গোপনে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক বাড়ছে। কিছুদিন পরপরই মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ও নিহতের ঘটনা ঘটছে। কেউ পঙ্গু হচ্ছেন, আবার কেউ নিঃস্ব হচ্ছেন। সীমান্তবাসীর পাশাপাশি বেশি ঝুঁকিতে আছেন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা।

বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয়রা ঝুঁিকতে থাকেন। চলতি বচরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের ভিতরে মিয়ানমার সাইড বা সীমান্ত লাইন নাগালে মাইন বিস্ফোরণে একজন বিজিবি সদস্যসহ নিহত হয়েছেন দুই জন। আহত হয়েছেন-অন্তত ১৮ জন। এরমধ্যে ১৭ জন বাংলাদেশি ও ১ জন রোহিঙ্গা। সর্বশেষ গত ১২ অক্টোবর সকালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা একটি মাইন বিস্ফোরণের আহত বিজিবি সদস্য আক্তার হোসেন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মারা যান। এর আগে গত জুলাইয়ে বিস্ফোরণে প্রাণ হারান মোহাম্মদ জোবায়ের (১৯) এক তরুণ। বিস্ফোরণের ঘটনা বেশি ঘটেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায়। একজেনর কব্জি উড়ে গেছে। নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলার আশারতলী, সোনাইছড়ি, ঘুনধুমের বাইশফাঁড়ি, তুমব্রুসহ একাধিক এলাকায় গত বছরের ১৪টির মতো মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আর চলতি বছরে ঘটেছে ২০টিরও বেশি ঘটনা। এসবের মধ্যে বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে এলাকায়। মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটাতার ঘেঁষে পোঁতা হয়েছে অসংখ্য মাইন। জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলাকায় বাংলাদেশি বাসিন্দাদের চাষাবাদ এবং গবাদিপশুর চারণভূমি থাকায় প্রতিনিয়ত কৃষকরাই মাইন বিস্ফোরণে হচ্ছেন পঙ্গু, হারাচ্ছেন প্রাণ।

জানা গেছে, সীমান্তেবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি পুঁতে রেখেছে ভয়ঙ্কর ল্যান্ড মাইন। ফলে পুরো সীমান্তজুড়ে এখন বাংলাদেশি বাসিন্দাদের ল্যান্ড মাইন আতঙ্কে পার করতে হচ্ছে দিনরাত। স্থানীয় কৃষকরা চাষাবাদ, গবাদিপশু চারণসহ দৈনন্দিন কাজ করছেন আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। মাইন বিস্ফোরণে আহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই পঙ্গু হয়ে গেছেন। জীবিকা হারিয়ে অনেকেরই এখন দুর্বিষহ জীবন। চিকিৎসা ব্যয়সহ নানা খরচ সামাল দিতে হতাহতদের পরিবারও অনেকটা নিঃস্ব। মিয়ানমারে দেশটির সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলমান সংঘাতে ব্যাপক হারে প্রাণঘাতী ভূমিমাইন ও গোলাবারুদ ব্যবহার হচ্ছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা শুরু করে আরাকান আর্মি। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে রাজ্যটির বেশির ভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে। মূলত আরকান আর্মির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ অবস্থানে থাকা রোহিঙ্গাদের ঠেকাতেই মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা। যদিও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মতো আরাকান আর্মিও সীমান্ত এলাকায় মাইন পুঁতে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বান্দরবান ও কক্সবাজার অঞ্চলে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমানা রয়েছে ২৭১ কিলোমিটারের মতো। অভিযোগ উঠেছে, আরাকান আর্মিও বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ব্যাপক হারে মাইন পুঁতে রেখেছে, যাতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

সংশ্রিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভূমিমাইনে বিশ্বে যেসব দেশে হতাহতের ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মিয়ানমার। গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ব্যান ল্যান্ডমাইনসের (আইসিবিএল) ‘ল্যান্ডমাইন মনিটর ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভূমিমাইন ও বিস্ফোরক ধারণকারী গোলাবারুদের আঘাতে ২০২৩ সালে মিয়ানমারে এক হাজার তিনজন হতাহত হয়েছেন। একই সময়ে সিরিয়ায় হতাহত হয়েছেন ৯৩৩ জন। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তি হয়। ভূমিমাইন তৈরি, ব্যবহার ও মজুত নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই চুক্তিতে। তবে যেসব দেশ এই চুক্তিতে সই করেনি, মিয়ানমার তার মধ্যে একটি।

