আবদুল কাদের মোল্লা একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি অনন্য প্রতিভা। যিনি একজন রাজনীতিবিদ, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, লেখক, ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও সদালাপী মানুষ হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর শাহাদাত বরণ করেন ইসলামী আন্দোলনের এই অগ্রসেনানী। আজীবন লালিত শাহাদাতের স্বপ্ন পূরণ করে আবদুল কাদের মোল্লা চলে গেছেন তার প্রিয় প্রভুর দরবারে। কিন্তু তাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছে। শুধুমাত্র আবদুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করার জন্য তারা দফায় দফায় আইন পরিবর্তন, মিথ্যা অভিযোগ, সাক্ষী জালিয়াতি করে স্তম্ভিত করে দিয়েছে বিশ্ববিবেককে।
জন্ম : শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৪৮ সালের ২ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলাস্থ সদরপুর উপজেলার চর বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের জরিপের ডাংগি গ্রামে নিজ মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সানাউল্লাহ মোল্লা ও মাতার নাম বাহেরুন্নেসা বেগম। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ছিলেন নয় ভাইবোনের মাঝে ৪র্থ।
শিক্ষা জীবন : আবদুল কাদের মোল্লা একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯৫৯ ও ১৯৬১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সাফল্যের সাথে পাস করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি একই কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে এরপর তাকে শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া হয়নি তখন আর। ফরিদপুরের এস এস অ্যাকাডেমি নামক একটি স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন কিছু কাল।
১৯৬৯ সালের পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি করার জন্যে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। মিষ্টভাষী ও আকর্ষণীয় চারিত্রিক মাধুর্যের অধিকারী হওয়ায় আবদুল কাদের মোল্লা হয়ে উঠেছিলেন তার সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রিয়পাত্র।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। ক্লাস পরীক্ষা না হওয়ায় তিনি গ্রামের বাড়িতে চলে যান। ২৩ মার্চ, ১৯৭১-এ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জেসিও মফিজুর রহমানের ডাকে এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং-এ অংশগ্রহণ করেন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা। ১ মে তারিখে পাকিস্তানী বাহিনী ফরিদপুরে পৌঁছার দিন পর্যন্ত তার এ ট্রেনিং অব্যাহত থাকে।
পরবর্তীতে তিনি ১৯৭২ এর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। যুদ্ধের সময় প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেকের মত আবদুল কাদের মোল্লার লেখাপড়াতেও ছন্দ পতন ঘটে। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই ই আর বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের ডিপ্লোমায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে আবার ১৯৭৭ সালে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রীতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।
বিয়ে ও কর্মজীবন : শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে যোগ দান করেন। এমএড পরীক্ষার রেজাল্টের পরে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন এবং পরে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে রিসার্চ স্কলার হিসাবে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
আবদুল কাদের মোল্লা বেগম সানোয়ার জাহানের সাথে ১৯৭৭ সালের ৮ অক্টোবর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার দুই পুত্র ও চার কন্যা। সব সন্তানই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
