চব্বিশের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন কারফিউ দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যার উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
গতকাল সোমবার আসামিদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন।
সেই সাথে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেন। তাদের বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ফোনালাপে তারা আন্দোলনকারীদের শেষ করে দিতে বলেছেন।
ট্রাইব্যুনালে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
গত ৪ ডিসেম্বর এই মামলায় সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরে সে অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
প্রসিকিউশন পক্ষ জানায়, জুলাই আগস্টে ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় ফোনালাপ করেন আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান। সে ফোনালাপের এক পর্যায়ে কারফিউ চলাকালে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দিতে হবে বলেন তারা। তাদের এ বক্তব্যের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাদের এই বক্তব্য হত্যাকাণ্ডে উসকানি হিসেবে কাজ করেছে বলে অভিযোগ প্রসিকিউশনের।
সালমান-আনিসুলের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগের প্রথমটিতে বলা হয়, চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান ও আনিসুল। এর প্রেক্ষিতেই ১৯ জুলাই ফোনে কথা বলেন তারা। তাদের কথোপকথনের একপর্যায়ে রাতেই কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দিতে হবে বলে জানান সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় প্রাণ দিয়েছেন বহু ছাত্র-জনতা। কিন্তু নির্যাতন বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি তারা।
দ্বিতীয়ত সালমান-আনিসুলের জ্ঞাতানুসারে ২৩ জুলাই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ তাদের প্ররোচনা-উসকানিতে মিরপুরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় বাহিনী। তৃতীয়ত মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র করেছিলেন এই দুই প্রভাবশালী। তাদের উসকানি ও সহায়তায় ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ এ হত্যাযজ্ঞ ঘটে। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি-প্ররোচনায় ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এ আকাশ, সেতু, আলভীসহ ১২ জনকে হত্যা করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
পাঁচ নম্বরে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে পরিকল্পনা করেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। তাদের নির্দেশে প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের হামলায়মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বরে আল-আমিন, আশরাফুল, সাব্বির, রিতাসহ ১৬ জন হত্যার শিকার হন।
গত ৪ ডিসেম্বর তাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১। একই দিন সকালে ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
ঢাকার সদরঘাট এলাকা দিয়ে নৌপথে পালিয়ে যাওয়ার সময় ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তারা কারাগারে আছেন। ওই বছর ২৭ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
শাপলা চত্বরে গণহত্যা মামলার প্রতিবেদন
শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গণহত্যা-নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরও তিন সপ্তাহ সময় পেয়েছে প্রসিকিউশন। আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তিনি এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তিন সপ্তাহ সময়ের আবেদন করেন। পরে তার আবেদন মঞ্জুর করে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়।
এদিন সকালে এ মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে তিনি এ অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।