এলপিজি উদ্যোক্তাদের ঋণ ও এলসির আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি

রাজধানীতে গ্যাস সংকটের কারণ জানালো তিতাস। আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদীতে মালবাহী ট্রলারের আঘাতে গ্যাস বিতরণ পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ঢাকা মহানগরী এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন মেরামতের কাজ চলছে। শুক্রবার এক বার্তায় এসব তথ্য জানিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

তিতাস জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত বিতরণ গ্যাস পাইপলাইন মেরামত করা হলেও মেরামতকালীন পাইপে পানি প্রবেশ করায় এবং একই সঙ্গে ঢাকা শহরে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় ঢাকা মহানগরীতে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

আবাসিকে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি এলপি গ্যস নিয়ে কারসাজির সমাধান হচ্ছে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এমনটি জানালের বিইআরসি।

নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি বিক্রির বিষয় বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আমরা আশা করছি এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। সে বিষয়টি মাথায় রেখেই কাজ করা হচ্ছে।

এদিকে এলপিজি উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ও এলসি খোলার আবেদন দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

বৃহস্পতিবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব মিয়া মোহাম্মদ কেয়ামউদ্দিনের সই করা চিঠিটি দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক।

তিনি বলেন, লোয়াবের সঙ্গে বৈঠকে আমরা এলপিজি সেক্টরকে সবুজ শিল্প হিসেবে ঘোষণা করার অনুরোধ জানিয়েছি। এরপর বিষয়টিতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক এলপিজি সেক্টরে গ্রিন ফান্ডের কম সুদে ঋণ প্রদানে গতি আনতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এলপিজির পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধির দাবি যুক্তিসঙ্গত। তারা আবেদন করলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, পরিবেশকদের কমিশন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা, খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা, এলপি গ্যাস বহনকারী সব গাড়ির পুলিশি হয়রানি বন্ধ করা, ভোক্তা অধিকার কর্তৃক চলমান অভিযান বন্ধসহ ৬ দফা দাবি করেছে। এরমধ্যে বিইআরসির ইস্যু রয়েছে কমিশনের বিষয়টি। আমরা তাদের বলেছি, তারা যদি আবেদন জমা দেয় তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। গণশুনানি ছাড়া কমিশন বাড়ানোর সুযোগ নেই। প্রস্তাব পেলে গণশুনানি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, বিস্ফোরক অধিদফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে দেশে ১১ হাজার পরিবেশক রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন আমাদের লাইসেন্স গ্রহণ করেছে। যে কারণে তারা আবেদন করলে বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকে তারা বিইআরসিকে জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষে যে জাহাজগুলো দেশে পৌঁছার কথা, এগুলো পৌঁছতে বিলম্ব হয়েছে। এগুলো দেশে আসলে এক সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

কয়েকদিন ধরে সারা দেশে এলপি গ্যাসের ভয়াবহ সংকটের খরব পাওয়া যাচ্ছে, আর সেই সংকটকে পুঁজি করে বাড়তি টাকা হাতাচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ১৩০৬ টাকা নির্ধারিত থাকলেও অনেক জায়গায় ১৯০০ থেকে ২৫০০ টাকায় বিক্রির খবর পাওয়া গেছে।

সংকটের প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এলপিজির আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৫ হাজার মেট্রিক টন। অথচ ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১ লক্ষ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ আমদানি বৃদ্ধি হলেও বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নাই। এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের পর এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বিবৃতি প্রদান করে। এলপি গ্যাসের দামে কারসাজির দায় খুচরা বিক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে জড়িত বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। এর একদিন পরে ধর্মঘটের ডাক দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। পরে বিইআরসির সাথে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে খুলনার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্বল্প আয়ের মানুষ আমাদের খুলনা ব্যুরো জানায়

এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। হোটেল, রেস্টুরেন্টে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর মাঝে বেড়েছে হতাশা ও অসন্তোষ। ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও স্বস্তি ফেরেনি ভোক্তা পর্যায়ে।

খুলনার স্যার ইকবাল রোডস্থ হোটেল ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “গত দু’দিন আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাস ১৩শ’ টাকায় কিনেছি। কিন্তু বৃহস্পতিবার দোকানে গিয়ে দেখি ওই কোম্পানির গ্যাস নেই। অন্য কোম্পানির গ্যাস ১৫শ’ ৫০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। এটা আমাদের মত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক কষ্টসাধ্য। এর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।”

গ্যাস কিনতে আসা গৃহবধু শাহিনা বলেন, “নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হুটহাট বৃদ্ধি করলে আমাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।”

রূপসা, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটার ওমেরা কোম্পানির ডিলার সিফাত ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী আরাফাত হোসেন বলেন, “সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাস ১৩শ’ ৬ টাকায় বিক্রি করতে হবে। অথচ আমাদের কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে সরকার নির্ধারিত রেটে। মোংলা বন্দর থেকে আমাদের এ পর্যন্ত পৌঁছাতে ২০টাকা এবং লোড আনলোডের জন্য ৬ টাকা মোট ২৬ টাকা খরচ রয়েছে। এরপর কর্মচারী, দোকান ভাড়া, খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গ্যাস পৌঁছে দেওয়াসহ আনুষঙ্গিক কমপক্ষে আরও ৩০ টাকা খরচ রয়েছে। এখন বলুন আমরা কীভাবে সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি করবো।” গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, “কোম্পানিগুলোর তিন মাস পূর্বে এলসি করার কথা থাকলেও তারা যথা সময়ে এলসি না করার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এখানে আমাদের করার কিছু নেই। আমার প্রতিদিনের চাহিদা রয়েছে ৫০০ বোতল অথচ এখন পাচ্ছি ২২০ বোতল এবং আগামী দু’দিন সাপ্লাই নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।”