ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক শহীদ শরিফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ ওরফে রাহুল ও তার সহযোগীরা ভারতে পালিয়েছে। সেখানে খুনিদের দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল রোববার সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান। এদিকে ৭ জানুয়ারির মধ্যে আলোচিত এ জুলাই বিপল্লী হত্যা মামলার চার্জশিট দেয়া হবে পুলিশ জানিয়েছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই হাদী হত্যার বিচার সম্পন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিনই হাদীকে গুলী করা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ ওরফে রাহুল ও মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখকে শনাক্ত করা হয়। তাৎক্ষণিক তাদের গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম সাভার, হেমায়েতপুর, আগারগাঁও, নরসিংদীতে অভিযান পরিচালনা করে। ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে ডিএমপির একটি টিম ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের সীমান্তবর্তী এলাকা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে। তিনি বলেন, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জব্দকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে হত্যাকা-ে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, ৫২ রাউন্ড গুলী, ম্যাগাজিন, ছোরা, মোটরসাইকেল, ভুয়া নম্বরপ্লেট, হাদীকে বহনকারী অটোরিকশা, ৫৩টি অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ২১৮ কোটি টাকার স্বাক্ষরিত চেক ইত্যাদি। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন, গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া জবানবন্দী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঘটনার পরপরই ফয়সাল ও আলমগীর ঢাকা থেকে সিএনজি করে আমিনবাজারে যায়। পরবর্তীতে সেখান থেকে মানিকগঞ্জের কালামপুর যায়। সেখান থেকে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাইভেটকারে করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছে। আসামীদের চিহ্নিত করার আগেই তারা সীমান্ত অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।

হালুয়াঘাটের আগে মুন ফিলিং স্টেশনে ফিলিপ এবং সঞ্জয় নামে দুই ব্যক্তি তাদের গ্রহণ করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ফিলিপ তাদের সীমান্ত পার করার পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যে পুত্তির নামে এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করে। পুত্তি ট্যাক্সি ড্রাইভার সামীর কাছে তাদের হস্তান্তর করে। সামী মেঘালয় রাজ্যের তুরা নামক জায়গায় তাদের পৌঁছে দেয়। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, আমরা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, তারা ইতোমধ্যে পুত্তি ও সামীকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বলেন, আমরা সন্দেহ করি আসামীরা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। এই ঘটনায় বিভিন্নভাবে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে গ্রেপ্তারদের মধ্যে ৬ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এছাড়া ৪ জন সাক্ষী ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৭-১০ দিনের মধ্যে আমরা চার্জশিট দিতে সক্ষম হবো। হাদীর হত্যাকারীরা পালিয়ে গেছে এটা কীভাবে নিশ্চিত হলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত যাদের গ্রেপ্তার করেছি, তাদের আমরা অভিযুক্তদের ছবি দেখিয়েছি। তাদের ভাষ্যমতে অভিযুক্তরা পালিয়ে গেছে।

এই হত্যাকা-ের নেপথ্যে কারা আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মূল আসামীকে গ্রেপ্তার করতে পারিনি। মূল আসামীকে গ্রেপ্তার করতে পারলে এর পেছনে কারা কারা কাজ করেছে সেটা আরও স্পষ্ট হতো। আমাদের কাছে কিছু তথ্য আছে, কিন্তু তদন্তের স্বার্থে আমরা সেই নামগুলো বলব না। আমাদের ধারণা, ৫ আগস্টের পরবর্তীতে হাদী খুবই ভোকাল ছিল, তার কথাবার্তা স্পষ্ট ছিল এবং একটি আদর্শকে ধারণ করে। এই আদর্শ বা ৫ আগস্টে যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা এই হত্যাকা-ের পেছনে থাকতে পারে। হত্যাকা-ের মোটিভ কী, জানতে চাইলে ডিবি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি। এটা রাজনৈতিক কারণে হতে পারে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করছি না। আসামীদের ফিরিয়ে আনতে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দী বিনিময় চুক্তি আছে। আমরা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দুইভাবেই তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই বিচার: এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই শহীদ হাদী হত্যার বিচার সম্পন্ন করা হবে। তিনি গতকাল রোববার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান। এ সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, হাদী হত্যা মামলা চলাকালীন এ যাবত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো- ঘটনার মূল হোতা ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা হুমায়ুন কবির, মা হাসি বেগম, স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু, গার্লফ্রেন্ড মারিয়া আক্তার লিমা, মো. কবির, নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, সিবিয়ন দিও, সঞ্জয় চিসিম, মো. আমিনুল ইসলাম রাজু ও মো. আব্দুল হান্নান। তিনি আরও বলেন, এ হত্যাকা-ের পেছনে কারা জড়িত রয়েছেথ তা উদঘাটনের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, সাক্ষীদের জবানবন্দী ও উদ্ধারকৃত আলামত পর্যালোচনা ও সার্বিক বিবেচনায় মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে (৭ জানুয়ারি ২০২৬) এ মামলার চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, শরিফ ওসমান হাদী হত্যাকা-ের মূল রহস্য উদঘাটন করা হবে। যারা ঘটনার পিছনে আছে তাদের সবার নাম ও ঠিকানা উন্মোচিত করে দেব। শনিবার রাতে রাজধানীর শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তথ্য ও সম্প্রচার; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ডিএমপি কমিশনার বলেন, হত্যাকা-ের তদন্ত চলছে। সরকার পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাবসহ সব গোয়েন্দা সংস্থাকে ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা উদঘাটনের দায়িত্ব দিয়েছে। ইতোমধ্যে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।