আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মোট প্রার্থীর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিক সম্মেলন করে টিআইবি ‘হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি ২০২৬’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীদের হলফনাফা বিশ্লেষণ করে তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে প্রার্থীদের মোট ঋণের পরিমাণ টাকার অঙ্কে ২০০৮ সাল থেকে হওয়া চারটি নির্বাচনের তুলনায় সর্বোচ্চ দেখা যাচ্ছে।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রতিবেদনটির তথ্য তুলে ধরা হয়। তথ্য তুলে ধরেন টিআইবির কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। এ সময় বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
টিআইবি জানায়, ঋণগ্রস্ত প্রার্থীর শতকরা হার আগেকার তুলনায় কমলেও ঋণের পরিমাণ দেখলে সেটি প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এটি ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় ছিল ১৭ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকার কিছু বেশি। আগেকার এ হিসেব আরও কম ছিল। ঋণ বা দায়ের পরিমাণ বিবেচনায় শীর্ষ দশ প্রার্থীর আটজনই বিএনপির বলেও দেখা যাচ্ছে। বাকি দুজন স্বতন্ত্র।
টিআইবি জানায়, এই দশজনের মধ্যে শীর্ষে ৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বতন্ত্র একজন প্রার্থীর। হাজার কোটি ছাড়ানো ঋণের বিবেচনায় এর পরের চারজন প্রার্থীই বিএনপির। এ ছাড়া শীর্ষ দলগুলোর কোটিপতি প্রার্থীতেও এগিয়ে বিএনপি। সম্পদের বিবেচনায় দলটির ৭১ দশমিক ৮৬ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতি হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে টিআইবি।
টিআইবি জানায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মধ্যে সাড়ে ২৫ শতাংশের কোনো না কোনো ঋণ বা দায় রয়েছে। তাদের মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকার বেশি। সবশেষ পাঁচ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে এবার ঋণ বা দায়গ্রস্ত প্রার্থী কম। তবে এবার প্রার্থীদের মোট ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
টিআইবির বিশ্লেষণের তথ্য বলছে, বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ ঋণ বা দায়গ্রস্ত। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। জাতীয় পার্টির প্রায় ২৭ শতাংশ। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ প্রার্থী ঋণ বা দায়গ্রস্ত।
টিআইবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থী ১ হাজার ৯৮১ জন। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হয়েছেন ১ হাজার ৬৯৬ জন। মোট প্রার্থীর মধ্যে ৭৬ দশমিক ৪২ শতাংশ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে ২৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ স্নাতক, আর প্রায় ৪৮ শতাংশ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।
টিআইবির বিশ্লেষণ বলছে, এবার ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী মূল পেশা বিবেচনায় ব্যবসায়ী। আইন পেশায় আছেন ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রার্থী। শিক্ষকতা পেশায় আছেন প্রায় ১২ শতাংশ প্রার্থী। এর পরেই রয়েছেন চাকরিজীবী ও কৃষিজীবী পেশার প্রার্থীরা। আর রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রার্থী।
টিআইবি বলছে, বর্তমানে মামলা আছে এমন প্রার্থী আছেন ৫৩০ জন। আর অতীতে মামলা ছিল এমন প্রার্থী আছেন ৭৪০ জন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে কোটিপতি প্রার্থী ৮৯১ জন। আর এর মধ্যে শতকোটির মালিক ২৭ প্রার্থী।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২১ প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের তথ্য হলফনামায় দিয়েছেন। কিন্তু কমপক্ষে দুইজন প্রার্থী সম্পর্কে আমাদের কাছে তথ্য আছে। তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল বা আছে। তা সত্ত্বেও হলফনামায় উল্লেখ করেননি। তবে টিআইবির নীতিমালার কারণে তাদের পরিচয় দিতে অপারগতা জানান ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা তথ্যগুলো জানাবো। ওই প্রার্থীদের বিষয়ে জানিয়ে তিনি বলেন, দুজনই ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন বা আছেন; এই তথ্য তারা প্রকাশ করেননি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আরও এক প্রার্থীর নির্ভরশীল ২১০ কোটি টাকার সম্পদ ইংল্যান্ডে আছে। তবে ওই সম্পদের তথ্য হলফনামায় প্রকাশ করা হয়নি। আরেক প্রার্থী নিজে ও তার স্ত্রীর নামে বিদেশে কোনো সম্পদ নেই ঘোষণা দিলেও, দুবাইতে তার স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য আছে- একজন প্রার্থীর বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা থাকার ঘোষণা দিলেও সংখ্যাটি কমপক্ষে তিনগুণ এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আরেকজন প্রার্থী বিদেশে নিজস্ব মালিকানায় কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার কথা স্বীকার না করলেও অনুসন্ধানে মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে আটটিই বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত। একজন প্রার্থীর করস্বর্গে কোম্পানির নিবন্ধন থাকার পুরোনো তথ্য অনেকটাই প্রকাশিত থাকলেও এ বিষয়ে হলফনামায় কোনো ঘোষণা দেখা যায়নি। প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে দুদক, এনবিআর ও ইসি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।