ঈদের চতুর্থ দিনেও রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন নিয়ে ঘুরতে এসেছেন নগরবাসী। এতেই জমে উঠেছে বিনোদন কেন্দ্রগুলো। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রমনা পার্ক, মিরপুর-১ এর জাতীয় চিড়িয়াখানা, লালবাগ কেল্লা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, শ্যামলী শিশু পার্ক, ফ্যান্টাসি কিংডম ও বলধা গার্ডেনসহ রাজধানীর অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রে দর্শকদের প্রচুর ভিড় দেখা গেছে। ছোট বড় সব বয়সের মানুষের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে বিনোদন কেন্দ্রগুলো। এছাড়াও ঈদের দিন থেকেই ধানমন্ডি লেক, রবীন্দ্র সরোবর ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ঘুরতে এসেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শিশু থেকে বৃদ্ধ বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মানুষ তাদের পরিবার পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। কেউ গাছের ছায়ায় বসে মেতেছেন আড্ডায়, কেউবা ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রাকৃতিক পরিবেশে, কেউবা শিশুদের আবদারে চড়ছেন প্যাডেল চালিত নৌকা ও ঘোড়ার গাড়িতে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় জাতীয় চিড়িয়াখানার গেট খুলে দেয়ার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় দর্শনার্থীদের ঢল। মা বাবার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে বাঘ সিংহ দেখতে এসেছে ছোট্ট সোনামনিরা। বইয়ের পাতার ছবিগুলোকে বাস্তবে দেখে বেশ খুশি তারা। বাবা মায়েরাও বলছেন, পশুপাখিদের সঙ্গে পরিচয় করাতেই তারা বাচ্চাদের নিয়ে এসেছেন চিড়িয়াখানায়। তবে প্রাণীদের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন অনেকেই। আরও বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন আছে বলেই মন্তব্য করেন ঘুরতে আসা মানুষ। এদিকে, অতিরিক্ত মানুষের ঢল সামাল দিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দিকে নজর দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। এবার ঈদের দীর্ঘ ছুটি পাওয়া গেছে। তাই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছুটি উপভোগ করতে পারছে। ঈদের ছুটির তিনদিনের মতো চতুর্থ দিন গতকাল বৃহস্পতিবারও ফ্যান্টাসি কিংডমে তেমন ভিড় ছিল না। তবে যারা এসেছে বিভিন্ন ধরনের রাইড এনজয় করছে। আজও প্রচন্ড গরমে ওয়াটার কিংডমে পানিতে নেমে আনন্দে মেতেছে বিনোদনপ্রেমীরা।
চিড়িয়াখানায় ভিড় দর্শনার্থীর: ব্যস্ততম এই শহরের রাজধানীবাসী ঈদের ছুটিতে পরিবার ও বাচ্চাদের নিয়ে প্রকৃতির মাঝে ঘুরতে আসেন জাতীয় চিড়িয়াখানায়। ঈদুল ফিতরের চতুর্থ দিনেও চিড়িয়াখানায় ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ঈদের প্রথম তিন দিনের মতন চিড়িয়াখানায় ভিড় দেখা যায়। চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা যায়, স্থায়ী টিকিট কাউন্টার থাকলেও ঈদের কয়েকদিনের ভিড় সামলাতে বাড়তি কাউন্টার খোলা হয়েছে। তবু লোকজনকে টিকিট পেতে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। চিড়িয়াখানায় প্রবেশের প্রথমে রাস্তায় ভোগান্তি পরতে হচ্ছে দর্শনার্থীদের। তারপর চিড়িয়াখানার সামনের চত্বরে হকারদের জটলা ও টিকিট কাউন্টারের লম্বা লাইন অনেক দর্শনার্থীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরীণ শিশু পার্কে স্লিপার, রেলগাড়ির রাইডারের সামনে শিশু ও অভিভাবকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
বিমানবন্দর হাজী ক্যাম্প থেকে মো. আনিসুর রহমান মাদরাসায় পড়ুয়া দুই ছেলেকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছে। তিনি বলেন, ঈদের প্রথম তিন দিনে চিড়িয়াখানায় আসিনি। আমি জানি ঈদে প্রথম তিন দিন অনেক ভিড় হয়। কিন্তু আজকে (গতকাল বৃহস্পতিবার) এসে দেখছি ভিড়। বাচ্চাদের মূলত বাঘ, সিংহ, হাতি, জিরাফ ও জলহস্তী দেখাতে নিয়ে এসেছি। পুরান ঢাকা এলাকা থেকে ঘুরতে আসা মো. মানিক বলেন, ভিড়ের বিষয় জানলে ঈদের ছুটি শেষে চিড়িয়াখানায় আসতাম। বাচ্চাদের এখানে জীবজন্তু দেখাবো। জীবজন্তু ওরা জীবন তো দেখে অনেক আনন্দ পাবে। জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ঈদের দিন ৭০ হাজারের একটু বেশি এবং দ্বিতীয় দিন এক লাখ ৭০ হাজার, তৃতীয় দিনে এক লাখ ৫০ হাজারের কাছাকাছি দর্শনার্থী এসেছেন চিড়িয়াখানায়। আমরা ধারণা করছি আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) প্রায় ৯০ হাজার দর্শনার্থী প্রবেশ করেছেন।
