# বিশেষায়িত মেডিকেল টিম গঠন

# গুলী করা অস্ত্রের ম্যাগাজিন উদ্ধার

# উপকারের কথা বলে হাদীর অফিসে নিয়ে যায় ফয়সাল : আদালতে কবির

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) পদপ্রার্থী গুলীবিদ্ধ শরিফ ওসমান হাদী বর্তমানে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার সুচিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে একটি বিশেষায়িত মেডিকেল টিম গঠন করেছে। এই টিম গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তার স্বাস্থ্যগত পরীক্ষার সব রিপোর্ট পর্যালোচনা করেছে। এর আগে ওসমান হাদীকে বাংলাদেশ সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে, হাদীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী কবিরকে ৭ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিবুজ্জামান। এর আগে সোমবার তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। আদালতে শুনানির সময় হাদীর উপর হামলা হওয়ার কিছু দিন আগে ইনকিলাব মঞ্চের কার্যালয়ে যাওয়ার কথা আদালতকে বলেছেন প্রধান আসামী ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী কবির।

জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদীকে গুলী করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুলীটি লাগে হাদীর মাথায়। গুরুতর আহত হাদীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার দুপুরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদীকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।

সিঙ্গাপুর জেনারেল হসপিটালে (এসজিএইচ) চিকিৎসাধীন হাদীর শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন এবং অপরিবর্তিত রয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষায়, তিনি এখনো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। দেশটি নিউরোসার্জনদের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী হাদীর ব্রেনের ইস্কেমিক পরিবর্তন ও ইডেমা কমেনি; ফলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট টাইম উইন্ডোকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে। সিঙ্গাপুরে হাদীর চিকিৎসা পরিস্থিতি নিয়ে হাসপাতালটির চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরো সার্জন ও হাদীর চিকিৎসায় যুক্ত ডা. আব্দুল আহাদ।

এদিকে হাদীর ভাই ওমর সিঙ্গাপুর থেকে জানিয়েছেন ব্রেইন ছাড়া হাদীর বাকি অর্গানগুলো কাজ করছে। গতকাল বাংলাদেশ সময় দুপুর আড়াইটায় হাদীর সাথে সিঙ্গাপুরে থাকা তার বড় ভাই ওমর চিকিৎসকদের বরাতে এ তথ্য জানান। ওমর জানান, হাদীর ব্রেইনের ভিতরে বুলেটের টুকরো আটকে আছে, অপারেশন করতে হবে, তবে তার স্বাস্থ্য বর্তমানে অপারেশনের উপযুক্ত নয়। এ জাতীয় অপারেশনের জন্য যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সেরা। তবে সিঙ্গাপুর থেকে লন্ডনে নেয়ার মতো তার শারীরিক অবস্থা বর্তমানে নেই।

ডা. আব্দুল আহাদ আরও জানান, হাদীকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হসপিটালের ইমার্জেন্সি কমপ্লেক্সে ভর্তির পর থেকেই নিউরোসার্জারি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার টিম যৌথভাবে তার চিকিৎসা শুরু করে। নেওয়ার পর করা ব্রেনের সিটি স্ক্যানে হাদীর বাম পাশের ইস্কেমিক পরিবর্তন অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি ব্রেনে ফোলা বা ইডেমা এখনো বিদ্যমান। ব্রেন স্টেমে আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকুলার সিস্টেমেও চাপ তৈরি হয়েছে, যা চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাদীর চিকিৎসকদের বরাতে ডা. আব্দুল আহাদ জানান, বর্তমানে হাদীর কিডনি, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস কৃত্রিম ভেন্টিলেশনের সহায়তায় সচল রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার জিসিএস স্কোরে এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। অর্থাৎ নিউরোলজিক্যাল রেসপন্সে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি বা অবনতি, কোনোটিই লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

চিকিৎসকদের মতে, এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। ব্রেন ইনজুরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি সময়সীমা বা টাইম উইন্ডো থাকে, যার মধ্যে যদি শরীর ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে পরবর্তী অবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই সময়সীমার মধ্যেই হাদীর শরীর কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কি না, সেদিকেই এখন চিকিৎসকদের নজর।

