দেশের সংকটময় মুহুর্তে সরকারকে সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা সরকারের ব্যর্থতা চাই না। সফলতা চাই। তবে সরকারকে সঠিক পথে হাঁটতে হবে। জুলাই সনদ নিয়ে টালবাহানা চলবে না, মেনে নেওয়া হবে না। এর সমাধান সংসদে না হলে রাজপথ চেনা আছে। গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব হুঁশিয়ারি দেন। জামায়াতে ইসলামী মহানগরী দক্ষিণ এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন, এলডিপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল অলি আহমেদ বীর বিক্রম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. মোবারক হোসাইন, মেজর অব. আক্তারুজ্জামান। ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকিরের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, নায়েবে আমীর ড. হেলাল উদ্দিন, ল’ইয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এডভোকেট জসীম উদ্দিন সরকার, হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, কামাল হোসাইন এমপি প্রমূখ।
ডা. শফিকুর রহমান এদিন স্বাধীনতাসহ নানা ইস্যুতে কথা বলেন। কোন জাতি যখন গোলামির জিঞ্জিরে থাকে তখন বুঝে স্বাধীনতার মর্ম কি। এই ভূখন্ড কয়েক বার স্বাধীন হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াতের আমীর বলেন, প্রথম থেকেই বলা হয়েছিল বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু পদে পদে বৈষম্য করা হয়েছিল। একারণে ৭১ অনিবার্য্য হয়ে পড়ে। পাকিস্তান জনরায়কে মেনে না নিয়ে গুলী বেয়নেট দিয়ে দমন করতে চেয়েছিল। কিন্তু জন আকাক্সক্ষা দমিয়ে রাখতে পারেনি। এরপর বার বার বোতল পরিবর্তন হয়েছে। ভেতরটা পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন দুইবার স্বাধীন হওয়ার পরও দেশ বদলে না যাওয়ার জন্য জনগণ দায়ী না। এজন্য দায়ী নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং দুর্নীতি। মানুষের অধিকার হরণ এবং যোগ্যদের বাদ দেওয়া। মন্দকে দমন না করলে ৭১ ও জুলাই ম্লান হয়ে যাবে উল্লেখ করে জামায়াতের আমীর বলেন, দেশের শাসক বদল হলেও শোষক বদল হয়নি। ২৪’র ঘটনার পরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো হয়েছে। এগুলো সংবিধান বিরোধী।
সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন একই দিনে দুটি ভোট হলো। এখন গণভোট নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। একটা মানছে আরেকটা মানছে না। জনগণ এতো বোকা না।
জাতীয় স্বার্থে ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না জানিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা জানিয়ে দেন পাকিস্তান জনরায় না মানার কারণে দেশ স্বাধীন হয়েছে। পুরনো কায়দায় আবারো কিছু করতে চাইলে দেশবাসীকে অপমান করা হবে। আর তার খেসারত দিতে হবে বলেও বলে দেন ডা. শফিকুর রহমান। বলে দেন আবারো আয়না ঘর বানাতে চাইলে তা গুড়িয়ে দেওয়া হবে। মানুষ রক্ত দিতে শিখে গেছে। তাদের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলবে না। জুলাই সনদ নিয়ে টালবাহানা চলছে উল্লেখ করে জামায়াতের আমীর আরও বলেন, এখন জুলাই সনদ নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। ৭২ এর সংবিধানের কথা বলা হচ্ছে। অথচ শেখ মুজিব সেই সংবিধান বদল করেছেন। জিয়াউর রহমান পরিবর্তন করেছেন। বেগম জিয়াও ছুড়ে ফেলার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
দেওয়ালে কান পেতে জনগণের ভাষা বোঝার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিবেন না। ভুল বোঝানোর চেষ্টা করবেন না। ওসমান হাদীদের, জুলাইযোদ্ধাদের অপমান করবেন না। দেশের সংকটময় মুহুর্তে সংসদ ও বাইরের সব দলকে নিয়ে বসুন। জাতি উপকৃত হবে। আবারো ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে যাবেন না। তাহলে সব হাত মিলে রুখে দেওয়া হবে।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে কর্নেল অলি আহমদ বলেন, জামায়াতের আমীর স্বাধীনতার আমি বিদ্রোহ করেছিলাম বলায় কারো কারো আঁতে ঘা লেগেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় ছাড়া বাকীটা সময় দেশে দলীয় করণ বন্ধ হয়নি উল্লেখ করে এই বীর বিক্রম বলেন, এখন প্রশাসনে আমি আর মামু ছাড়া আর কেউ নাই। যারা আল্লাহ এবং নবী মানে না তারাই বৈষম্য করে বলেও উল্লেখ করেন কর্নেল অলি আহমদ।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে কর্ণেল অলি আহমদ আরও বলেন জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বিখ্যাত হয়েছেন। বেগম জিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্র দিয়ে সুনাম অর্জন করেন। আপনি সংস্কার পাশ করে নিজেকে ইতিহাসের পাতায় রাখতে পারেন।
অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শুরু থেকেই স্বাধীনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন আলেম ওলামারা। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ৯ মাসের না। তিনি বলেন, যেজন্য দেশ স্বাধীন হয়েছে সেই প্রত্যাশা আজো পূরণ হয়নি। একই কারণে ২৪ হয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে সংকট দূর করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে ই জনগণ বিদ্রোহ করে। তিনি জনআকাক্সক্ষাকে সম্মান দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জামায়াত নেতা অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
মাওলানার রফিকুল ইসলাম খান বলেন ২৬ মার্চ অনেক গৌরবের। তবে এখানো মানুষকে অধিকার আদায়ের জন্য জীবন দিতে হয়।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, আপনারা সংবিধানের কথা বলেন তাহলে ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হলেন কোন সংবিধান বলে। বেগম জিয়া জেল থেকে মুক্তি পেলেন কোন সংবিধান বলে। ২০২৬ এর নির্বাচন হলো কোন সংবিধানের কারণে ? জুলাই না থাকলে নতুন করে ফ্যাসিবাদ আসবে বলেও মন্তব্য করেন এই সংসদ সদস্য।
মো. মোবারক হোসাইন বলেন, বহু রক্তের বিনিময়ে ২৪ এসেছে। ২৪কে ভুলে গেলে বার বার ৫ আগস্ট আসবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে লড়াই চলবে।