আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনবিরোধী কর্মকান্ডের ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল রবিবার টিআইবির কার্যালয় রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে এসব কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সাংবাদিক সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। এসময় সংস্থার উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের ও গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছে না। প্রচারসহ নির্বাচনের প্রতিটি স্তরে প্রার্থীরা আচরণবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করছে। প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে কোন ব্যয়সীমা মানছেন না। এত অনিয়মেও ইসি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না”।
টিআইবি জানায়, নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে পরিবেশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) পরিস্থিতির দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি অভিযোগ, দেশের ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ ছাড়া, দেড় বছরও উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসেবে দিতে না পারাটা নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও মনে করেন টিআইবি প্রধান।
টিআইবি বলেছে, বর্তমান সরকারের সময়েও দেশে দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা ভবিষ্যতের জন্য একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘এ সরকারের সময় দুদকের সংস্কারের সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। প্রধান উপদেষ্টা, তার উপদেষ্টা পরিষদ এবং তাদের অধীনস্থ সরকারি কর্মচারীরা এখনো সম্পদের বিবরণী জমা দেননি বা তা প্রকাশও করা হয়নি।’
টিআইবির মতে, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার দীর্ঘ তালিকায় একটি গুরুতর সংযোজন, যা ভবিষ্যতেও নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে থেকে যাবে। এখনো সময় থাকলেও যদি সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হয়, সেটি ভিন্ন বিষয়; তবে এতদিন তা প্রকাশ না করার দায় কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না। এই অবহেলা স্বচ্ছতার প্রশ্নে অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি অনাকাক্সিক্ষত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
নারী প্রার্থী মনোনয়ন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের কথা বলা হলেও কোনো দলই তা মানেনি।’
তিনি বলেন, ‘একজন নারীকেও মনোনয়ন না দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জামায়াত দেবে বলে আমরা আশাও করিনি। কিন্তু যাদের কাছ থেকে আশা করেছিলাম, তারা কী করেছে?’
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের মধ্যে নারী মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে নারী প্রার্থী মনোনয়নে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনীতির ‘‘মৌলিক পুঁজি’’ হিসেবে অর্থ, ধর্ম, পেশিশক্তি, পুরুষতন্ত্র ও গরিষ্ঠতন্ত্র এই পাঁচটি বিষয় কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, ‘সংখ্যালঘু, নারীসহ সব শ্রেণির ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হলেও এর মূল দায় রাজনৈতিক দলগুলোর।’
শনিবার রাতে বাংলাদেশ টাইমস নামের একটি গণমাধ্যমের কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের তুলে নেয়ার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। বলেন, ‘গণমাধ্যমের কার্যালয় থেকে তুলে নেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া এভাবে সাংবাদিকদের তুলে নেয়া মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য মধ্যযুগীয় সহিংসতার দৃষ্টান্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে সাংবাদিকদের ছেড়ে দেয়া হলেও এর মাধ্যমে পুরো গণমাধ্যমের জন্য ভীতিমূলক বার্তা দেয়া হয়েছে।’ সেনাবাহিনীসহ সব প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচন নিয়ে ৭ পর্যবেক্ষণ
টিআইবির প্রাক্-নির্বাচনী পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা, আন্তঃদলীয় কোন্দল ও ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা বেড়েছে। নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির নির্বাচনবিরোধী তৎপরতায় অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও রয়েছে।
এছাড়া অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার বেড়েছে, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে; আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়ম ব্যাপক হলেও তা প্রতিরোধে কমিশনের ভূমিকা দুর্বল বলে উল্লেখ করা হয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতার কথাও পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
গণভোট নিয়ে ১১টি পর্যবেক্ষণ
গণভোট সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে টিআইবি জানায়, সরকারের দোদুল্যমান সিদ্ধান্ত ও অধ্যাদেশ প্রণয়নের কারণে শুরু থেকেই গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, সরকারি কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা নিয়ে বিতর্ক, গণভোটকে নির্বাচন হিসেবে বিবেচনার আইনগত অসঙ্গতি এবং সরকারের সরাসরি ভূমিকা সব মিলিয়ে গণভোটকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিতর্কিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
টিআইবির মতে, এসব কারণে ঐতিহাসিক গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।