ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ওসমান হাদীকে প্রকাশ্যে গুলী করে হত্যার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। খুলনায় এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা বিভাগীয় প্রধান মোতালেব শিকদার দুর্বৃত্তদের গুলীতে গুরুতর আহত হন। এছাড়া গত বুধবার ঢাকায় মগবাজার এলাকায় ফ্লাইওভার থেকে ককটেল হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা করা হয়েছে।
হঠাৎ রাজধানীসহ বিভিন্নস্থানে এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বেড়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে। তফসিল ঘোষণার পরদিনই জুলাই বিপ্লবের নায়ক ওসমান হাদীকে গুলী করে হত্যা করায় মানুষের মাঝে শঙ্কা বেড়ে যায়। কেননা সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মাঝেই ঘটছে সন্ত্রাসী ঘটনা। আর হাদীর খুনিকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা যায়নি। এমনকি খুনির অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে পারেনি আইনপ্রয়োগকারি সংস্থাগুলো। ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার পর এর উন্নতি হচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অভিযানে গিয়ে পুলিশ হামলার শিকার হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই পরিস্থিতি তপ্ত হচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরাও চিন্তিত। এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি খোদা বক্স চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। হাদীর হত্যার ঘটনায় ব্যর্থতার দায় নিয়েই তাকে সরে যেতে হলো।
গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপাকে ফেলতে নানা চক্র মাঠে তৎপর রয়েছে।
বিশেষ করে পতিত কাযক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আইনশৃঙ্খলার অবনিত ঘটাতে গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা টার্গেট কিলিংও করতে পারে বলে তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। সম্প্রতি ঢাকায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পুলিশ পুরো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ডেভিল হান্টসহ বিভিন্ন সাঁড়াশি অভিযান চালানো হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, দস্যুতা, পাশবিক নির্যাতন, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, পুলিশের ওপর আক্রমণ, মাদক কেনাবেচা, চোরাচালান, চুরি প্রভৃতি অপরাধ বেড়েছে। তবে এসব ঘটনায় আসামী গ্রেপ্তার হচ্ছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় হত্যা মামলার ও দাগি অপরাধীদের গ্রেফতার করছে পুলিশ। আওয়ামী লীগ এবং ও অঙ্গ সংঠনের নেতাকর্মীদের।
জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে পুলিশের থানা, ফাঁড়ি থেকে বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ লুট হয়েছে। এখনো প্রায় হাজারখানেক আগ্নেয়াস্ত্র, ২ লাখের মতো গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি। আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের জন্য সরকার পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। তারপরও হিমশিম খাচ্ছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, বেহাত অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে আমরা ভয়ের মধ্যে আছি। সংসদ নির্বাচনও হুমকি বলে মনে হচ্ছে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে নানা অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, উত্তাপ ও উদ্বেগ ততই বেড়ে চলেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের বাসা থেকে লাইসেন্স করা অস্ত্র-গুলী লুট হয়েছে। অস্ত্রগুলো পেশাদার অপরাধীদের হাতে চলে গেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, পেশাদার পুলিশিং হচ্ছে না বলেই এমনটি হচ্ছে। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী পুলিশ সদস্যদের গাফিলতির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। তাদের মতে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে এ বাহিনীতে নিয়োগের সময় একেবারে বেছে বেছে আওয়ামীপন্থিদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর সেসব দলীয় পুলিশ সদস্যের ভয়ঙ্কর রূপ দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। এ কারণে পুলিশ বাহিনীর বর্তমান আইজিসহ পুলিশের একটি অংশ শত চেষ্টা করেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছেন না। মূলত তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে পুলিশের অনেক সদস্য কৌশলে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কেউ অফিশিয়ালি বিষয়টি স্বীকার না করলেও এটিই বাস্তবতা।