সাংবাদিকতা : আবদুল কাদের মোল্লা একজন নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন। বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ দৃশ্যে তিনি আমাদের কাছে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হলেও জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময়টা অতিবাহিত করেছেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে। গৌরব-সাফল্যের ধারাবাহিকতায় উদয়ন উচ্চ-বিদ্যালয়, রাইফেলস পাবলিক স্কুল এবং মানারাত স্কুলের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮১ সালে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন তিনি। শিক্ষকতা পেশায় যে সত্যের পরশ পেয়েছিলেন, তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তিনি সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে তার উপর পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পিত হয়। এ সময়ে তার ক্ষুরধার ও বস্তুনিষ্ঠ লেখা প্রকাশ হতে থাকে দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে।
আবদুল কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য ছিলেন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখীর পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকদের দাবী আদায়ের সংগ্রামে। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ ও ১৯৮৪ সালে পরপর দু’বার তিনি ঐক্যবদ্ধ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্তরে দ্রোহ আর বিপ্লবের চেতনা লালন করেও সদা হাস্যোজ্জ্বল এ মানুষটি ছিলেন সাংবাদিক আড্ডার প্রাণ-কেন্দ্র।
লেখক আবদুল কাদের মোল্লা: শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা সমসাময়িক বিষয়ের উপর শতাধিক কলাম ও প্রবন্ধ লিখেছেন। যা দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সাময়িকী এবং আর্ন্তজাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়াও বস্তুবাদ এবং কম্যূনিজমের উপরে তার বৈজ্ঞানিক সমালোচনা শিক্ষিত মহলের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়। পরবর্তীতে তিনি বীক্ষণ ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন। তার লেখাগুলো খুবই পাঠক প্রিয়তা অর্জন করে।
ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণ: অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই তিনি কম্যুনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার পরও তাফহীমুল কুরআনের হৃদয়স্পর্শী ছোঁয়ায় তিনি ইসলামের প্রতি প্রবল আকৃষ্ট হন এবং আলোকিত জীবনের সন্ধান পেয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে তিনি তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি এ সংগঠনের সদস্য হন। তিনি ছাত্রসংঘের শহিদুল্লাহ হল শাখার সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারী ও একই সাথে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান: শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতের রুকন (সদস্য) হন। তিনি অধ্যাপক গোলাম আযমের রাজনৈতিক সেক্রেটারি এবং ঢাকা মহানগরীর শূরা সদস্য ও কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অল্প দিনের ব্যবধানেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিস-এ-শূরার সদস্য হন। ১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি ও পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের প্রথম দিকে ঢাকা মহানগরীর নায়েব-এ-আমীর, অতঃপর ১৯৮৭ সালে ভারপ্রাপ্ত আমীর এবং ১৯৮৮ সালের শেষ ভাগে তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রধান নির্বাচনী মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ২০০০ সালে জামায়াতে ইসলামীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দেশে বিদেশে দ্বীনের প্রচার প্রসার: শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার কূটনীতিকদের সাথে ছিল গভীর সম্পর্ক। সদা হাস্যোজ্জ্বল কাদের মোল্লার কথা ছাড়া যেন কোন প্রোগ্রাম জমজমাট হতো না। জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নানা কূটনীতিক কর্মসূচিতে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্বীনের প্রচার প্রসারে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। তিনি আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, ভারত, কানাডাসহ নানা দেশ সফর করেন।
আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা। বিশেষ করে ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। তখন কমিটিতে গৃহীত আন্দোলনের কর্মসূচি সম্পর্কে ব্রিফিং করতেন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম ও আবদুল কাদের মোল্লা। সকল দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে তার সম্পর্ক ছিল এবং দেশের সকল রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা করতেন।
