জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো ছাড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। ভোট দেওয়ার তাগিদে মানুষের এই বাড়ি ফেরার দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। বাসস্ট্যান্ডে দূরপাল্লার বাস ধরতে ঘরমুখো ভোটারদের ব্যতিব্যস্ত। কারো হাতে ব্যাগ, কারোবা মাথায় বস্তা। অনেকেই পরিবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন বাসের জন্য। আবার দল বেঁধে পিকআপে, ট্রাকে বাড়ির পথে চলেছে মানুষ। একই সাথে লঞ্চ ও রেলষ্টেশনে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। এর সঙ্গে অভিযোগ উঠেছেন যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া বেশি নেওয়ার।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনাল, সদরঘাট লঞ্চ ষ্টেশন ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। আজ বুধবার শেষ কর্মদিবস হওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই আগেভাগেই পরিবার নিয়ে রওনা দিয়েছেন। বাস টার্মিনালগুলোতে ঈদের সেই চিরচেনা দৃশ্য। পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বুধবার থেকে ভিড় আরও বাড়বে। বাসের আগাম টিকিটও প্রায় শেষ। রাজধানীর কমলাপুর স্টেশনেও ট্রেনের টিকিটের জন্য দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ বছর পর একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়ে সবাই এভাবে নিজ এলাকায় ছুটছেন বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।

চাকরি ও কর্মসূত্রে ঢাকা ও গাজীপুরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লাখ লাখ মানুষ বসবাস করেন। কর্মজীবী এই বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে, মফস্বল শহরে। তারা নিজ নিজ এলাকার ভোটার। গত ১৭ বছর ধরে ভোট দিতে না পারা বহু মানুষ এবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান, যা নির্বাচনী প্রচারের সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে বৃহস্পতিবার রায় দেবেন দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা। এই উপলক্ষে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি। পরদিন শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। অবশ্য শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, কর্মচারীদের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারিও ছুটি ছিল। এই ছুটি ধরে যেমন ভোট দেওয়ার জন্য, তেমনি স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্যও মানুষ বাড়ি ছুটছে।

সরেজমিনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কালামপুর, ঢুলিভিটা, নবীনগর, সাভার বাসস্ট্যান্ড, আমিনবাজার ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পল্লী বিদ্যুৎ, বাইপাইল, আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের আশুলিয়া, জামগড়াসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে দেখা যায় ঘরমুখো যাত্রীর চাপ।

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। ভোট দেওয়ার উৎসাহ আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ থাকলেও, পথে পথে নানাবিধ ভোগান্তি সাধারণ মানুষের কপালে ফেলছে চিন্তার ভাঁজ।

সকাল থেকেই সদরঘাটে পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জগামী পন্টুনগুলোতে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়।

সরেজমিনে দেখা যায়, আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইলেও রাজধানীর যানজট ও সড়কে অব্যবস্থাপনা যাত্রীদের নাজেহাল করে তুলেছে। বিশেষ করে সদরঘাট এলাকার প্রবেশপথগুলোতে তীব্র জট দেখা গেছে। যাত্রীদের ঘাটে আসতে গণপরিবহন থেকে নামতে হয়, প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে রায়সাহেব বাজার মোড়ে। এই সড়কটিতে বর্তমানে রিক্সা, ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের তীব্র যানজট থাকায় বাধ্য হয়ে যাত্রীদের পায়ে হেঁটেই ঘাট পর্যন্ত আসতে হচ্ছে। আর সড়কের দুপাশে ফুটপাতের ওপর অস্থায়ী দোকানপাট বসায় চলাচলের পথ হয়ে গেছে সরু। ফলে মালামাল ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘাট পর্যন্ত আসতে পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে। আর এসব স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীদের উপস্থিতিও কম ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইকবাল বলেন, ভোট দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব, তাই বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু সদরঘাটের সংযোগ সড়কগুলোর বিশৃঙ্খলা দূর না করলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি কোনোদিনও শেষ হবে না।

গৃহিণী রেহানা ইয়াসমীন বলেন, পরিবার আর দুই সন্তান নিয়ে মিরপুর থেকে আসলাম। রাস্তার যে অবস্থা, বিশেষ করে রায়সাহেব বাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত হেঁটে আসা আমাদের জন্য বিভীষিকা ছিল। ছোট বাচ্চা নিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় নেই, সব দোকানদারদের দখলে। কর্তৃপক্ষ যদি এই কয়েকটা দিন রাস্তা পরিষ্কার রাখতো, তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অর্ধেক কমে যেত।

চাঁদপুর যাওয়া ইডেন কলেজ শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বলেন, আমি এবার প্রথম ভোটার হয়েছি। নিজের ভোটটা নিজে দেওয়ার জন্য অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। ডিজিটাল বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ব্যালটে সিল মারাটা আমার কাছে একটা বড় ইভেন্ট। যদিও সদরঘাট পর্যন্ত আসতে রিকশা আর ভ্যানের জটলায় দুই ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে, তাও ভোট দেওয়ার রোমাঞ্চে সব কষ্ট ভুলে গেছি।

বরিশালে লঞ্চের অপেক্ষায় থাকা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হাজী মোজাফফর আলী বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অনেক নির্বাচন দেখেছি। নাগরিক দায়িত্ব পালনের জন্য গ্রামে যাচ্ছি। সদরঘাটে মানুষের এই যে স্রোত, এটা প্রমাণ করে মানুষ এখনো গণতন্ত্র আর উৎসবকে কতটা ভালোবাসে। তবে ফুটপাতগুলো যদি দখলমুক্ত থাকতো, তবে আমার মতো বয়স্কদের জন্য যাতায়াতটা একটু সহজ হতো।

বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতি কার্যালয়ের দপ্তর সম্পাদক প্রদীপ বড়াই বলেন, কয়েকটি এলাকার প্রতিদ্বন্দিতা করা প্রার্থীরা সেসব এলাকার যাত্রীদের জন্য বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে লঞ্চের সংখ্যাও বাড়িয়েছে। সন্ধ্যার পরে আরও যাত্রীদের চাপ বেড়েছে।

সদরঘাট নৌ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, সমন্বিত সবার সঙ্গে সমন্বয় সভা করে যাত্রীরা যেন নিরাপদে ভ্রমণযাত্রা করতে পারেন সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের থানায় এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ আসেনি। নিয়মিত আমাদের টহল দল নিরাপত্তা বিষয়গুলো তদারকি করছেন।