বিশেষ করে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের সময়ে স্থল মাইন বিস্ফোরণের খবর বেশি আসতে শুরু করে সীমান্ত থেকে। রাখাইন রাজ্য থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসার সময় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্থাপন করা অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন বিস্ফোরণে গত কয়েক বছর হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। গত ১৪ অক্টোবর আলীকদম সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন এক মিয়ানমারের নাগরিক। আহত হয়েছেন এক বাংলাদেশিও। বিজিবি জানিয়েছে, নিহত মেনথাং ম্রো (৪০) এবং আহত মাংছার ম্রো (৩০) ৫৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের পশ্চিম পাশে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে হটাও মগপাড়া এলাকায় জুম দেখার জন্য যাচ্ছিলেন। পথে মাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই মেনথাং ম্রো মারা যান। তিনি মিয়ানমারের নতুনপাড়ার বাসিন্দা। আহত মাংছার ম্রোর বাড়ি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নের গর্জনপাড়া এলাকায়। এর এক দিন আগে, ১৩ অক্টোবর নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে একজন বিজিবি সদস্য আহত হন। গুরুতর আহতবস্থায় তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। পাহাড়ে জুম চাষ করতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে পা হারানো মালাই তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, জুম কাটতে কাটতে পায়ের নিচে একটা মাইন পড়ে গেছে, আমি নিজেও বলতে পারিনা। হঠাৎ বিস্ফোরণে আমার পা উড়ে যায়। এরপর থেকে এক পায়ে ভর করে চলছি আমি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, সীমান্তের দুই পাশের বাসিন্দাদের অনেকেই নানা কাজকর্মে বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত অতিক্রম করেন। গাছ কাটা, গরু চরানো, কৃষিকাজ, মাছ ধরাসহ নানা কারণে মানুষ সীমান্ত পার হন। এ ছাড়া সীমান্তে পণ্য চোরাচালানের সঙ্গে অনেকেই যুক্ত রয়েছেন, যারা নিয়মিত সীমান্ত অতিক্রম করেন। এসব মানুষই মূলত সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে হতাহত হচ্ছেন। বর্তমানে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের বেশির ভাগ এলাকাতেই মাইন পোঁতা রয়েছে। তবে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সঙ্গে থাকা সীমান্তে মাইন স্থাপন করা হয়েছে বেশি। সামান্য অসতর্ক হলেই মাইনের ফাঁদে হতাহত হচ্ছেন মানুষ।

বিজিবি সদস্য নিহত: এদিকে দেশের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) এক সদস্য। কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) সদস্য নায়েক মো. আক্তার হোসেন গত শুক্রবার দুপুরে সিএমএইচ, ঢাকা-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। বিজিবি জানায়, গত ১২ অক্টোবর নায়েক আক্তার হোসেন কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ রেজুআমতলী বিওপি-তে অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওইদিন সকালে পেয়ারাবুনিয়া সীমান্ত এলাকায় টহলরত অবস্থায় মাইন বিস্ফোরণে তিনি গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত সিএমএইচ, রামু সেনানিবাসে নেওয়া হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পরদিন বিজিবি হেলিকপ্টারে করে সিএমএইচ, ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার সকালে তার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যায়। নায়েক আক্তার হোসেনের মৃত্যুতে পুরো বাহিনী জুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে বলে জানায় বিজিবি। এ বিষয়ে কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম (পিএসসি) বলেন, দেশের সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা এক সাহসী সহযোদ্ধাকে হারালাম। নায়েক আক্তার হোসেনের আত্মত্যাগ আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। বিজিবির এ কর্মকর্তা শোক প্রকাশ করে আরও বলেন, শহীদ নায়েক আক্তার হোসেন দেশের জন্য আত্মোৎসর্গের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

রোহিঙ্গা তরুণ নিহত : গত বছর ৮ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদের চরে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে এক রোহিঙ্গা তরুণের মৃত্যু হয়েছে। নাফ নদের জালিয়ারদিয়া-সংলগ্ন (পূর্ব পাশে) লালদিয়া নামে একটি চরে এ ঘটনা ঘটে। লালদিয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পাশে। নিহত তরুণের নাম মোহাম্মদ জোবায়ের (১৯)। তিনি টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ২৭ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল হামিদের ছেলে। এসময় মাইন বিস্ফোরণে আরও দুই রোহিঙ্গা আহত হয়। তারা হলেন-হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা ২৪ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা কামাল হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ শাহ আলম ওরফে জাবের এবং ২৭ নম্বর আশ্রয়শিবিরের আবদুর রহিমের ছেলে মো. আবদুস শুক্কুর। স্থানীয়রা জানান, শাহ আলম ও মো. আবদুস শুক্কুর হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া গ্রাম-সংলগ্ন নাফ নদের লালদিয়ার চরে কাঁকড়া শিকারের জন্য যান। বিকেল চারটার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে মাইন বিস্ফোরণ ঘটে। এতে জোবায়েরের ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে যায়। বাঁ পায়ের কিছু জায়গায় ক্ষতের সৃষ্টি হয়। অপর দুই রোহিঙ্গা শাহ আলম ও আবদুস শুক্কুরের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে।

বিজিবির কার্যক্রম : বিজিবি সূত্র জানায়, মাইন বিস্ফোরণে হতাহত প্রতিরোধে বিজিবি জনসচেতনতামূলক ও অন্যান্য কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এরমধ্যে রয়েছে, মাইন বিস্ফোরণে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান। মাইন্ বিস্ফোরণে আহতদের আর্থিক সহায়তা প্রদান। সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণ, অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম, মাদক ও চোরাচালান বিরোধী জনসচেতনতামূলক প্রচারণা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন। সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন গ্রামে অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম ও মাইন বিস্ফোরণ প্রতিরোধে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরীর কার্যক্রম করা। সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা। সীমান্ত এলাকায় অবৈধ সীমান্ত পারাপার, মাইন বিস্ফোরণ, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধী জনসচেতনতা মূলক পোস্টার/ব্যানার স্থাপন। এছাড়া দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, স্কুল কলেজের শিক্ষকদের সাথে সচেতনতামূলক বৈঠক ও সভার আয়োজন করা যাতে শিক্ষক ও ইমামদের মাধ্যমে মসজিদ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে অবৈধ সীমান্ত অতিক্রমের ভয়াবহতা, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধী জনসচেতনামূলক কার্যক্রমকে কার্যকর ভাবে ফলপ্রসূ করা যায়।