মানবসভ্যতায় মারণব্যধি এইডস রোগ ভয়াবহ হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান রোগ নিরাময়ে সক্ষম হলেও প্রাণঘাতী রোগ এইডস নিরাময়ে এখনো অক্ষম। বাংলাদেশে এইচআইভি সেবার মান সংকটাপন্ন। অথচ এতে আক্রান্তের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। যদিও সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এইডসকে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে।

সূত্র মতে, গতকাল ০১ ডিসেম্বর পালিত হলো বিশ্ব এইডস দিবস। এবছর দিবসটির মূল বার্তা ছিল ‘চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে, নতুনভাবে এইডস প্রতিরোধ গড়ে তোলা’। গবেষকরা বলছেন, এইডস রোগের ভাইরাস এইচআইভি শরীরে প্রবেশ করলে শরীরের রোগপ্রতিরোধক কোষ যেমন-হেলপারটি সেল, মনোসাইট, ম্যাক্রফেজ, ডেনড্রাইটিক সেল, চর্মের ল্যাঙ্গারহেন্স, মস্তিষ্ক ও গোয়াল সেল ইত্যাদিকে আক্রমণ করে এবং সেগুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। ফলে মানবদেহের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তখন যেকোনো সংক্রামক জীবাণু সহজেই এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে পারে। শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটাতে পারে।

সূত্র মতে, এইডস (অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনো ডেফিয়েন্সি সিনড্রোম) হলো এক প্রকার ভাইরাস দ্বারা গঠিত রোগ। যে রোগ এইচআইভি নামক ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। এইচআইভি একটি ভাইরাস যা মানুষের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। তাছাড়া এই ভাইরাসটি রক্তের সাদা কোষ নষ্ট করে দেয়, যার ফলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে এইডস রোগে আক্রান্ত হওয়া। তবে এইচআইভি এবং এইডস কিন্তু একই বিষয় নয়। এইচআইভি একটি ভাইরাস এবং এইডস একটি অসুস্থতা, যা এইচআইভির কারণে হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ মারা যায় মারণব্যধি এইডসের কারণে। বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে প্রথম এইচআইভি (এইডসের ভাইরাস) পজিটিভ ব্যক্তি শনাক্ত হয়। এর মধ্যে এবার এইডসে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ। এইডস বা এসটিডি কন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২৪ সালে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৩৮ জন, মারা গেছেন ১৯৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১ হাজার ২৭৬ জন এবং মৃত্যু হয় ২৬৬ জনের। আর চলতি বছর আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়াতে পারে দেড় হাজার। একদিকে যখন সীমা ছাড়িয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা অন্যদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে এইডস নির্মূলের পরিকল্পনা করছে সরকার।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা রিপোট মতে, এইডসের বিস্তার ইতোমধ্যে মহামারি রূপ নিয়েছে। এইচআইভি নামক ভাইরাস সর্বপ্রথম আমেরিকায় বিজ্ঞানীদের মাঝে ধরা পড়লেও রোগটি আফ্রিকা থেকেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন দেশ ভারত, মিয়ানমার ও নেপালে ইতোমধ্যে এইডস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আক্রান্তের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো মৃদু আক্রান্তের দেশ হিসেবে বিবেচিত, তথাপি প্রতিবেশী দেশে এ রোগের দ্রুত বিস্তারের কারণে বাংলাদেশও ঝুঁকিপূর্ণ।

সূত্র মতে, প্রতিনিয়তই ঊর্ধ্বমুখী এইচআইভি বা এইডস রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। গবেষণা বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ শতাংশই সমকামী। রাজধানীতে এলার্জি পরীক্ষা করতে গিয়ে এইডস শনাক্ত হয় এক যুবকের। তিনি জানান, সমকামিতায় জড়িয়ে যাওয়ায় এমন পরিণতি তার। ওই যুবক বলেন, এই ভুল পথে না যেতে সবাইকে অনুরোধ করবো। একটা ভুলের জন্য সারাজীবন পস্তাতে হয়। আমি চাই না, আমার মতো কেউ এভাবে পস্তাক। চিকিৎসকরাও বলছেন একই কথা।

চিকিৎসক ড. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশে এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই সমকামী। এ ছাড়া ৪০ শতাংশের মতো বিদেশ থেকে এ রোগ বহন করে নিয়ে আসে। আর ব্ল্যাড বা এ জাতীয় বিভিন্নভাবে কিছু লোক আক্রান্ত হন।

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল দেশের একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র। চলতি বছর এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৩০০ এইচআইভি রোগী। বর্তমানে ভর্তি আছেন ১২ জন। কিট সংকটের পাশাপাশি জনবলের অভাবে বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও তা পাচ্ছেন না রোগীরা।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আরিফুল বাসার বলেন, আমাদের এখানে যারা আসেন, তারা খুব খারাপ পর্যায়ে এসে ভর্তি হন। এখানে আসা রোগীদের এইচআইভি ছাড়াও অন্যান্য রোগ থাকে। এগুলোর জন্য যে ধরনের ল্যাবের সাপোর্ট দরকার, সেটা আমরা তাদেরকে দিতে পারি না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় এইডস বা এসটিডি কন্ট্রোলের পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান বলেন, কিটের কিছুটা স্বল্পটা ছিল। এবার বিমানবন্দরে যখন কিট আসে, এর এক বা দুইদিন আগে আগুন লাগে। তাই ওই কিট আমরা এখনও পাইনি। তবে কয়েক দিনের মধ্যে কিট পেয়ে যাব।

