তেল সরবরাহ বৃদ্ধি ও পাম্প মালিক ও কর্মচারীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত সেনাবাহিনী মোতায়েন জরুরি মনে করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। অন্যথায় সারাদেশে পেট্রোল পাম্প বন্ধ করা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটি।
গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে এ মন্তব্য করেছেন সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক। সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, মাঠপর্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাম্প মালিক ও কর্মচারীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং পেট্রোল পাম্পগুলো সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, পুলিশ অনেক জায়গায় ঠিকভাবে সহায়তা করছে না। আমার পাম্প বন্ধ করার জন্য ৯৯৯ কল দিয়ে পুলিশে এনেছি, পুলিশ এসে ভোক্তাদের বলেছে আপনারা মালিকের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি যদি পাম্প চালু রাখে আমাদের আপত্তি নেই।
অনেক জায়গায় তেল সরবরাহ কম থাকায় পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও পাম্পে হামলা ও কর্মচারীদের ওপর আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। সুনামগঞ্জে এক পাম্প কর্মচারীকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনাও উল্লেখ করেন সংগঠনের নেতারা। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় পাম্পে দায়িত্বরত কর্মচারীদের সঙ্গে বাকবিত-া ও শারীরিক হেনস্তার ঘটনাও ঘটছে। আমরা চরম শঙ্কার মধ্যে সময় পার করছি। অবিলম্বে পাম্পগুলোতে সেনা বাহিনী মোতায়েন করার দাবি জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, সরকার একদিকে বলছে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে, অন্যদিকে রেশনিং করে জ্বালানি তেল সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বার্তার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকেই আতঙ্কে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।সরকার ঘোষণা দিয়ে দায় সেরেছে, আর আমাদের সামলা দিতে হচ্ছে।
মনিটরিংয়ের নামে বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে পাম্প মালিকদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। অথচ তেল সরবরাহ ও বিক্রির হিসাব সহজেই পাম্পের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংক এবং ডিসপেনসার ইউনিটের মিটার রিডিং যাচাই করে নির্ধারণ করা সম্ভব। এ ধরনের কাজ সংশ্লিষ্ট বিপণন কোম্পানি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই করতে পারেন। অবিলম্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বন্ধের দাবি জানানি তিনি।
তিনি বলেন, রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে সীমিত পরিমাণ তেল দেওয়ার নির্দেশনাও মাঠপর্যায়ে জটিলতা তৈরি করছে। প্রতিটি মোটরসাইকেলের কাগজপত্র যাচাই করতে সময় লাগায় পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে এবং এতে অরাজক পরিস্থিতির আশঙ্কা বাড়ছে।
মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং বা সীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আমরা তা যথাযথভাবে পালন করছি।
রাজধানীসহ সারা দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘তেল ফুরিয়ে যাওয়ার’ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অথচ একদিকে সরকার বারবার বলছেন দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে, আবার সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে রেশনিং করে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে। এই সিদ্ধান্তহীনতা এবং একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য সামাল দিতে গিয়ে আমরা ভোক্তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছি। এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের পরামর্শ হলোঅহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন এবং রেশনিং ব্যবস্থা নির্বিঘেœ পরিচালিত হতে দিন। যারা অবৈধভাবে মজুত করছে বা গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। পেট্রোল পাম্প মালিকরা যদি তেলের সরবরাহ নিয়ে কোনো অনিয়ম করে, অবৈধ মজুত করে বা নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দামে বিক্রির চেষ্টা করে, তবে সংশ্লিষ্ট পাম্পের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা বা যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবশ্যই নেওয়া হোক। এ ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশন সরকারকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবে।
নাজমুল হক বলেন, সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত তেল ভোক্তা পর্যায়ে সঠিকভাবে বিপণন হচ্ছে কি না বা অবৈধ মজুত করা হচ্ছে কি না তা মনিটরিং করার জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রয়োজন নেই। কারণ কোম্পানি থেকে সরবরাহকৃত তেল, পাম্পের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংক এবং ডিসপেন্সার ইউনিটের মিটার রিডিং যাচাই করলেই অনিয়ম স্পষ্ট হয়ে যায়। এটি মন্ত্রণালয়, বিপিসি বা বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই মনিটরিং করা সম্ভব। যখন মোবাইল কোর্ট কোনো পাম্পে পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে প্রবেশ করে, তখন মনে হয় তারা কোনো ডাকাত বা দাগি আসামি ধরতে এসেছেন।
তিনি আরও বলেন, ভোক্তারা তাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সংগ্রহের জন্য পাম্পে আসেন। আমরা তেল আমদানি বা প্রস্তুত করি না। আমরা সরকার থেকে মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে সরবরাহ নিয়ে থাকি। সরকার যদি চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ না করে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের পাম্পগুলোকে ভোক্তাদের সাথে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়, তবে আমাদের প্রতিষ্ঠান ও স্টাফরা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন। এরূপ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বিপণন ব্যবস্থা সচল রাখা অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতির কিছু সরকারি নির্দেশনা আমাদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।