২০১১ সালের ১৫ ই জুন কথিত সেইফ হোমে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা নিজেই বলেছিলেন, “১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে জামায়াত এবং বিএনপি আলাদাভাবে নির্বাচন করে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক পর্যায়ে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন এবং আমাকে বললেন, আমরা তো সরকার গঠন করলাম, আমাদের কিছু পরামর্শ দেন। মহিউদ্দিন খান আলমগীর তখন মূখ্যসচিব ছিলেন এবং তিনি আমাকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে রিসিভ করেন। আমি তখন প্রধানমন্ত্রীকে কিছু গঠনমূলক পরামর্শ দেই যা শুনে তিনি আমাকে সাধুবাদ দেন। একইভাবে তিনি পরে আমাকে আরো দুবার ডেকেছিলেন। এখন আমি মনে করছি দীর্ঘদিন যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলন করলাম, মিটিং মিছিল করলাম, সুসম্পর্ক রাখলাম, সখ্যতা রেখে চলেছি তারা এখন শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য দীর্ঘ ৪০ বছর পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করলো।”
কারাবরণ ও জুলুম-নির্যাতন: আবদুল কাদের মোল্লাকে বিভিন্ন সময়ে জেলে যেতে হয়। আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়ে ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মত তিনি বাম রাজনীতিক হিসেবে গ্রেপ্তার হন। জেনারেল এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারণে আবদুল কাদের মোল্লাকে আবারও আটক করে রাখা হয় ১৯৮৫ সালের ২২ এপ্রিল থেকে ১৪ আগস্ট। প্রায় চারমাস আটক থাকার পরে উচ্চ আদালত তার এ আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করলে তিনি মুক্ত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের সাথে একই দিনে গ্রেফতার হন। সাত দিন পরে তিনি মুক্ত হন। সর্বশেষ ২০১০ সালের ১৩ জুলাই হাইকোর্টের প্রধান গেট থেকে গ্রেফতার হন আবদুল কাদের মোল্লা। তবে তিনি আর আমাদের মাঝে ফিরে আসেননি। জালিম সরকার অন্যায়ভাবে তাকে হত্যা করে দুনিয়া থেকেই বিদায় দেয়।
ট্রাইব্যুনালে আবদুল কাদের মোল্লা: অভিযোগ গঠনের সময় ট্রাইব্যুনালে কথা বলতে চেয়েছিলেন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা। তিনি একটি বক্তব্যও লিখে এনেছিলেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে তাকে সেই বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়নি। পরবর্তীতে পরিবারের মাধ্যমে তার লিখিত বক্তব্যের কপি পাওয়া যায়। এতে তিনি বলেন, আমার ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ এই আদালতে যে সব অসত্য ও বানোয়াট অভিযোগ উথাপন করেছে- সে ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং অনবহিত। কারণ ঐ সময়ে আমি ঢাকাতেই ছিলাম না। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে অসহযোগ আন্দোলন ঘোষিত হওয়ার পর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন শহীদুল্লাহ হলের ছাত্র। আমাদের গ্রুপে প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা চলছিল। কিন্তু পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন পদার্থ বিজ্ঞানে বিভাগের শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইন্নাস আলীর পরামর্শে আমি আমার গ্রামের বাড়ী ফরিদপুরে চলে যাই।
আমি যেখানে আমার বিরুদ্ধে উথাপিত অভিযোগের সময় ঢাকায় ছিলাম না। সুতরাং ঐসব অভিযোগের সাথে জড়িত থাকার প্রশ্নই উঠে না। আমার বিরুদ্ধে আন্দাজ-অনুমানে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে মিথ্যা অভিযোগ এনে রাষ্ট্রপক্ষ সচেতনভাবেই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অসৎ এবং অন্যায় কাজ করেছেন। যা রাজনৈতিক হিংসা চরিতার্থ করার একটি জঘন্য অপকৌশল।
রায় শোনার পরে ট্রাইইব্যুনালে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ‘আল্লাহু আকবার’ বলে দাঁড়িয়ে পড়েন ও বলেন, “আমি এই রায় মানি না। এ রায় অন্যায় হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সে সময় আমি ঢাকায় ছিলাম না। আমি মহান আল্লাহ তায়ালা ও বিশ্ব মানবতার কাছে বিচার দিচ্ছি।” তিনি আরো বলেন, ‘আমি পবিত্র কুরআন হাতে নিয়ে বলছি এ ঘটনার সাথে আমি যুক্ত নই। যে সমস্ত অভিযোগে আমাকে সাজা ও খালাস দেয়া হয়েছে তার কোনটার সাথে আমার দূরতম সম্পর্কও নেই। আমি কেয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে এই বিচারকদের বিরুদ্ধে মামলা করবো। তখন তাদের মুখে কথা বলার কোনো শক্তি থাকবে না। সেদিন এদের হাত পা কথা বলবে।”
