বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর আসন্ন ঈদুল ফিতর এ সরকারের মেয়াদে প্রথম ঈদ। এবারের ঈদযাত্রায় জনদুর্ভোগ কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঈদে ভোগান্তি ছাড়া নিরাপদে গিয়ে পরিবার পরিজনের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে সেজন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা রয়েছে সরকারের। মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখা, পরিবহন সেক্টরে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ রাখা,ঈদে ছুটি বাড়িয়ে দুর্ভোগ কমানোর চেষ্টা করছে সরকার। এছাড়া গত বছরের মতো এবারও রমযানের প্রথম দিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ফলে অনেকে পরিবার পরিজনকে আগেভাগে গ্রামে পাঠিয়ে দেবেন। তাই ভোগান্তির শঙ্কা কম। এছাড়া টোলে যাতে দীর্ঘসময়ে অপেক্ষা করে যানজট না হয় সে জন্য ইলেকট্রনিক টোলে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, যাত্রী সাধারণের সুবিধার্থে এবং নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। পথে কোনো ধরনের চাঁদাবাজির তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, অনিবন্ধিত ও অবৈধ যানবাহন সড়ক-মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। মহাসড়কের ওপর বাজারের জটলায় গাড়ি যাতে আটকে না যায়, সে জন্য দখল উচ্ছেদে পুলিশ কাজ করছে। ঈদের আগে ছুটি দুদিন। ১৮ মার্চ ছুটি দিলে চার দিন বন্ধ পাওয়া যাবে। তখন ঈদযাত্রা গত বছরের মতোই নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করছি। তাই ১৮ মার্চ ছুটি দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঈদে ছুটি বাড়িয়ে ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ কমানোর চেষ্টা করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২১ মার্চ উদযাপিত হতে পারে ঈদুল ফিতর। এর আগের দুই দিন সরকারি ছুটি। ১৭ মার্চ শবে কদরের ছুটি। মাঝে ১৮ মার্চ বন্ধ থাকলে ঈদের আগে চার দিন সময় মিলবে ধাপে ধাপে শহর ছাড়ার। তাতে ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে এ চিন্তায় ১৮ মার্চও ছুটি ঘোষণা করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব করতে যাচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।
সূত্র জানায়, ছুটি বাড়লেও ঈদযাত্রায় ভোগান্তির আশংকা রয়েছে সড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে। অভ্যুত্থানের পর পুলিশ নিস্ক্রিয় থাকায় সড়ক-মহাসড়কে চলতে শুরু করে ব্যাটারিচালিত লাখ লাখ রিকশা। এগুলো আর অপসারণ না হওয়ায় ঈদযাত্রায় ভোগান্তির ভয় রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার প্রবেশপথে সড়ক দখল, মহাসড়কের পাশে বাজার ও যানবাহনের অবৈধ স্ট্যান্ড, সেতুর টোলপ্লাজায় ধীরগতির কারণেও দুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে ঈদযাত্রায়।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), হাইওয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা লম্বা ছুটিই একমাত্র ভরসা। ছুটি কম থাকলে দুর্ভোগ এড়ানো যাবে না।
সওজের তথ্যমতে, সড়ক-মহাসড়কের ৭৫ শতাংশের অবস্থা ভালো। কিন্তু ঢাকা ছাড়তেই ভোগান্তি হতে পারে গাবতলী, সায়েদবাদ, টঙ্গী ও হানিফ ফ্লাইওভারে। ঢাকার প্রবেশপথে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইকের ভিড়। এতে বাসের গতি আটকে যাচ্ছে। গত বছরের দুই ঈদেই ভুগিয়েছে হানিফ ফ্লাইওভার। এ ফ্লাইওভার হয়ে দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীরা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে ভোগান্তিতে পড়েন। এবারও একই শঙ্কা রয়েছে।
সূত্র জানায়, শিল্পকারখানায় ছুটির পর ফিটনেসবিহীন গাড়ি, ঢাকার লোকাল বাস মহাসড়কে নামলে গাজীপুরের চন্দ্রা, চৌরাস্তা এলাকায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এতে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যাত্রীদের দুর্ভোগ হয়। এবারও একই শঙ্কা রয়েছে। শেষ সময়ে এসে কারখানা শ্রমিকদের ৩০-৪০ জন মিলে ট্রাক-পিকআপ ভাড়া করে বাড়ির পথ ধরেন। তাদের তো ঠেকানো সম্ভব নয়। আবার সেই ট্রাক-পিকআপ আটকে সড়কের পাশে রাখার মতো জায়গাও নেই। ফিটনেসবিহীন, রুট পারমিট বাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সূত্র জানায়, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার পথ চার লেনে উন্নীত হলেও সেতুতে গাড়ি বিকল হয়ে এবারও ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত চার লেনের মহাসড়ক গত বছর ঈদের আগে চালু হলেও সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে ইন্টারচেঞ্জের নির্মাণ শেষ না হওয়ায় ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে।
সূত্র মতে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং আশুগঞ্জ-সরাইল-বাহ্মণবাড়িয়া-আখাউড়া মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান থাকায় নরসিংদী ও আশুগঞ্জ এলাকায় দুর্ভোগে পড়তে হবে সিলেটের যাত্রীদের। এখনই দুর্ভোগ হচ্ছে এই দুই সড়কে। নির্বাচনের আগে চার দিনের ছুটিতে যাত্রীর ঢল নামলে দীর্ঘ যানজট হয় এই সড়কে। যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, নির্বাচনের সময় যে পরিমাণ যাত্রী ঢাকা ছেড়েছিল, ঈদের এর কয়েক গুণ যাত্রী হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা পরিবহন খাত ও সড়কের নেই। তাই ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। সড়কে ব্যাটারির রিকশা ও অবৈধ যানবাহনের কারণে যানজট হয়। এগুলো ঈদের সময় অন্তত বন্ধ রাখতে হবে। সড়কগুলোর মোড়ে বাজার এবং অটোরিকশার স্ট্যান্ড তৈরি হয়েছে। এ কারণে দূরপাল্লার গাড়ি আটকে যায়। এগুলো দূর করতে হবে।
