্বয় না থাকায় এমন পরিস্থিতি বারবার তৈরি হয়। লোকাল বাস দীর্ঘ সময়ের জন্য ভাড়া নেওয়া হলে বিকল্প পরিবহন নিশ্চিত করার উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। নাহলে কর্মজীবী মানুষের ক্ষতি যেমন হয়, তেমনি নগর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দও ব্যাহত হয়।

এদিকে দূরপাল্লার যাত্রীদের ট্রলি ব্যাগ হাতে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে অনেককে হেঁটেই সড়ক পার হতে দেখা গেছে। কখন কোথায় গাড়ি পাওয়া যাবেÑ এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকায় যাত্রীরা পড়েন অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে। কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজটের কারণে কোথাও কোথাও পুরো রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এতে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যান চলাচলেও বিঘœ ঘটে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। অনেক পথচারী জানান, কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে গিয়ে তারা শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করেন। রামপুরা এলাকার এক অফিসগামী যাত্রী রায়হান ইসলাম বলেন, সকাল থেকে কোনো বাস পাইনি। অফিসে পৌঁছাতে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। আগে জানলে আজ বেরই হতাম না। অন্যদিকে বাড্ডা থেকে পল্টনগামী এক শিক্ষার্থী বলেন, কোচিংয়ে পরীক্ষা ছিল। গাড়ি না পেয়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। এত ভিড় আর জ্যামে ভয়ও লাগছিল।