মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বাতিলসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করে সংসদে বিল পাস হয়েছে। যার ফলে সুপ্রিম কোর্টে প্রতিষ্ঠিত পৃথক সচিবালয় থাকছে না। আর বিচারক নিয়োগের আগের পদ্ধতি ফিরে আসছে। অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিলগুলোতে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা একমত ছিল না। তারা এসব বিল পাস করার আগে জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু তা গ্রহণ না করে পাস করানো হয়। এ কারণে সংসদ থেকে বিরোধী দল ওয়াক আউট করে। সবমিলিয়ে গতকাল সংসদে ৩১টি বিল পাস হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে সংসদে উত্থাপিত নতুন বিলের তীব্র সমালোচনা করেন এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদ। তিনি অভিযোগ করেছেন, এই বিলের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের ‘পিঠে ছুরিকাঘাত’ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি কি ‘আরেকটা আওয়ামী লীগ’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে কি না।
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে সংসদে বিল পাস
অন্তর্বর্তী সরকারের আনা জাতীয় ‘মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫’ রহিত করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করে আনা বিল সংসদে পাস হয়েছে। ওই বিলের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, আগের মানবাধিকার কমিশন ছিলো মূলত বিরোধী দল কমিশন হিসেবে কাজ করেছে। জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, জিয়া পরিবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শিকার। সরকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।
বিলটি উত্থাপনের পর সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এই বিল পাসের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটিকে রেস্টোর (পুনঃপ্রচলন) করা হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, এই কমিশনকে বিরোধী দল ও মত দমনে ব্যবহার করা হয়েছে। বিএনপিকে দমন করার বৈধতা দিয়েছে এই কমিশন। এমনকি কমিশনের চেয়ারম্যানকে বলতে শুনেছি, মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে জামায়াত নেতা-কর্মীদের গুলী করা বৈধ। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটিকে ল্যাপস (বিলুপ্ত) করে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়া হবে এই সংসদের জন্য একটি ব্যাকওয়ার্ড মুভ বা পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ। এটি জাতি পিছিয়ে পড়ার একটি টেক্সটবুক এক্সাম্পল হয়ে থাকবে। কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তার মতে, ছয় সদস্যের বাছাই কমিটিতে অধিকাংশই সরকার পক্ষের হওয়ায় কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে সরকারি অনুমতির বাধ্যবাধকতা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, যেখানে সরকার বা বাহিনী জড়িত থাকতে পারে, সেখানে তাদের অনুমতি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়।
বিরোধীতার জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্য খুব সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছেন। উনার বক্তৃতাগুলো পল্টন ময়দান, প্রেসক্লাব বা রাজপথের জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও জুসি (রসালো)। উনি সব পড়েছেন, শুধু বিলটা পড়েননি। বিলের প্রথম লাইনেই দেওয়া আছে, সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজনে এবং মানবাধিকার কমিশনের জায়গাটি যাতে ফাঁকা না থাকে, সেই কারণেই ২০০৯ সালের আইনটি রেস্টোর করা হয়েছে। অধ্যাদেশ ‘রহিত’ করা হলে এবং ২০০৯ সালের আইনটি রিস্টোর না হলে বিশ্ববাসী জানবে বাংলাদেশে মানবিধকার কমিশন নেই।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বাতিল
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি দিলেও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ।
আলাদা দুটি বিল পাসের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। এর মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হয়। আর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। ফলে আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইন থাকছে না। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তিও থাকছে না। বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম আগের কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তখন আপত্তি জানান বিরোধী সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এই সদস্য বলেন, “বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন।” তার ভাষায়, “ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের আয়োজন চলছে।”
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না, তা বলতে পারে; কিন্তু সংসদকে কোনো আইন করতে ‘ডিক্টেট’ করতে পারে না। মাসদার হোসেন মামলা প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আদালত আইন নিয়ে মত দিতে পারে, কিন্তু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় এবং তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জামায়াতের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা চাই। ওনাদের পিতারা বিচার বিভাগের কাছে অবিচারের শিকার হয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতা যেমন অ্যাবিউজড হয়েছে, যারা সে বিচার করেছিলেন তারা সবচেয়ে স্বাধীন বিচারক ছিলেন।” বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সুরক্ষা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত। সেই সুপ্রিম কোর্ট থেকেই ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ এর জন্ম হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিচারের অভিযোগও উঠেছে।
বিচারকদের শোকজ দেওয়ার অভিযোগের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী বিচারক থাকা অবস্থায় কেউ কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না। তার ভাষায়, কেউ কেউ ক্লাস নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, কেউ কেউ ফেইসবুকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে হাজির হচ্ছেন। সে কারণেই তাদের বিষয়ে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
পরে আইনমন্ত্রী ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের জন্য প্রস্তাব করেন। এতে আপত্তি দেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সদস্য আখতার হোসেন।
আইনমন্ত্রীর আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিচারপতিরা সাংবিধানিক সুরক্ষা পেয়েও কীভাবে ‘রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে’ বিচারকার্য চালিয়েছেন, কীভাবে বেগম খালেদা জিয়ার সাজার বাড়ানো হয়েছে এবং কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, সেটাই প্রমাণ করে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার গোড়াতেই সমস্যা ছিল।
বিল পাসের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, আলোচনার সময় একজন বিচারপতির নামের শেষে একটি বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছিল, সেটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। বিশেষ কমিটির ওই প্রতিবেদনে নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) জানিয়ে জামায়াতের এমপিরা বলেছিলেন, জামুকা অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায়, কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাস হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামীর মতো দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
জামায়াতের এমপিরা এই অধ্যাদেশের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ এবং মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখেন। কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন।
গতকাল অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ অবিকল রেখে পাস হওয়া বিলগুলো হচ্ছে-‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করা ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ বিল পাস করা হয়। এছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ এর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিত ও পুনঃপ্রচলন) বিল, ২০২৬’ ,‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ গ্যাস (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল, ২০২৬’, ‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন বিল, ২০২৬’, ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) বিল ২০২৬, উপজেলা পরিষদ ( সংশোধন) বিল ২০২৬, ব্যাক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা বিল ২০২৬, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (সংশোধন) বিল ২০২৬ ও নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (সংশোধন) বিল ২০২৬।