নেই উদ্বেগ দুঃখ আর হতাশার ছাপ: আবদুল কাদের মোল্লার মেয়ে আমাতুল্লাহ পারভীন ও আমাতুল্লাহ শারমিন কারাগারে শেষ সাক্ষাত নিয়ে স্মৃতিচারণ করে এক লেখায় বলেন, কনডেম সেলে কোন উদ্বেগ নেই, নেই প্রাণনাশের চিন্তা, চোখে মুখে নেই কোন দুঃখ হতাশার ছাপ। কি প্রশান্তি মহান রবের সান্নিধ্যের প্রত্যাশায়! তার পরিবার আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাক্সক্ষীরা যখন ফাঁসির আদেশে অস্থির হয়ে পড়লো, তখন তিনি সকলকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “মৃত্যুর ফয়সালা আসমানে হয়, জমিনে নয়।” কি দৃঢ় প্রত্যয়, কি অটুট মনোবল।
মৃত্যুর পথে যাত্রা: ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় । জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সব অনুরোধ এবং আপত্তি উপেক্ষা করে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে আল্লাহর দ্বীনের মর্দে মুজাহিদ পাড়ি জমান তার প্রিয় মাবুদের দরবারে।
আবদুল কাদের মোল্লাকে আমরা আর কোন দিন দেখতে পাব না। কিন্তু শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার সংগ্রামী জীবন ও নেক আমল আমাদেরকে অব্যাহতভাবে অনুপ্রাণিত করবে। তার প্রতি ফোঁটা রক্ত ইসলামী আন্দোলকে আরো বেগবান করবে। বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের মধ্য দিয়েই তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে।
দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার রক্তের বদলা নেয়ার জন্য আমীরে
জামায়াতের আহ্বান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তদানীন্তন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী আবদুল কাদের মোল্লার অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বিবৃতি দিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তদানীন্তন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী আবদুল কাদের মোল্লা শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি একাধারে একজন রাজনীতিবিদ, লেখক, শিক্ষাবিদ এবং গবেষক হিসেবে দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গিয়েছেন। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে তিনি লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। কলম সৈনিক হিসেবে তিনি লেখনীর মাধ্যমে মানুষের বিবেকবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, ২০১০ সালের ১৩ জুলাই সরকার তাঁকে রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগে স্থাপিত গণজাগরণ মঞ্চের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার আইন সংশোধন করে আপিল দায়ের করে। সংশোধিত আইনের ভিত্তিতে তাঁকে ফাঁসির আদেশ প্রদান করা হয়। জনাব আবদুল কাদের মোল্লা ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ পাননি। এমনকি রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পূর্বেই তড়িঘড়ি করে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার প্রায় দেড় বছর পর তাঁর রিভিউ আবেদন খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তিনি বিচারের নামে এক নির্মম প্রহসনের শিকার হয়েছেন!
তিনি বলেন, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা তাঁর ফাঁসি কার্যকরের পূর্বে বলে গিয়েছেন, ‘সরকার আমাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দিচ্ছে। আমার শরীরের প্রতিটি ফোটা রক্ত এ দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ইসলামী আন্দোলনে আরও অনুপ্রাণিত করবে।’ দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য তিনি ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলনে তাঁর অবদানের কথা আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং তাঁর শাহাদাত কবুলের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। তিনি যে ইসলামী সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন, তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দৃঢ়তার সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমি জামায়াতের সকল জনশক্তি, সুধী, শুভাকাক্সক্ষী ও দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
একজন বাবা যখন অন্যায়ভাবে ফাঁসির জন্য অপেক্ষায় তখন তার পরিবার ছাত্রলীগের হামলায় রক্তাক্ত!