ডা. আহাদ আরও জানান, হাদীর ফুসফুসের সর্বশেষ সিটি স্ক্যানে আগের মতোই রক্তের উপস্থিতি দেখা গেছে। এ কারণেই বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তাঁর বুকে চেস্ট ড্রেন দেওয়া হয়েছিল। সিঙ্গাপুরেও সেই জটিলতা মাথায় রেখেই শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থাপনা চলমান রয়েছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবিকে নাকচ করেছেন চিকিৎসকরা। ডা. আহাদ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, হাদী চোখ খুলেছেন বা অবস্থার উন্নতি হয়েছে, এ ধরনের কোনো তথ্য সত্য নয়। তার অবস্থা এখনো স্ট্যাটিক, অর্থাৎ আগের জায়গাতেই রয়েছে। জ্ঞান ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে চিকিৎসকরা এখনই কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাস দিতে পারছেন না।

তবে চিকিৎসকরা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেক সময় অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে। সে আশাতেই সর্বোচ্চ চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসকদের পাশাপাশি হাদীর পরিবার ও সহকর্মীরাও দেশবাসীর কাছে দোয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে গুজব বা অনুমানভিত্তিক তথ্য না ছড়িয়ে দায়িত্বশীল থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।

ফয়সালের সহযোগী কবির ৭ দিনের রিমান্ডে

হাদীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী কবিরকে ৭ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিবুজ্জামান।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান জানান, কবিরকে ১০ দিনের রিমান্ডে পেতে আবেদন করেন ডিবি পুলিশের মতিঝিল জোনাল টিমের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ। শুনানি নিয়ে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। সোমবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে কবিরকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

সেদিনই ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু ও বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমাকে ৫ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। এর আগে রোববার হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল মালিক আব্দুল হান্নানের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।

হাদীকে গুলী করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পরিবারের সম্মতি নিয়ে রোববার রাতে পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেছেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের।

উপকারের কথা বলে হাদীর অফিসে নিয়ে যায় ফয়সাল

শরীফ ওসমান বিন হাদীর উপর হামলা হওয়ার কিছু দিন আগে ইনকিলাব মঞ্চের কার্যালয়ে যাওয়ার কথা আদালতকে বলেছেন প্রধান আসামী ফয়সাল করিম মাসুদের সহযোগী কবির। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুজ্জামানের আদালতে রিমান্ড শুনানিতে তিনি এ কথা বলেন। প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই রুকনুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

কবিরের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন। তার কিছু বলার আছে কি না জানতে চায় আদালত। পরে কবির আদালতকে বলেন, আমি উবার অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি চালাতাম। মাঝেমধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদ আমাকে ফোন দিতেন। ধারে-কাছে থাকলে যেতাম। আমাকে গুলশানসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত। ১৮-২০ দিন আগে ফোন করে হাদীর অফিসে নিয়ে যেতে চায়। বলে, গেলে উপকার হবে। পরে হাদীর অফিসে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, মোটরসাইকেলটি আমার বন্ধু মাউনুদ্দিন ইসলাম শুভ কিনেছে। আমরা দুইজনই একই দিনে গাড়ি কিনতে যাই। ও আমার আইডি কার্ড দিয়ে গাড়ি কেনে। মোটরসাইকেলের সবকিছু ওর নামে, শুধু আমার আইডি কার্ড ব্যবহার করেছে। গাড়ি কেনার সময় ছিলাম। মেলা দিন আগে গাড়িটা কিনেছি।

গুলী করা অস্ত্রের ম্যাগাজিন উদ্ধার

হাদীকে গুলী করা অস্ত্রের গুলীসহ ম্যাগাজিন উদ্ধার করেছে র‌্যাব। গতকাল বিষয়টি নিশ্চিত করে র‌্যাব জানায়, এ ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সালের বোনের বাসার পাশের একটি জায়গা থেকে ম্যাগাজিনটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা আলামতটি ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে বাহিনী।

জানা গেছে, হাদিকে গুলী করে পালিয়ে যাওয়া দুই সন্দেহভাজন ফয়সাল ও আলমগীর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ভুটিয়াপাড়া সীমান্ত দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালিয়ে গেছে। তবে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।