বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করার সিদ্ধান্তে, ওই সমাধিস্থল পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল ‎মঙ্গলবার বিকাল ৪টা ২০ মিনিটে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থল পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। ‎এ সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্য যেখানে কবর প্রস্তুত করা হচ্ছে, সে জায়গাটি ঘুরে দেখেন। তার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সমাধিস্থলে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সেখানকার ‎সবাইকে নিয়ে জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোন কথা বলেননি।

জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে খালেদা জিয়াকে দাফনের সিদ্ধান্ত জানান আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। গতকাল মঙ্গলবার যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভার পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনটির সামনে ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান তিনি।

উপদেষ্টা পরিষদের সভায় বিশেষ আমন্ত্রণে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অংশ নেন জানিয়ে আসিফ নজরুল গতকাল বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব আমাদের সভাকে অবহিত করেন যে, আজ বুধবার বাদ জোহর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা এবং এর সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভেনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। জানাযার পর তাকে শহীদ রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হবে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার, আজ বুধবার তার জানাযার দিনে এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। ৪০ দিন ধরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টায় মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আপোষহীন নেত্রী অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, আর বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুইবার।

জানাযা-দাফনে মোতায়েন থাকবেন ১০ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য

‎খালেদা জিয়ার জানাযা ও দাফন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হবে। তাই তার লাশবাহী গাড়ি এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা পর্যন্ত নেওয়া, জানাযা ও দাফন ঘিরে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার ১০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন থাকবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব তথ্য জানান।

শফিকুল আলম বলেন, খালেদা জিয়ার লাশবাহী গাড়িকে ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। ১০ হাজারের বেশি পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য থাকবেন। কিছু কিছু জায়গায় সেনাবাহিনীর সদস্যও থাকবেন।

প্রেস সচিব বলেন, খালেদা জিয়া তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। আপসহীন নেত্রী। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। দেশের জন্য তিনি যা করেছেন, এটা অতুলনীয়। এভারকেয়ার থেকে খালেদা জিয়ার লাশবাহী গাড়ি সংসদে ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আসা পর্যন্ত জানাযা এবং দাফন, সবকিছু পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হবে। তার জানাযা, দাফনসহ প্রতিটি অনুষ্ঠান সুচারুভাবে করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে সরকার। এ জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হবে।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খালেদা জিয়ার জানাযা, দাফন, সাধারণ জনগণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনসহ সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্বে করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সভা শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নিরাপত্তা টিমের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

সার্বিক কার্যক্রম ঘিরে কোনো ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা নেই জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ডিএমপির ১০ হাজারের বেশি পুলিশ, এপিবিএন এবং অন্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা থাকবেন। কিছু কিছু জায়গায় সেনাবাহিনীর তরফ থেকে একটা ব্যবস্থাপনা থাকবে।

নিরাপত্তার বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, পুলিশ, নিরাপত্তা সংস্থার তরফ থেকে প্রত্যেকটা বিষয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। কিছুদিন আগে একটি বড় জানাযা হয়েছে। ফলে পুলিশের এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিজেদের মধ্যে কিছু প্রস্তুতি আগে থেকেই ছিল, এখন আরও বড় আকারে প্রস্তুতি নেওয়া যাবে।

শফিকুল আলম বলেন, সকালে তার লাশবাহী গাড়ি এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে সংসদ ভবন এলাকায় নেওয়া হবে। নেওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা করা হবে। তবে কখন লাশ সংসদ ভবন এলাকায় নেওয়া হবে, তা পরে জানিয়ে দেওয়া হবে। রাষ্ট্রীয় সম্মানে তাকে নিয়ে আসা হবে।

প্রেস সচিব বলেন, খালেদা জিয়ার জানাযায় প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও কূটনীতিকেরা উপস্থিত থাকবেন। কিছুদিন আগে সংসদ ভবন এলাকায় বড় একটি জানাযা হয়েছে। খালেদা জিয়ার জানাযা আরও বড় আকারে হবে। সে আলোকে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তুতিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শামসুল ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী ছিলেন না, তিনি জাতীয় নেত্রী ছিলেন। বিএনপির দলীয় অবস্থান থেকে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে তাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। শামসুল ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়ার লাশ যখন এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা নেওয়া হবে, তখন রাস্তার দুপাশে জনসাধারণ ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাকে শ্রদ্ধা জানাবেন।