আমাতুল্লাহ শারমীন
২০১৩ সালের ১০ ই ডিসেম্বর আব্বুর সাথে দেখা করে বাসায় এসে আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটি করলাম। খুব অভিমান হচ্ছিল, আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে কিছু চাইনি কোনদিন। আল্লাহর কাছে বললাম, অন্য কিছু থাক কিন্তু এই গণহত্যা, ধর্ষণের অভিযোগে মৃত্যু হবে? ইতিহাসে এই কথা লেখা হবে? নতুন প্রজন্ম এগুলো পড়ে বড় হবে। সারারাত দোয়া করলাম এই অপবাদে আব্বুর যেন মৃত্যু না হয়। পরে ফাসি স্থগিত করা হলো। ভাবলাম আমার দোয়া কবুল হয়েছে। কিন্তু পরের দিন অনেক নাটকীয়তার পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই ১২ তারিখ জেলখানা থেকে আবার আমাদেরকে শেষ দেখা করতে বললো। চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন করে ফাঁসির সব আয়োজন তারা করে রেখেছে। এই দিন আমরা ৬ ভাইবোন আর আম্মু কে ওরা দেখা করতে দিল।
কি এক অদ্ভুত দৃশ্য। জেলগেটের বাহিরে শাহবাগীদের উল্লাস আর ভিতরে সবার কান্না ভেজা চোখ। কন্ডেম সেলে যেয়ে দেখলাম আব্বু হাল্কা সবুজ রঙের ফতুয়া পরা, রোজা ছিলেন। ইফতার করে গ্রিন টি খাচ্ছেন। কি প্রশান্তির চেহারা। শান্ত।
জীবন্ত বাবাকে রেখে আসলাম পিছনে, সামনে জানাযা পরার ব্যবস্থা করে। ভাইয়া গ্রামে ফোন করে কবর রেডি করতে বললো... আহ কি মৃত্যু ! মৃত্যুর আগেই কবর খোড়া হলো!
আমরা বাসায় এসে রেডি হতে হতে শুনলাম আমার বড় মামা আল্লাহু আকবর বলে চিৎকার করে উঠলেন। আমাদের বোনেরা সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সত্যি ফাঁসি হয়ে গেল আমাদের নিরপরাধ বাবার!! আমার বাবা আর নাই?
আমরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিব। এমন সময় পুলিশসহ আওয়ামী গুন্ডারা আমাদের উপর হামলা চালায়। বাসার নিচে আমাদের ভাইরা, কাজিন, আজহার চাচার ছেলে, সংগঠন এর কিছু ভাইসহ প্রায় ১৪/১৫ জন ছিল। ওরা এসে সবাইকে শুধু লাঠি দিয়ে চার্জ ই করেনি, রাইফেল দিয়ে খোচা দিয়েছে, চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়েছে। কারো মাথা ফাটা, কারো কান কেটে গেছে। সবাই রক্তাক্ত। আবার পুলিশ ওদেরকে থানায় নিয়ে গেল। বাসায় কোন ছেলে মানুষ নেই। আমার ছোট বোন গেল মিডিয়ার সাথে কথা বলতে, বড় বোন আর বড় মামা গেল ছেলেদেরকে থানা থেকে আনতে।
থানা থেকে ফেরত আসতে আসতে রাত ১টা বেজে গেল। আমাদের আর গ্রামে যাওয়া হলো না।
রাত ১.৩০টায় পুলিশের অফিসাররা এসে দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমাদের উপর হামলার নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া হওয়ায় মনে হয় এরা আসছে। আমরা গ্রামে যেতে চাইলে তারা নিতে চায়।
আমরা মানা করে দিলাম। অলরেডি সব রাস্তা বন্ধ, ফেরি বন্ধ করে দিয়েছে। ফরিদপুর থেকেই মানুষ যেতে পারছেনা।
বাবার জন্য আমরা কান্না করবো কি, রক্তাক্ত সবার ট্রিটমেন্ট করতে করতে রাত ৩.০০ টা বেজে গেল। তারপর ছেলেরা মিলে রাত ৩টায় দুলাভাই এর ইমামতিতে গায়েবানা জানাযা পরলো। আব্বু বড় দুলাভাইকে জানাযা পড়াতে বলেছিলেন। নামাজ পড়ে আব্বুর জন্য আমরা সবাই দোয়া করলাম।
তখনও বাইরে আওয়ামী গুন্ডারা বসে আছে। বাসায় আসা ছেলেদের নিরাপত্তার জন্য বিল্ডিংয়েই অন্যান্য বাসায় থাকার ব্যবস্থা করলাম। একজনের মাথায় সেলাই লাগবে বলে তাকে লুকিয়ে ভোর বেলা বিল্ডিং এ থাকা এক ডাক্তারের গাড়িতে করে হাসপাতালে পাঠানো হল।
এরপর রাত ৩.৩০ বা ৪.০০ প্রথম আমরা ফেসবুকে ঢুকে নিউজ দেখার সুযোগ পেলাম।
সারা পৃথিবীর মানুষ আমার বাবার জন্য কান্না করেছে আর আমরা আমার বাবার মুখ শেষ বারের জন্য দেখতেও পারলাম না।
পরদিন বাতিলদের সমস্ত ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিয়ে আমরা দেখলাম সারা পৃথিবীর মানুষ তার জন্য কান্না করলো। ১৫৮টা দেশে ১০ লাখের বেশি মানুষ তার গায়েবানা জানাযা পড়লো।
