তিন দিনব্যাপী তৃতীয় বাংলাদেশ জ্বালানি সম্মেলন গতকাল শনিবার শুরু হয়েছে। সম্মেলেন সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি) দ্রুত সংশোধন করে তাতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, জ্বালানি খাতে অতীতে নীতিগত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। বিদেশী পরামর্শকদের মহাপরিকল্পনা কখনোই নবায়নযোগ্য শক্তিকে অগ্রাধিকার দেয় না। তাই পরিকল্পনায় দেশীয় বিশেষজ্ঞদের বেশি যুক্ত করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ‘রাতারাতি’ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে লাফ দেওয়া সম্ভব হবে না । এখন মানুষ গ্যাস চায়। আপনি নবায়নযোগ্য চান। এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে উত্তরণে আমাদের যেটুকুন সময় লাগবে সেটুকুন সময় আমাদেরকে দিতে হবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ মিলিটারি মিউজিয়ামে তিন দিনব্যাপী তৃতীয় বাংলাদেশ জ্বালানি সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিডব্লিউজিইডি’র আহ্বায়ক অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ‘রাতারাতি’ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে লাফ দেওয়া সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বরং ‘বাস্তবভিত্তিক পথনকশা’ ধরে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, এখনো যখন আমাদেরকে বলে বিভিন্ন জায়গায় শিল্পপতিরা তাদের কারখানায় গ্যাস পাচ্ছে না। গ্যাস সমস্যা নিয়ে আমার নিজের বাসাতেও তো ‘সমস্যা আমি ফেইস করছি’ কিন্তু। আপনারাও অনেকের মিরপুরে যাদের বাসা আপনারা ফেইস করছেন।
তিনি বলেন, এখন মানুষ গ্যাস চায়। আপনি নবায়নযোগ্য চান। এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে উত্তরণে আমাদের যেটুকুন সময় লাগবে সেটুকুন সময় আমাদেরকে দিতে হবে। সেটুকুন বিনিয়োগ আমাদেরকে করতে হবে। এটা সরকারের প্রাধিকার হিসেবেই সরকারকে নিয়ে করতে হবে। কিন্তু রাতারাতি এই ‘জাম্পটা’ করে ফেলা হয়তো সম্ভব হবে না। রাতারাতি’ না করে একটা লক্ষ্য ধরে সে মোতাবেক পরিকল্পনা ও ‘বাস্তবভিত্তিক পথনকশা’ তৈরির কথা বলেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের এই দেড় বছরে মারাত্মক...শুরুর পর্যায়টা কেমন ছিল আপনারা দেখেছেন। এখন আমরা নির্বাচনমুখী হয়ে গেছি। সত্যিকার অর্থে আমরা ‘কংক্রিট’ কাজ করার সময় পেয়েছি এক বছর মতন। সেখানে আমরা নীতিতে যেটুকু পরিবর্তন আমাদের বিবেচনায় সঠিক মনে হয়েছে, অর্জনযোগ্য মনে হয়েছে আমরা সেটা করেছি। এবং সেটা করে বসে থাকি নাই, ওইটা ‘রোল আউট’ করছি যে সরকারকে দিয়েই আমাদের কাজটা শুরু।”
রিজওয়ানা হাসান বলেন, এখন যখন সচিবালয়ে নতুন ভবনের কথা তুলি তখন সেখানে কথা হচ্ছে যে সেটাকে শতভাগ নবায়নযোগ্য করা যায় কিনা। এগুলোর জন্য যে বিনিয়োগ লাগে সেটা আমাদের সহজলভ্য কিনা। অনেক টাকা রেখে আমাদের জন্য আগের সরকার চলে যায় নাই। এটাও একটু মনে রাখতে হবে। কিন্তু তারপরেও এগুলোকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখছি না, অতিক্রম করার চেষ্টা করছি। ‘ইটস জাস্ট গেটিং টাইম কনজিউমিং’।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘কার্যকর জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সঠিক নীতি এবং দক্ষ জনবল এই তিনটির সমন্বয় অপরিহার্য। বিদেশী পরামর্শক নির্ভরতা কমিয়ে নীতি বাস্তবায়নে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।’
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নীতিগত প্রতিবন্ধকতার প্রসঙ্গ তুলে সেন্টার ফর রিনিউয়েবল এনার্জি সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রতি বছর বিদ্যুৎ খাতে ৪ বিলিয়ন ডলার সাবসিডি দিতে হচ্ছে। এর অর্ধেক নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ব্যয় করলে খাতের চিত্র পাল্টে যেত। কিন্তু নীতিমালা নবায়নযোগ্যবান্ধব নয় বলেই অগ্রগতি ধীর।’ আইইপিএমপিতে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জ্বালানি খাতে অতীতে নীতিগত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। বিদেশী পরামর্শকদের মহাপরিকল্পনা কখনোই নবায়নযোগ্য শক্তিকে অগ্রাধিকার দেয় না। তাই পরিকল্পনায় দেশীয় বিশেষজ্ঞদের বেশি যুক্ত করতে হবে।’
জ্বালানি রূপান্তরে আইনগত স্বচ্ছতার গুরুত্ব তুলে ধরে লিড বাংলাদেশের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনুজ্জামান বলেন, ‘জ্বালানি রূপান্তর শুধু প্রযুক্তি নির্ভর নয়; জনগণের অংশগ্রহণ, প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।’
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, ‘ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তরের কেন্দ্রে রাখতে হবে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠকে এবং নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।’
বাংলাদেশ জ্বালানি সম্মেলন শুরু হয় ২০২৩ সালে। প্রথম সম্মেলনে ২৮৩ জন এবং দ্বিতীয় সম্মেলনে চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। গত এক বছরে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন না দেওয়া, নবায়নযোগ্য খাতে কর অবকাশ, ৫,২৩৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের দরপত্র আহ্বান এবং ছাদভিত্তিক ৩,০০০ মেগাওয়াট প্রকল্প গ্রহণÍ এগুলোকে অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন বক্তারা।
তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২,২২০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর অনুমোদনে অলস সম্পদের বোঝা আরও বেড়েছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারকে ৩২,৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এদিকে এলএনজি আমদানি ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪০,৭৫৯ কোটি টাকা, যা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ১৬টি সহযোগী সংগঠন নিয়ে আয়োজিত এই তৃতীয় জ্বালানি সম্মেলনকে জ্বালানি নীতি, নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও সংলাপের ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।