• হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ৯৪ জন
  • ২০ থেকে ২১টি উপজেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
  • কাল থেকে শুরু হচ্ছে বেশি আক্রান্ত এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি
  • রাজধানীতে বেড়ে গেছে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিক্রি

সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। গতকাল শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে কমপক্ষে ৯৪৭ জন আক্রান্ত ও ৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ভাইরাসবাহিত রোগ হাম আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম, বগুড়া, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে হাম উপসর্গের রোগীদের সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু। অভিভাবকদের মধ্যে হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যবিভাগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশের বিভিন্ন জেলায় হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত মোট নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৭৭১ জন। আর সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯২। এ সময় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৪ জন। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট সুস্থ রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৫২৭ জন।

এই পরিস্থিতিতে মোকাবিলায় আগামিকাল রোববার থেকে বেশি আক্রান্ত এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গত দুই দিনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও সিভিল সার্জনদের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং শরীরে ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতি রয়েছে তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তবে নির্ধারিত বয়সে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ালে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে এবং সহজে হাম আক্রান্ত হয় না; বড় ক্ষতিও হয় না।

এদিকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘বজ্রপাতের মতো আকস্মিক’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ছিল না বলেও তিনি জানান।

হামে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে ভেন্টিলেটরের অভাবে ৩৩টি শিশু মারা যাওয়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। এ জন্য হামে শিশুর অকাল মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতিকে দায়ী করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

ইপিআইয়ের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেশি আক্রান্ত এলাকায় দুই সপ্তাহব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালানো হবে। প্রয়োজন হলে এই সময় বাড়ানো হতে পারে। এখন পর্যন্ত ২০ থেকে ২১টি উপজেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে কারা এই টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আরও একজন সন্দেহভাজন হাম রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা জাহান জানান, এ নিয়ে মোট মৃত্যু বেড়ে ২৭ হয়েছে। তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাসপাতালে ৮১ জন সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এদিকে, রাজধানীর ফার্মেসিগুলোতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিক্রি বেড়ে গেছে। অনেকে হামের টিকাও কিনতে আসছেন। ফার্মেসি মালিকরা জানান, দেশীয় কোম্পানি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ও একটি বিদেশি কোম্পানি হামের টিকা সরবরাহ করে থাকে। বর্তমানে এ টিকা বাজারে নেই।

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম আক্রান্ত রোগীর শরীরে র‌্যাশ দেখা দেয়। আক্রান্ত শিশুর শ্বাসকষ্টজনিত নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, সর্দিকাশি, নাক দিয়ে পানি ঝরা, চোখে লালভাব, ত্বকে ফুসকুড়িসহ বিভিন্ন সমস্যা হয়। অনেকের শরীরে ব্যাপকভাবে ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন হয়ে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো বা যে কোনো ধরনের টিকা শরীরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী সঠিক মাত্রা বা ডোজ ও সময় অনুসরণ করা না হলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।

হাম আক্রান্ত শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হলে বা চোখের মণি ঘোলা লাগলে ১৪ দিনের মাথায় আরেকটি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল (মোট তিনটি) দেওয়া যেতে পারে। হামে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সংক্রমণ হতে পারে। হামের জটিলতা হিসাবে পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া বা মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে। শিশুর কানপাকা, মুখে ঘা, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ অনেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’ মারাত্মকভাবে কমে গেলে চোখের পানি কমে যায় বা চোখ শুষ্ক হয়ে যায়। এতে রাতকানা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। ভিটামিন ‘এ’ হাম প্রতিরোধ করতে পারে না। তবে সঠিক ডোজে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিলে হাম হওয়ার পর জটিলতা কম হয়।

তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’ খেলে শরীরে বিভিন্ন ক্ষতি হতে পারে। যেমন-মাথাব্যথা, বমি, মাথা ঘোরা, দৃষ্টিসমস্যা (ঝাপসা দেখা), ত্বক শুষ্ক হওয়া, চুল পড়া, লিভারের ক্ষতি (গুরুতর ক্ষেত্রে লিভার ড্যামেজ), হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা, গর্ভাবস্থায় ভ্রƒণের জন্মগত ত্রুটি হওয়ার ঝুঁকি। অতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’ শরীরে বিষক্রিয়ার মতো কাজ করে এবং লিভার ও অন্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।

এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টিকা দেওয়া হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিশেষ ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। খুব কম বয়সে (যেমন-ছয় মাসের আগে) টিকা দিলে শরীরে ঠিকভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। আবার নির্ধারিত সময়ে না দিলে সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থাকে। ফলে ভবিষ্যতে হাম হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। একই টিকা বারবার নেওয়া হলে বড় ক্ষতি না হলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

দেশজুড়ে হামের প্রকোপের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সর্বস্তরের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি (অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি) বাতিল করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন রুমী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ কথা জানানো হয়।

আদেশে বলা হয়, শিশুদের মাঝে হামজনিত নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় আপদকালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা ও হামের ভ্যাকসিন প্রদানের সুবিধার্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও অধিদপ্তরাধীন সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সর্বস্তরের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি (অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি) স্থগিত/বাতিল করা হলো। এ আদেশ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে জারি করা হলো এবং অবিলম্বে কার্যকরী হবে।