সূত্র জানায়, যমুনা সেতুতে গড়ে দিনে ২০ হাজার যানবাহন পারাপার হয়। ঈদে তা ৪০ হাজারের বেশি হয়। গত বছর ঈদে এক দিনে সর্বোচ্চ ৬৪ হাজার যানবাহন পার হয়। ঈদের আগে-পরে তিন দিনে প্রায় দুই লাখ যান চলাচল করে। ওই সময় ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ১৫-১৬ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজট হয়। এতে টোলের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, প্রতিবছর দুর্ভোগ হয়।
হাইওয়ে পুলিশ এবং সওজ যদিও বলছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের শঙ্কা কম। কিন্তু ভোগাতে পারে সায়েদাবাদ এবং কাঁচপুরের যানজট। নারায়ণগঞ্জে মহাসড়কের দুইপাশে কলকারখানা এবং ঘনবসতির কারণে কাঁচপুর থেকে মেঘনা পর্যন্ত যানজট কিংবা গাড়ির গতি ধীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাটারি রিকশার দৌরাত্ম্য এবং মেঘনা ও গোমতির টোলপ্লাজায় যানজটের শঙ্কা রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ছয়টি স্থানে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। গজারিয়া অংশের ১৩ কিলোমিটারে মধ্যে ভবেরচর স্ট্যান্ডে বিশৃঙ্খলার কারণে দীর্ঘ যানজট হচ্ছে প্রতিদিন।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভূলতা থেকে রূপসী হয়ে বরপা বিশ্বরোড পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়কে প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত যানজট হচ্ছে, যা ঈদে বাড়তে পারে। এই যানজটের কারণ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নির্মাণকাজ। ভূলতা থেকে বরপা বিশ্বরোড পর্যন্ত যানজট নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ দখল ও পার্কিং উচ্ছেদ করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা টোলপ্লাজা থেকে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা পর্যন্ত তিন কিলোমিটার পথজুড়ে প্রতিদিনই যানজট হচ্ছে। মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি, উল্টো পথে অটোরিকশা চলায় ঈদে তা বাড়তে পারে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে অন্তত ১০টি পয়েন্টে যানজটের শঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব এলাকায় যানজটের কারণে দখল ও অবৈধ যানবাহনের বিশৃঙ্খলা।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশে ১৫টি স্থানে যানজট হতে পারে। কারখানায় ছুটির পর সড়কে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা হলে আগের বছরের মতোই ভোগান্তি হতে পারে। এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পূর্ব প্রান্তের গোলচত্বর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার সড়কে এখনও ডিভাইডার নেই। এখানে দুই লেনে যান চলাচল করে। ফলে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে পূর্বাঞ্চলীয় ১৫টি জেলার যানবাহন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল হয়ে চলাচল করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যানজটের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে রয়েছে মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে শিমরাইল সাইনবোর্ড পর্যন্ত চার কিলোমিটার মহাসড়কে উল্টোপথে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের অবাধ চলাচল, সড়কের ওপর নিষিদ্ধ লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড, বিভিন্ন পরিবহনের যত্রতত্র পার্কিং ও স্ট্যান্ড এবং মহাসড়কজুড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দোকানপাট। অন্যদিকে, শিমরাইলের খানকা মসজিদ ও পুষ্টি সয়াবিন তেল কারখানার সামনে মহাসড়ক সরু হওয়ায় সেখানে প্রতিদিন যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। কাঁচপুর সেতু থেকে শিমরাইল ও সাইনবোর্ড পর্যন্ত শত শত বাস ও মালবাহী ট্রাক পার্ক করে রাখার কারণেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া শিমরাইল মোড়ের উত্তর পাশে মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ ও বড় বড় গর্ত। এসব খানাখন্দে প্রায়ই ছোট যানবাহন আটকে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশের কাঁচপুর থানার ইনচার্জ টিআই বিষ্ণু চন্দ্র শর্মা বলেন, আমার এলাকায় লাঙ্গলবন্দ সেতুর একটি অংশ অবস্থা ভালো নয়। এ ছাড়া ঈদুল ফিতরের আগেই অতিরিক্ত ফোর্স থাকবে মহাসড়কে। আশা করি, শিমরাইল ও কাঁচপুর অংশে মানুষ যানজটবিহীন নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরবেন।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিম বলেন, ঈদুল ফিতরের আগে মহাসড়কের পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ আমাদের এস্টেট কর্মকর্তা ট্রেনিংয়ে রয়েছেন। তাই উচ্ছেদ অভিযান ঈদের পর করব। তিনি আরও বলেন, মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের অংশে যেসব খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা রয়েছে, তা স্বল্প সময়ের মধ্যেই মেরামত করে দেব।