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেও দেখা গেছে, সারা দেশে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। একইভাবে ঢাকায়ও বেড়েছে হত্যাকাণ্ড। তুলনামূলক বিচারে রাজধানীতে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে উদ্বেজনকভাবে বেশি। বিশেষ করে গত কয়েক দিনে কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হত্যাকাণ্ডের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অপরাধীরা অনেক বেশি তৎপর হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতারাও হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। পুলিশসদরদফর জানায়, চলতি বছরের ১১ মাসে বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৫০৫টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৪ হাজার ৫৭২টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৩ হাজার দুটি, মার্চে ১৬ হাজার ২৪০টি, এপ্রিলে ১৬ হাজার ৩৬৮টি, মে মাসে ১৬ হাজার ৪৫টি, জুনে ১৫ হাজার ১৬৭টি, জুলাইয়ে ১৫ হাজার ৩৮৯টি, আগস্টে ১৫ হাজার ৬৫৬টি, সেপ্টেম্বরে ১৫ হাজার ৪৩১টি, অক্টোবরে ১৬ হাজার ১৭০টি এবং নভেম্বরে ১৪ হাজার ৪৬৫টি মামলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২৯৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০ জন, মার্চে ৩১৬ জন, এপ্রিলে ৩৩৬ জন, মে মাসে ৩৪১ জন, জুনে ৩৪৪ জন, জুলাইয়ে ৩৬২ জন, আগস্টে ৩২১ জন, সেপ্টেম্বরে ২৯৭ জন, অক্টোবরে ৩১৯ জন এবং নভেম্বরে ২৭৯ জন খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। অর্থাৎ ১১ মাসে তিন হাজার ৫০৯টি হত্যা মামলা হয়েছে।
আলোচিত ঘটনা : গত ২৩ ডিসেম্বর নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় চর দখলকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তারের বিরোধে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলীর ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন। উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড-সংলগ্ন জাগলার চরে এ ঘটনা ঘটে। ৭ অক্টোবর রাতে খুলনা শহরের ২ নম্বর কাস্টমঘাট এলাকায় ইমরান মুন্সি নামের এক ব্যবসায়ীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৫ অক্টোবর রাতে কক্সবাজারের ঝিলংজা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী দুর্বৃত্তের গুলীতে গুরুতর আহত হন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশায় নিজ বাড়িতে গুলীবিদ্ধ হন তানভীর হাসান শুভ নামে এক তরুণ। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে রাজীব চৌধুরী নামের এক ঠিকাদারকে গুলী করে সন্ত্রাসীরা। ১৬ সেপ্টেম্বর খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব শেখ আবু হোসেন বাবুর বাড়িতে গুলী ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহজাহানপুরের ঝিলপাড় এলাকায় সন্ত্রাসীদের দুই গ্রুপের সংঘাতে দুজন গুলীবিদ্ধ হন। ১০ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের কালারমারছড়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলীতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। ৫ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জ সদরের মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে বিএনপির দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে আটজন গুলীবিদ্ধ হন। ২২ বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার পর ১৩ আগস্ট হত্যা করা হয় চরমপন্থি নেতা শাহাদাত হোসেনকে; ক্ষুব্ধ হয়ে তার পরিবার মামলাই করেনি। ১১ জুলাই মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়ায় নিজ বাড়ির সামনে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে গুলী ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়। গত ৪ অক্টোবর নরসিংদী পৌর এলাকার আরশিনগরে চাঁদাবাজির বিরোধিতা করায় অতিরিক্ত সহকারী এসপি শামিম আনোয়ার সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন। ৪ অক্টোবর বগুড়ার শিবগঞ্জে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ আওয়ামী লীগ নেতা রেজ্জাকুল ইসলামকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তার সমর্থকরা। ৭ অক্টোবর ফেনীর সোনাগাজীতে পরোয়ানাভুক্ত দুই আসামীকে ধরতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয় একটি ওয়াকিটকি ও একটি শটগান; আহত হন ছয় পুলিশ সদস্য। গত ২৯ সেপ্টেম্বর নরসিংদীতে আধিপত্য বিস্তার, বালু উত্তোলন ও দখলদারিত্ব নিয়ে যুবদলের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাদেক মিয়াকে গুলী করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আরও আহত হন তিনজন। ১৭ সেপ্টেম্বর ভোরে একই এলাকায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে বিএনপির কর্মী ইদন মিয়া নিহত হন। পরদিন ফেরদৌসী বেগম নামে এক নারী গুলীবিদ্ধ হয়ে মারা যান।