জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া আইন ও বিল আকারে না আনা বিল নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আইন মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া ব্যাখ্যা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দুই সিনিয়র আইনজীবী ও নেতা ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট শিশির মনির। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানাধীর মগবাজারস্থ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং চিফ হুইপ এর বক্তব্যের জবাব দেন। এ প্রেক্ষিতে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট্ এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট শিশির মনির। উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসাইন এমপি, সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব সালেহী, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান এবং মেজর (অব.) সাবেক এমপি আখতারুজ্জামান, সিনিয়র সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান।

সংবাদ সম্মেলনে সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কারের অংশ হিসেবে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে আমি গেস্ট হিসেবে অবদান রাখি। গত ১০ তারিখ সেগুলো পাসের বাধ্যবাধকতার সময় পার হয়ে যায়। ১১০ অধ্যাদেশ হুবহু কিংবা সংশোধিত আকারে পাস করা হয়েছে। ৭টি অধ্যাদেশকে রহিত করা হয়েছে। বাকী ১৬টি অধ্যাদেশকে ল্যাপস করা হয়েছে, অর্থাৎ এগুলো সংসদে উত্থাপিত হয়নি।

তিনি বলেন, দুর্ভাগ্য হলো গত ফ্যাসিবাদ সরকারের বিদায়ের পরে জনগণ আইনের শাসন ও সংস্কার নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে বিষয়গুলোতে জোর দিয়েছিল, যারা গত ১৬টি বছর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। স¦াধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের পৃৃথক সচিবালয় স্থাপনের যে বিষয় ছিল- এ সমস্ত বিষয়কে ল্যাপস করে দেয়া হয়েছে, রহিত করে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের আশা আকাক্সক্ষা, সংস্কারের বিষয়গুলোকে অপমান করা হয়েছে। ধুলিসাৎ করে দেয়া হয়েছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, আমরা সংসদে এ বিষয়গুলো নিয়ে ওয়াকআউট করেছি। তারা (সরকারি দল) বলেছে, বিশেষ কমিটিতে যেভাবে আলোচনা হয়েছে বিলগুলো সেভাবে উত্থাপিত হয়েছে, ল্যাপস হয়েছে কিংবা সংশোধিত আকারে উত্থাপিত হয়েছে। আমরা বিশেষ কমিটিতে যেভাবে আলোচনা করেছি, একমত হয়েছিলাম- যে বিষয়গুলোতে কোনো আপত্তি নেই সেগুলো কোনো আলোচনা ছাড়াই আমরা সমর্থন করব, বিলগুলো পাস হয়ে যাবে। যেসব বিষয়ে আপত্তি রয়েছে, নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলাম- সেগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এই ওয়াদা ওরা(সরকারদলীয় এমপি) ভঙ্গ করেছেন।

তিনি বলেন, জনগণের সাথে স্পর্শকাতর ইস্যু হওয়ায় সংসদের ভিতরে কথা বলতে না দেয়ায় আমরা সংসদের বাইরে এসে কথা বলছি। বিশেষ কমিটির একটি প্রকাশিত রিপোর্টে হিউম্যান রাইটস কমিশনের বিষয়ে এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়, সুপ্রিম কোর্টের বিষয়ে আমরা ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা যেসব নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন- সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি। সত্যের অপলাপ করে তাদের বক্তব্যগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। রিপোর্টে থাকা ৯৮টি বিল হুবহু পাস করার কথা বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংসদে আলোচনার জন্য সরকারদলীয় এমপিদের পজিশনকে তুলে ধরার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেয়া হলেও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কম সময় দেয়া হয়। পরে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিবাদের পর সময় বাড়ানো হয়।

মোমেন আরও বলেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রকাশিত রিপোর্টে যে বিলগুলো রয়েছে তা সংসদে সেভাবে উত্থাপন করেননি। পুলিশ কমিশন যে অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে উত্থাপিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটি উত্থাপন করা হয়নি। নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও এক মাস পর সংসদ অধিবেশ আহ্বান করে সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। এতে ১৩৩টি বিল আইনে পরিণত করার জন্য সময় খুবই কম ছিল। এটি সরকারের ইচ্ছাকৃত সময় ক্ষেপণের কৌশল ছিল। যাতে করে এসব বিষয়ে শেষ দিকে এসে বেশি আলোচনা না হয়। কিছু কিছু বিলের ব্যাপারে সরকারি দল লুকোচুরি করেছে। বিল পাসের এক ঘণ্টা আগে, ১০ মিনিট আগে, ১৫ মিনিট আগে কাগজপত্র দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ বিষয়ে কথা ছিল। বিশেষ কমিটিতে সরকারি দল বলেছিল এই বিলের ৮৬ অধ্যাদেশের অপরাধের কথা ও ৮৮ অধ্যাদেশে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়গুলো যেহেতু সুন্দরভাবে ডিফাইন করা হয়নি, তাই এই বিধিটা ল্যাপস করা হবে। পরে দেখা গেল বিলটি সংশোধিত আকারে রাখা হয়েছে। বিল উত্থাপনের মাত্র ১০ মিনিট আগে বিলের কপি দেয়া হয় সংসদ সদস্যদের কাছে। আগের অধ্যাদেশকে ল্যাপস না করে নতুন বিল আকারে আনা হয়েছে। অধ্যাদেশে ব্যাংক ডাকাতদের অর্থ ফেরত না নিয়ে কেবল একটি অঙ্গীকার নিয়ে ব্যাংকগুলো ফেরত দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই অনিয়মগুলো হয়েছে।

