ভাষা শহীদদের মহান আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় দিন আজ সোমবার। ১৯৫২ সালের এই দিনে পূর্ব পাকিস্তানে চলছিলো বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতির দাবিতে তুমুল আন্দোলন। গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও বস্তুত এর বীজ বপিত হয়েছিল বহু আগে, অন্যদিকে এর প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর দেখা যায় মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগের আবাসভূমি পূর্ববঙ্গ এবং তাদের মাতৃভাষা বাংলা। এর বিপরীতে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে পশ্চিম পাকিস্তান বহু ভাষাভাষীর এলাকা এবং শতকরা মাত্র ৫ জনের মাতৃভাষা উর্দু। এ দেশের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদরা ধারণা করতেন, পূর্ব বাংলা একটি স্বতন্ত্র ও স্বশাসিত রাষ্ট্র হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলা ভাষা সমস্যার উদ্ভব হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়া উদ্দিন আহমদ প্রথম ভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। তিনি ওই বছর জুলাই মাসে মন্তব্য করেন, উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

এ ধরনের বক্তব্যের প্রতিবাদে অগ্রসেনানীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায় তিনি স্বনামে একটি নিবন্ধ লিখেন, যার শিরোনাম ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা।’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে বাংলার দাবিকে অগ্রগণ্য উল্লেখ করে বলেন, যদি এরপরও অন্য কোন ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্ন আসে, শুধু তাহলেই উর্দুর কথা চিন্তা করা যেতে পারে। সে সময় তার এই দূরদর্শী ও সাহসী বক্তব্য এ দেশের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মহলে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সহ¯্রাধিক বছরের বঙ্গীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ধারা তাহজীব-তমদ্দুনের দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে হবে এমন মানসিকতাই কাজ করেছিল লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে। সে জন্যেই তারা উর্দুর বিরোধিতা করে আসছিল ইংরেজ আমল থেকেই। দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও প্রতিবাদ বিস্ফোরণোন্মুখ পরিণতিতে দাঁড়ায় ১৯৫২ সালে এই গৌরবোজ্জ্বল ফেব্রুয়ারি মাসে।