গবেষকরা জানান, এইচআইভি সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই সর্বদা এইডস হয় না। শুরুতে ক্ষেত্র বিশেষ ইনফ্লুয়েঞ্জা জাতীয় উপসর্গ দেখা যেতে পারে। এরপর বহুদিন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। এইচআইভি ভাইরাসের আক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেহের প্রতিরক্ষাতন্ত্র দুর্বল হতে থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণ সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এমনকি সংক্রামক ব্যাধি বা টিউমারের শিকারও হতে পারেন, যেগুলো কেবলমাত্র সে সব লোকেরই হয় যাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কাজ করে না। এইচআইভি সংক্রমণের এই পর্যায়টিকে এইডস বলা হয়। এইচআইভি ভাইরাস কোনো রকম লক্ষণ ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ বছর মানুষের শরীরে বাস করতে পারে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মানবদেহে বিভিন্নভাবে এইডস রোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা বীর্য বা জরায়ু রসের সঙ্গে যদি সুস্থ কোনো ব্যক্তির রক্ত, শরীর রস বা মিউকাশ আবরণের সংস্পর্শ ঘটে, তবে এইচআইভি তথা এইডস রোগের বিস্তার ঘটে। এসব সংস্পর্শ নানাভাবে ঘটতে পারে। যেমন- কনডম ব্যবহার না করে অবাধ যৌন সহবাস, এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত শরীরে ধারণ বা গ্রহণ, অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা দাঁতের চিকিৎসা বা অপারেশনসহ আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ব্যবহার। এমনকি সংক্রমিত গর্ভবতী নারী থেকে শিশুর দেহে পর্যন্ত এ রোগ ছড়াতে পারে। এইডস রোধকল্পে উন্নত দেশসহ তৃতীয় বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত প্রতিকারের বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নিলে এইডসের ছোবল থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারবে নিশ্চিত। যেমন- অবাধ যৌনাচার বন্ধ করে নিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন, যৌন মিলনের ক্ষেত্রে কনডম ব্যবহার নিশ্চিত করা, রক্ত সংগ্রহের পূর্বে রক্তদাতার রক্ত পরীক্ষা করা, গর্ভাবস্থায় মায়ের এইডস ছিল কি না তা পরীক্ষা করা, সুচ-সিরিঞ্জ জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করা, মাদকদ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকা, প্রচার মাধ্যমগুলোকে এ ব্যাপারে সক্রিয় করা।

চিকিৎসকরা বলছেন, এইচআইভি একবার কোনোভাবে শরীরে ঢুকে গেলে তখন তাকে পুরোপুরি দূর করাও যায় না। চিকিৎসার দ্বারা এর লক্ষণ বা জটিলতাগুলো আরও কিছু বছর পিছিয়ে রাখা যায় মাত্র। এইচআইভির বিরুদ্ধে আজও কার্যকরি প্রতিষেধক টিকা এবং কোনো ওষুধও আবিষ্কৃত হয়নি। তাই প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা এইডস প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।

ইউএনএইডস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮৭% মানুষ নিজেদের এইচআইভি আক্রান্তের বিষয়ে জানেন। তবে বাংলাদেশে এই পরিমাণ আরও কম। কারণ সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেক উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মানুষ পরীক্ষা এবং চিকিৎসা এড়িয়ে চলেন। বিশ্বব্যাপী এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৫৩% নারী ও কন্যা এবং ২০২৪ সালে নতুন সংক্রমণের ৪৫% নারী। বাংলাদেশে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যা বেশি হলেও, প্রবাসী কর্মীদের স্ত্রীদের মধ্যে ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ, সচেতনতার অভাব এবং লিঙ্গভিত্তিক বাধা ও চিকিৎসার অভাব। ইউএনএইডস জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী ইনজেকশন নেশাকারীদের ৭.১%, সমকামী পুরুষদের ৭.৬% এবং ট্রান্সজেন্ডারদের ৮.৫% মানুষ এইচআইভি আক্রান্ত, যা বিশ্বব্যাপী ০.৭% হার থেকে অনেক বেশি।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক এইচআইভি তহবিল কমে ১৮.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা প্রয়োজনের চেয়ে ১৭% কম। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি আরও অর্থায়ন কমে যায়, তবে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অগ্রগতি আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটিং মেকানিজম (বিসিসিএম) ও পিএলএইচআইভি নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক মো. হাফিজুদ্দিন মুন্না বলেন, বাংলাদেশে এইচআইভি সেবার মান সংকটাপন্ন। গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ এইচআইভি প্রোগ্রাম সীমিত করা হয়েছে। কমিউনিটির কাছ থেকে সেবা সরিয়ে হাসপাতালে স্থানান্তরের ফলে বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি হয়েছে। এইচআইভি চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তা উভয়ই প্রয়োজন। কিন্তু এ নিয়ে কোনও বিশেষ বিভাগ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এ বছর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছেন। এই সময়ে এইচআইভি সম্পর্কিত কারণে মারা গেছেন ২১৯ জন। ২০২৪ সালে দেশে ১ হাজার ৪৩৮ জন এইচআইভি আক্রান্ত হন এবং ৩২৬ জন এইচআইভি সম্পর্কিত কারণে মারা যান। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ২৭৬ ও ২৬৬।