জুলাই জাদুঘর বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিলের বিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করেননি। মন্ত্রীকে প্রধান করে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এমনকি পরিচালক যারা থাকবেন তাদের অপসারণের ক্ষমতা প্রধানকে দেয়া হয়েছে। বিলটি সংশোধিত আকারে পেশ করা হলেও আমাদের কোনো প্রকার নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এর ফলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা চূড়ান্তভাবে ওয়াকআউট করে।

তিনি বলেন, বিএনপির একটি ইতিহাস আছে যে তারা সবসময় বলে ঈদের পওে আন্দোলন করবে। সেই ঈদ কিন্তু কখনো আসেনি। এখন যে বিলগুলোর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম কমিশন বিল ও বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের বিল। তারা বলছেন স্টেক হোল্ডারদের সাথে অধিকতর আলোচনা করে বিলগুলো আনবেন কিন্তু এটি কবে আনবেন, আমাদের ১৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে কিনা- এটিই জাতির সামনে এখন প্রশ্ন। রাষ্ট্র মেরামতের যে কাজের জন্য জনগণ বিপ্লব করেছে, গণভোটের মাধ্যমে যে ম্যান্ডেট দিয়েছে সেটির বাস্তবায়ন আমরা দেখছি সুদূর পরাহত। জনগণ যদি তাদের অধিকার বাস্তবায়ন করার জন্য সংসগের উপর আস্থা হারিয়ে রাস্তায় নেমে আসে সেজন্য জনগণের দায় দেয়া যাবে না। সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের দায় নিতে হবে। এই সরকারকে দায় নিতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে এডভোকেট শিশির মনির বলেন, গুম অধ্যাদেশে গুমের যে সংজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের যে সংজ্ঞা দুটি একই। এজন্য সরকার এটি বাদ করছেন- তাদের এই বক্তব্যটি মিথ্যা। এটি আইনগতভাবে কোনো সঠিক কথা নয়।

মানবাধিকার কমিশনের কমিশনারদের পদত্যাগের পর তাদের দেয়া খোলা চিঠির উদ্বৃতি দিয়ে শিশির মনির বলেন, খোলা চিঠিতে কমিশনাররা দেখিয়েছেন এক ধরনের অসত্য তথ্য উপস্থাপন করে আইনটিকে ল্যাপস করা হয়েছে। খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, গুম অধ্যাদেশের ২৮ ধারায় পদ্ধতিগত গুমের বিষয়টি বলা আছে।

তদন্ত সংক্রান্ত আইনমন্ত্রীর তোলা প্রশ্নের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনের ২৮, ১৬ ধারা ১৬(্ঞ ও চ) তে বলা হয়েছে ৩০ দিনের মধ্যে যদি তদন্ত শেষ করতে না পারেন তাহলে কি হবে, জরিমানা কি হবে, কিভাবে আদালত জরিমানা আদায় করবে তা স্পষ্ট বলা আছে। অথচ তারা(আইনমন্ত্রী) বলছেন আইনে এসব নেই।

গণভোটের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের বক্তব্য কোট করে শিশির মনির বলেন, তারা বলছেন এটা তো ফ্যাক্ট টার্ম ভ্যালিড, এটি ঘটনাক্রমে সিদ্ধ, আদেশ জারি হয়েছে, গণভোট হয়েছে সেটার বৈধতা আছে। এজন্য এখন আপনাদের দায়িত্ব হলো বাস্তবায়ন করা, বলেন শিশির মনির। তিনি আরও বলেন, একটি বৈধ আইন বাস্তবায়ন না হলে তার দায় দায়িত্ব সরকারের উপর থাকবে। আমরা আশা করব আপনারা (সরকার) এটিকে বাস্তবায়ন করবেন।

কোচিং সেন্টার সহ সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্যে অভিযোগে ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা বিষয়ে শিশির মনির বলেন, শোকজ নোটিশে সেসব বিষয় নেই। যে আইনে তাদের শোকজ করা হয়েছে সেই আইন বর্তমানে নেই। আইনটি সুপ্রিম কোর্ট একটি আদেশের মাধ্যমে বাতিল করে দিয়েছে। অথচ, আইন যে নাই, সরকার, আইন মন্ত্রণালয় তার খবরই রাখে না। সেই আইনে নোটিশ দিয়েছে। আইনটিকে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক বলেছেন।

বিচারকদের স্বাধীনতার বিষয়ে শিশির মনির বলেন, বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা সব ন্যাস্ত সুপ্রিম কোর্টের উপর। অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন শুধু সুপ্রিম কোর্ট। এজন্য আলাদা সচিবালয়। শুধু বিচারকার্যে স্বাধীনতা নয়, সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা থাকতে হবে। যেখানে সরকারি দল বলছে শুধু বিচারকার্যে স্বাধীনতা।

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ল্যাপস নিয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি আইনগত যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে সেগুলো সঠিক না হলে উপস্থাপন করা উচিৎ না। দেশে আইন জানা, সিনিয়র লোক, বিচারকরা রয়েছেন। কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তাদের সাথে পরামর্শ করা যেতে পারে। কিন্তু এভাবে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিচারবিভাগকে হেয় করার কোনো দরকার নেই। বিচারকদের অযথা নোটিশ পাঠানোর দরকার নেই। গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন আইনের বিরুদ্ধে এ ধরনের কথা বলার দরকার নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ গুম হলে কোথাও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন শিশির মনির। এর ফলে গুম থাকা একজন লোকের ভাগ্যে গুম থাকাটাকে আমরা উন্মুক্ত করে দিলাম। এটি খুবই খারাপ উদ্যোগ।