আব্দুল কাদের মোল্লা কে যারা রাজাকার, গণহত্যাকারি বানাতে চাইলো, তার পরিবর্তে পুরো পৃথিবীতে নিউজ হলো ইসলামী নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়ার নামায আদায় করলাম।
এখন ফেরত যাই আমার আব্বুর সেই দৃষ্টিতে, যা আমি শেষ বিদায়ের দিন দেখেছিলাম। সেই দৃষ্টিতে ছিল কষ্ট, যে কথা আব্বু বারবার আফসোস করে বলতেন, যে কথা চিঠিতেও লিখেছেন
‘আফসোস আমি যদি আমার জাতির মানুষকে জানাতে পারতাম আমার উপর কি জুলুমই না করা হয়েছে।’
শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা (রা.) এর ফাঁসি, ইতিহাসের পাতায় বিচার ব্যবস্থা অপব্যবহারের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়
১৯৭১ সালের অমোচনীয় ক্ষত বয়ে চলা এই দেশের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ছিল শুধু একটি আদালত নয়Ñএটি ছিল নৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক, অতীতের ব্যাথাকে সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যতের জন্য ন্যায়ের ভিত্তি গড়ার প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু আবদুল কাদের মোল্লার বিচারÑযা নিয়ে দেশ-বিদেশে এত আলোচনাÑসেই প্রতিশ্রুতির সামনে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরে। বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যকার বিভ্রান্তি, তাড়াহুড়ো, এবং প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতাগুলো মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেছে: আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচারের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার পালন করতে পেরেছি?
দুঃখজনকভাবে, শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় যেসব প্রক্রিয়াগত অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতার অভিযোগ উঠেছিল, তা অনেককে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। কারণ মানুষ চেয়েছিল সত্যিকারের ন্যায়Ñযে ন্যায় ভুক্তভোগীদের সম্মান দেবে, আবার অভিযুক্তের অধিকারও রক্ষা করবে। সেই ভারসাম্যটাই যেন কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩Ñপ্রণীত হয়েছিল যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার নিয়ে। সে সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন অভিযুক্তের নাম ছিল সর্বাগ্রে, এবং অনেকেরই ধারণা ছিলÑএই আইন মূলত তাদের বিচারের জন্যই তৈরি। সে সময়কার প্রেক্ষাপট, কূটনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিচারকে থামিয়ে দেয়।
কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ৪ দশক পর, যখন দেশ বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে, তখন ২০১০ সালে আইনটি সংশোধন করে নতুনভাবে বিচার শুরুর পথ খোলা হয়।
এই সংশোধনের ফলে কেবল ১৯৫ জনের মতো নির্দিষ্ট তালিকার অভিযুক্ত নয়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের বাংলাদেশি নাগরিকরাও আইনটির আওতায় আসেন। আর এখানেই বিতর্কের শুরুÑআইনটির মূল উদ্দেশ্য কি বদলে গেল? এত বছর পর, নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, পিছিয়ে থাকা ঘটনাকে পুনরায় বিচারযোগ্য করাÑএ সবই মানুষের মনে প্রশ্ন তোলে: বিচার কি তখন আর পুরোপুরি আইনি ছিল, নাকি রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য করা হয়েছিল ? এই প্রশ্নের কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছে আবদুল কাদের মোল্লার মামলাÑএকটি মামলা যা আইনের উদ্দেশ্য, ব্যবহারের পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটÑসবকিছুকেই একসাথে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসে।