লালবাগ কেল্লায় দর্শনার্থীদের ভিড়: স্বস্তির ঈদের চতুর্থ দিনে রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লায় বিনোদন প্রেমীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করে পরিবার পরিজন নিয়ে নগরবাসী ছুটে এসেছে মুঘল আমলের ঐতিহাসিক এ স্থাপনায় সময় কাটাতে। গতকাল বৃহস্পতিবার লালবাগ কেল্লার সূত্রে জানা যায়, টিকেট কাউন্টার এবং প্রবেশমুখে দীর্ঘলাইন পার হয়ে দর্শনার্থীরা লালবাগ কেল্লায় প্রবেশ করছেন। দেশি দর্শনার্থীদের পাশাপাশি কয়েকজন বিদেশি দর্শনার্থীর দেখা মিলেছে শত শত বছরের পুরাতন এ মুঘল দুর্গে। ঢাকায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত ঘোষিত এ স্থাপনায় পুরাকীর্তির মধ্যে রয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট লালবাগ দুর্গের দক্ষিণ-পূর্ব তোরণ, তিন গম্বুজ বিশিষ্ট লালবাগ দুর্গ মসজিদ, হাম্মাম ভবন ও পরিবিবির মাজার। পুরাকীর্তির বাইরে রয়েছে লালবাগ দুর্গ জাদুঘর পুকুর, পুকুর, পানির ট্যাংক, সুউচ্চ দেয়াল ইত্যাদি।
জাতীয় সংসদ ভবন: বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই সংসদ ভবন ঘুরতে ভিড় জমিয়েছেন অনেকে। রোদের তেজ কমতেই সেই ভিড় আরো অনেকগুণ বাড়ে। জাতীয় সংসদের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ না থাকলেও বাইরে থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা দেখে মন জুড়াচ্ছেন আগতরা। কেউ সংসদ ভবনের সামনে নিজের ছবি ফ্রেমবন্দি করছেন মোবাইল ফোনে। সংসদ ভবনের সামনের রাস্তা জুড়ে বসেছে খাবার দোকানসহ বিভিন্ন খেলনার দোকান। সেসব দোকান দেখেই ছুটে যাচ্ছে শিশুরা। এছাড়া সংসদ ভবনের সামনে ছিল ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার সুযোগ। সংসদের সামনে থেকে খামার বাড়ি মোড় পর্যন্ত এক রাউন্ড ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে গুনতে হচ্ছে ৩০০ টাকা। এছাড়া বল পরীক্ষার যন্ত্রে ঘুষি মেরে নিজের শক্তি পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে সেখানে। যদিও প্রতিটি ঘুষির জন্য অংশগ্রহণকারীকে গুনতে হচ্ছে ২০ টাকা করে। সংসদ ভবনের সামনে বিভিন্ন ধরনের খেলনা বিক্রি করছেন আরিফ। তিনি বলেন, গত দুই দিন অনেক মানুষ এসেছে। আজও মানুষের ভিড় রয়েছে। বেচা-বিক্রিও অনেক ভালো হয়েছে।
ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবর: ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবরেও অসংখ্য দর্শনার্থী ঘুরতে এসেছেন। এখানের বিশেষ আকর্ষণগুলোর মধ্যে ছিল বায়োস্কোপ ও প্যাডেল চালিত নৌকায় ভ্রমণ। ৫০ বিনিময়ে বায়োস্কোপ দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন ছোট থেকে বড় সবাই। প্রথমবারের মতো বায়োস্কোপ দেখে উচ্ছাসিত শিশুরা। নিজের মেয়েকে নিয়ে বায়োস্কোপ দেখা তানিয়া সুলতানা নামের এক গৃহিণী বলেন, আমার আর আমার মেয়ে বায়োস্কোপ দেখলাম। খুবই ভালো লেগেছে। আগে টিভি, বইতে বায়োস্কোপের কথা শুনেছি। কিন্তু কখনো দেখিনি। আজ দেখলাম। এদিকে ধানমন্ডি লেকে প্যাডেল চালিত নৌকায় চড়তে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ইচ্ছুকদের। মো. পলাশ নামের একজন বলেন, আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি টিকেট পাচ্ছি না। নৌকা কম, কিন্তু চড়ার মানুষ বেশি। তাই নৌকা ঘাটে আসার পর টিকেট দিচ্ছে। অন্যদিকে রবীন্দ্র সরোবরেও বিনোদেনপ্রেমীদের আড্ডা-গান ও খাওয়া দাওয়ায় মেতে উঠতে দেখা গেছে। কেউ কেউ লেকের ধারে বসে গল্প করছে। কেউ ফুড কোর্টগুলোতে বসে করছেন ভোজন-বিলাস। সব মিলিয়ে রাজধানীবাসীর ঈদ আনন্দ উপভোগ করার এক অন্যতম জনপ্রিয় স্থান হয়ে উঠেছে এই জায়গাটি।