ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালাম ব্যাপারী পদত্যাগ করেছেন। গতকাল রোববার দুপুরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব দফতরে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। এরপর এটি গৃহীত হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দৈনিক সংগ্রামকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে, পদত্যাগী এমডি আব্দুস সালাম গতকাল দুপুরে এ প্রতিবেদককে বলেন, মন্ত্রনালয়ে গুরত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে তিনি ওয়াসা বোর্ডের কাছে তাঁর পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছেন। এটি এখন প্রক্রিয়া অনুসারে মন্ত্রনালয় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যাবে। এরপর রাষ্ট্রপতি সেটাকে অনুমোদন দেবেন। এরপর পদত্যাগ পত্র কার্যকর হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে আব্দুস সালামকে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে তিনি ছিলেন একই সংস্থার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। এ পদে চাকরিকালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।

৩ মার্চ আব্দুস সালাম ব্যাপারী পরিবারের কানাডায় বাড়ি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল প্রথম সারির একটি দৈনিক। কানাডার বেগমপাড়ায় ঢাকা ওয়াসার এমডির স্ত্রীর নামে বাড়ি, শিরোনামে ওই দৈনিকটি অনুসন্ধান প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তাঁকে নিষেধ করা হয়। এ জন্য ঢাকা ওয়াসারই একটি অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপস্থিত থাকলেও সেখানে যেতে পারেননি তিনি।

এদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। আর দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধেও তদন্ত করছে। এজন্য তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে।

১৯৯১ সালে ঢাকা ওয়াসায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন আব্দুস সালাম ব্যাপারী। ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, চাকরিজীবনে বিভিন্ন পদে তিনি আড়াই কোটি টাকার মতো বেতন-ভাতা পেয়েছেন।

বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে সিআইডি : ঢাকা ওয়াসার সদ্য পদত্যাগী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুস সালাম ব্যাপারীর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান

গতকাল এ তথ্য জানান।

অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে সিআইডি সুত্রে জানানো হয়, মো. আব্দুস সালাম ব্যাপারী ১৯৯১ সালে ঢাকা ওয়াসায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্জিত অর্থ অবৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার করে তিনি নিজ, তার স্ত্রী এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০১৮ সালে তিনি নিজের নাম এবং তার স্ত্রী মাহবুবুন্নেছার নামে কানাডার টরন্টো শহরে একটি বাড়ি ক্রয় করেন। স্থানীয় ভূমি নিবন্ধন অফিস সূত্রে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ক্রয়কৃত ওই বাড়িটির বর্তমান মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ কোটি টাকা। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও কানাডার টরন্টোতে তার পরিবারের নামে বাড়ি থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯ অনুসারে অনুসন্ধানপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সিআইডি অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে।

দুর্নীতির অনুসন্ধানে দুদক : আব্দুস সালাম ব্যাপারীর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের উপপরিচালক মো. আহসানুল কবীর পলাশ এই অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন।

এমডি নিয়োগেও যত বিতর্ক : বিতর্ক, শর্ত বদল ও অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষা করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারীকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ দেয় সরকার। গত বছরের ১১ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে তিন বছরের জন্য এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুদিন পর ১৩ নবেম্বর বৃহস্পতিবার বিষয়টি জানাজানি হয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ অনুবিভাগ থেকে জারি করা ওই আদেশে বলা হয়েছে, যোগদানের তারিখ থেকে আগামী তিন বছরের জন্য আবদুস সালামকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ প্রদান করা হলো। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে অবিলম্বে জারিকৃত এ আদেশ কার্যকর হবে।

অথচ সেদিন (১১ নভেম্বর) এই আদেশ জারির আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের পাস-২ শাখা থেকে আরেকটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব প্রদান করা হলো।

আবদুস সালামকে নিয়োগের এ সিদ্ধান্তে ওয়াসার ভেতরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়। পুরো প্রক্রিয়াই ছিল পরিকল্পিত। একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বসানোর জন্য আট মাস ধরে ধাপে ধাপে নিয়ম ভেঙে পথ তৈরি করা হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় গত বছরের ২১ মার্চ। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিজ্ঞ প্রার্থীদের জন্য বয়সসীমা শিথিলযোগ্য হবে, অর্থাৎ ৬০ বছরের বেশি বয়স হলেও আবেদন করা যাবে। পাশাপাশি আবেদনকারীদের ন্যূনতম তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা হতে হবে। কিন্তু সেই সময় আবদুস সালাম ছিলেন চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা, অর্থাৎ তিনি আবেদন করার যোগ্য ছিলেন না।

মাত্র তিন দিনের মাথায় ২৩ মার্চ ওয়াসা আবার নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে বয়সসীমা শিথিলের বিধান বাদ দিয়ে বলা হয়, আবেদনকারীর বয়স ৬০ বছরের বেশি হলে আবেদন করা যাবে না। ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্য, এই পরিবর্তন আনা হয় একমাত্র আবদুস সালামকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। কারণ, বয়স শিথিলযোগ্য থাকলে তাঁর চেয়ে যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রার্থী অনেকেই আবেদন করতেন।