* পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছিল ‘গ্রিন সিগন্যাল’

* বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে

* ঘটনার দায় তৎকালীন সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও

* পুলিশ ও র‌্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে পর্বত সমান ব্যর্থতা

প্রতিবেশী দেশ ভারত বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে মন্তব্য করেছে ১৬ বছর আগের ঘটনায় গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে উল্লেখ করে বলেছে, এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিল তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। গতকাল রোববার বিকেলে কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন।

এসময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিলো। আপনারা সত্য উদ্ঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা

বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের বিষয় তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গতকাল রোববার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ও অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন। এ সময় কমিশনের অন্য সদস্যরা যথাক্রমে, মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীর প্রতীক (অব.), মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ যুগ্মসচিব (অব.), ড. এম. আকবর আলী ডিআইজি (অব.), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টা এ সময় বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিলো। আপনারা সত্য উদ্ঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, ইতিহাসের এই ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিলো, এই কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। তিনি বলেন, এই প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি।

কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ১৬ বছর আগের এই ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। আমরা দুটো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছি। সাক্ষীদের ডাকলাম, কারো কারো ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বক্তব্য শুনেছি আমরা। যতক্ষণ তিনি বলতে চেয়েছেন। যারা তদন্তে জড়িত ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের তদন্তের রিপোর্ট কালেক্ট করেছি, অন্যান্য এলিমেন্ট কালেক্ট করেছি। তিনি বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে, উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে কার কী ভূমিকা ছিল। কেন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকল অ্যাকশন নিল না। তিনি বলেন, তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে।

এসময় কমিশনের ফাইন্ডিংস সম্পর্কে জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, এই ঘটনা কিছু বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ বের করেছে কমিশন। তিনি বলেন, এই হত্যাকা- পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছিল তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তারা ২০-২৫ জনের একটি মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকেছে এবং বের হবার সময় সেই মিছিলে দুই শতাধিক মানুষ ছিলো। তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিলো। তিনি এই ঘটনার দায় নিরূপণের ক্ষেত্রে বলেন, দায় তৎকালীন সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও। এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও রয়েছে চরম ব্যর্থতা। তিনি বলেন, ওই ঘটনার সময় কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ছিলো অপেশাদার। তিনি বলেন, ওই হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) যেসব বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেছে, তাদের সঠিক নাম পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি।

কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশ করে, যাতে করে ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোতে এই ধরনের ঘটনা এড়ানো যায় এবং এই ঘটনার ভিকটিমরা ন্যায়বিচার পায়।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ ও স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি।

কমিশনের প্রেস ব্রিফিং

বিডিআর হত্যাকণ্ড ধামাচাপা দিতে জে. তারেক সিদ্দিকের নেতৃত্বে প্যারালাল সেনা কমান্ড গঠন করা হয় বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিশন। কমিশনের প্রধান ও বিডিআরের সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল (অব) আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহম্মদ ইউনূসের কাছে এই রিপোর্ট হস্তান্তর করা হয়। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় রিপোর্ট হস্তান্তর করার পর সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া বিডিআর হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে জেনারেল তারিক সিদ্দিকের নেতৃত্বে প্যারালালে সেনা কমান্ড তৈরি করেছিলেন সাবেক ফ্যাসিবাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশে তারিক সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা এই হত্যাকান্ডকে ভিন্ন খাতে নেয়ার জন্য সব ধরনের তৎপরতা চালায়।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআরের সদর দপ্তরে বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমদসহ ৫৭জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। সেই সময় এই ঘটনায় পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মঈন ইউ আহমদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠে। এই ঘটনায় দুইটি মামলায় বিডিআর সদস্যদের সাজা হলেও নেপথ্যের নায়করা ধরা ছোয়ার বাইরে ছিলেন। এই রহস্য উদঘাটন ও দোষীদের চিহ্নিত করতেই এই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, কমিশন তাদের দাখিল করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের বের হয়ে যাওয়ার কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

দুবাইতে একটা বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে এদের পার করে দেয়া হয় বলে জানা যায়। তবে তারিক সিদ্দিকের ওই প্যারালাল কমান্ডের চাপে ওই সময় দুটি কমিটি গঠিত হলেও সিভিল এভিয়েশনের কেউ এ নিয়ে মুখ খোলেনি বা অফ রেকর্ডেড ওই ফ্লাইটের অপারেশনকে বাধা দিতে পারেনি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, একই ভাবে আরো কিছু ভারতীয় নাগরিকের চলে যাওয়ার রেকর্ড আছে তবে ঢোকার রেকর্ড নেই। ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক , ওয়ারেস হোসেন বেলার এমপি, মির্জা আজম, আসাদুজ্জামান নূর ও শেখ সেলিম, সাবেক বিডিআর সদস্যা তোরাব আলী ও তার ছেলে লেদার লিটন বিডিআর হত্যাকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।