বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা প্রতিটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন এবং সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে আমাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিল। আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করি। আমরা মনে করি, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, যদি জনগণ আমাদের সমর্থন করে এবং আমাদের সেবা করার সুযোগ দেয়, তাহলে আমাদের সেবা হবে সকলের কল্যাণমুখী।

ভারতের ইংরেজি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ঞযব ডববশ-এ দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

প্রতিবেদনটি নিচে তুলে ধরা হলো।

ঢাকার এক সরু গলিপথ পেরিয়ে একটি নিরিবিলি রাস্তায় পৌঁছালে চোখে পড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র অফিস। রেলওয়ে সংযোগে বড় মগবাজারের সাথেও যোগাযোগ সহজ হয়েছে, যা জামায়াতের প্রধান কার্যালয়কে বাইরের দুনিয়ার কাছে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। ২০১১ সালে থেকে অফিসটি বন্ধ ছিল, যা ২০২৪ সালে পুনরায় চালু হয়।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক, সংখ্যালঘুদের অধিকার, এবং উগ্রপন্থার ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি সচেতন। জামায়াতের জন্য রাজনৈতিক পরিসর আবারও উন্মুক্ত হচ্ছে, তবে ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ নির্ভর করবে তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর। দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে তিনি বলেন, এটি দুই দেশের পারস্পরিক দায়িত্ব।

সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ

প্রশ্ন : আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ কি রয়েছে বাংলাদেশে?

ডা. শফিকুর রহমান: জুলাই অভ্যুত্থানের সময়, পুলিশরা থানাগুলো থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমরা জনগণের প্রতি আবেদন জানিয়েছিলাম আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসার। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, দিন-রাত এক করে ১৫ দিন কাজ করেছে। আমি তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করি, কারণ তারা সমস্ত দুর্দশা উপেক্ষা করে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। একই সাথে আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমরা কারো বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেব না। তবে অপরাধীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা হবে। আমাদের নীতিই হলো, মিথ্যা মামলা না করে কেবল তাদের বিরুদ্ধেই ন্যায়বিচার চাওয়া, যারা সন্দেহাতীতভাবে অপরাধের সাথে জড়িত। এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। আওয়ামী লীগ নেতারা আগে বলতেন, যেদিন তাদের দল ক্ষমতায় থাকবে না, সেদিন বিরোধী পক্ষ অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ হত্যা করবে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি।

প্রশ্ন : সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে আপনার অবস্থান কী?

ডা. শফিকুর রহমান: আমরা সকল ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে একত্রে বসেছি। আমরা প্রধান প্রধান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যেমন মন্দির ও গির্জা, পরিদর্শন করেছি। আমরা একসাথে বসে মতবিনিময় করেছি, কীভাবে আমরা পরস্পরকে সহায়তা করে সমাজে শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে পারি তা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা মনে করি, এই উদ্যোগ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে। গণপিটুনির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো সাধারণ মানুষ। আমরা কখনোই গণপিটুনির পক্ষে নই। আমরা কোনোভাবেই জাতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘুতে বিভক্ত করতে চাই না। যদি আমরা ধর্ম বা অন্য কোনো ভিত্তিতে জাতিকে বিভক্ত করি, তবে তা জাতিকে দুর্বল করে। আমরা মনে করি বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকা উচিত। জামায়াতের বিরুদ্ধে কিছু প্রচারণা চালানো হয়েছেÑযেমন, আমরা নাকি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারবিরোধী, অথবা নারীর অধিকার রক্ষায় অনাগ্রহী। এটি সত্য নয়। আমাদের নেতৃবৃন্দ বা কর্মীরা কখনোই এ ধরনের বৈষম্য করেননি। ২০১৩ সালে আমি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনকে একটি চিঠি লিখেছিলাম, যাতে তারা একটি কমিটি গঠন করে তদন্ত করে দেখেন আমাদের দলের কেউ এসব অভিযোগে দোষী কি না। কিন্তু আমরা কোনো সাড়া পাইনি। আমাদের আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল, কারণ বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী সরকারের কাছ থেকে ন্যায়বিচারের আশা করা সম্ভব ছিল না।

প্রশ্ন : নির্বাচনের পর জামায়াতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কী?

ডা. শফিকুর রহমান: আমরা প্রতিটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন এবং সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে আমাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিল। আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করি। আমরা মনে করি, শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া উচিত। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিত করা। আমরা চাই তাদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে, যাতে তারা নিজেদের দক্ষতাকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে। তাই দক্ষতা উন্নয়ন আমাদের পরবর্তী অগ্রাধিকার। যদি আমরা আমাদের কর্মশক্তিকে উন্নত করতে পারি, তাহলে আমরা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা আরও ভালোভাবে করতে পারব। এরপর রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের উদ্বেগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্য। আমাদের এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে, যারা সততা, সম্মান ও দক্ষতার সাথে দেশকে সেবা দেবে। অতীতে আমরা কৃষি, শিল্প এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছি এবং দুর্নীতিমুক্ত শাসনের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছি।

প্রশ্ন : জামায়াতে গণতন্ত্র ও শৃঙ্খলা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?

ডা. শফিকুর রহমান: গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার স্পষ্ট। আমরা আমাদের সংগঠনের ভেতরে এবং দেশের ভেতরেও গণতন্ত্র বজায় রাখি। আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। এটি আমাদের মেয়াদের শেষ বছর, এবং এই বছরই আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের সংগঠনের প্রতিটি স্তরে নির্বাচন হয় এবং সেখানে নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। বাস্তবে, আমাদের সদস্যদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ নারী। নারীদের বিষয়ক ক্ষেত্রে আমাদের সংগঠনে পুরুষদের তুলনায় আরও বেশি অগ্রগতি হয়েছে। যদি জনগণ আমাদের সমর্থন করে এবং আমাদের সেবা করার সুযোগ দেয়, তাহলে আমাদের সেবা হবে সকলের কল্যাণমুখী।

প্রশ্ন : সম্প্রতি আপনি বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। কী আলোচনা হয়েছে?

ডা. শফিকুর রহমান: বেগম খালেদা জিয়া অনেক দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, তবে মানসিকভাবে তিনি এখন কিছুটা ভালো আছেন, কারণ তিনি তার ছেলে, পুত্রবধূ এবং নাতনিদের সাথে বসবাস করছেন। দীর্ঘ এক সংগ্রামী জীবনের পরে তিনি বাংলাদেশের জন্য তার লড়াইয়ের দাগ বয়ে চলেছেন। তিনি বেশি কথা বলেননি, তবে আমি তার ছেলে তারেক রহমানের সাথে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ আলাপ করেছি। তিনি ভার্চুয়ালি তার দলের কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখেন। দেশের স্বার্থে, আমরা আশা করি তিনি ফিরে আসবেন এবং তার দলকে নেতৃত্ব দেবেন।

ডা. শফিকুর রহমানের ভাষায়, ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণভাবে, সম্মান এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। এভাবেই আমরা একটি উন্নত ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।