প্রথম বড় প্রশ্নটি উঠে আসে আইনের ব্যবহারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩Ñপ্রণীত হয়েছিল নির্দিষ্ট এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, প্রধানত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন অভিযুক্তের বিচার করার উদ্দেশ্যে। এরপর দীর্ঘ চার দশক কোনো বিচার শুরু হয়নি। কিন্তু ২০১০ সালে আইন সংশোধনের পর হঠাৎই এর প্রয়োগের ক্ষেত্র বেড়ে গেলÑএবং রাজনৈতিক বিভাজনের ভেতরে থাকা বাংলাদেশী নাগরিকরাও অভিযুক্ত হতে লাগলেন। আইনটি কি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মিত হলো? এই প্রশ্ন এড়ানোর উপায় নেই।
আরও স্পষ্ট হয় বিতর্ক যখন দেখা যায়Ñবিচারের মাঝপথে তথাকথিত শাহবাগ আন্দোলনের মাধ্যমে আইন পরিবর্তন করে প্রসিকিউশনকে মৃত্যুদণ্ডের জন্য আপিলের সুযোগ দেওয়া হলো। আজীবন সাজার পর হঠাৎ মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা তৈরি হওয়া ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন। বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলÑ“আপনি বিচার শুরু করবেন এক সেট নিয়ম নিয়ে, শেষ করবেন আরেক সেট নিয়ম দিয়ে”Ñএটি কোনো সভ্য বিচারব্যবস্থার আদর্শ হতে পারে না।
এখানেই শেষ নয়। প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপনে অসম সুযোগ, প্রতিরক্ষার জেরা সীমিত হওয়া, আর “স্কাইপ কেলেঙ্কারি”-তে বিচারপতির ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁস হওয়াÑসবকিছু মিলে বিচার প্রক্রিয়ার স্বাধীনতার ওপর মানুষের আস্থা নড়িয়ে দেয়। ট্রাইব্যুনাল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ঠিকই, কিন্তু জাতির মনে যে প্রশ্নগুলোর জন্ম হয়েছে, তা এখনো নিভে যায়নি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় ও ধরন নিয়ে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়ে রায় দিলেও, মোল্লা পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাননিÑসমালোচকেরা বলেন, একজন মানুষ মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি পাওয়ার আগে অন্তত জানুক কেন তাঁর জীবন শেষ করা হচ্ছেÑএটাই তো ন্যায়ের ন্যূনতম শর্ত। তার ওপর, বাংলাদেশের প্রচলন অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর হয় রাত ১২:০১ মিনিটের পর। কিন্তু শুক্রবারে ফাঁসি দেওয়া নিষিদ্ধ হওয়ায় তাঁর ফাঁসি এগিয়ে এনে কার্যকর করা হলো বৃহস্পতিবার রাত ১০:০১ মিনিটেÑএমন এক অস্বাভাবিক তৎপরতায়, যা সমালোচকদের মতে রাষ্ট্রের তাড়াহুড়ো ও অস্বস্তিকর প্রস্তুতির চিত্র তুলে ধরে। একজন মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রক্রিয়াটিও যেন এখানে যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতায় রূপ নিল।
ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকজনক বিচার প্রত্যক্ষ করলো পুরো দুনিয়া।
একজন মানুষ তার বিচারের পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে না পেয়েই, কি কারণে তার ফাঁসি হচ্ছে এটা না জেনেই, রিভিউ আবেদনের কোন সুযোগ না পেয়েই নির্মমভাবে বিচারিক হত্যাকান্ডের স্বীকার হলেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে এই হত্যা আইনের অপশাসনের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে আর শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা (রা:) কেয়ামত পর্যন্ত ইসলামের জন্য, ন্যায়ের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এক বীর যোদ্ধা হিসেবে মানুষের হৃদয়ে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ।