নতুন সরকার গঠনের পর আলোচনায় এসেছে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রদবদল। বিশেষ করে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত প্রশাসন ও পুলিশের বিভিন্নস্থানে রদবদল হয়। এবারও তাই হতে যাচ্ছে। প্রশাসনের বড় একটা অংশ রয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত। দ্রুত তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে কেউ কেউ নিজের চেয়ার রক্ষার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগে শুরু করেছেন। অনেক স্থানে লবিংয়ের মাত্রা তীব্র হচ্ছে।
সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনের দুটি শীর্ষ পদের দুজন কর্মকর্তা নিজে থেকে সরে গেছেন। একজন হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ, অন্যজন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া। সোমবার চুক্তিতে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে প্রশাসনে আরও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু সচিব, মাঠ প্রশাসনের জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পদে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে চুক্তিতে থাকা কয়েকজন সচিবের জায়গায় নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এখন গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন, এমন বেশ কিছু কর্মকর্তাকে বদলি করা হতে পারে। ইতিমধ্যে এসব নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বদলি হতে পারেন, এমন প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। একইভাবে পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি দপ্তরেও পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। এসব নিয়ে এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ পদ পেতেও তৎপর।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জনপ্রশাসনে নতুন সরকার এসে পরিবর্তন আনবেন, এটা অস্বাভাবিক নয়। তবে তাঁরা আশা করেন বিএনপির নতুন সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো দলীয়করণ করবে না এবং তা করতে গিয়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দেবে না। নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জনপ্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষ কর্মকর্তা থাকা দরকার।
সূত্র জানায়, ৃবিএনপির ইশতেহারেও এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি আছে। বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে দলীয়করণ বিষয়েও বলেন। তিনি বলেন, দলীয়করণ বন্ধ করা দরকার। অতীতে যখন যে দল আসে, তখন প্রশাসন, পুলিশ, রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সংস্থাসহ সব জায়গায় নিজেদের লোক বসিয়ে দিতে দেখা যেত। মানুষ এটা আর দেখতে চায় না। এরই মধ্যে সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের তৎপরতাও বেড়েছে। তাঁদের পক্ষ থেকে সচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেতে দাবি ও একধরনের চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ওই বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। এরপর প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়। প্রথম ছয় মাসেই সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে ১৪ জন, গ্রেড-১ পদের ১ জন ও অতিরিক্ত সচিব পদের ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদের ২৩ জন, গ্রেড-১ পদের ২ জন ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এরপরও আরও বেশ কিছুসংখ্যক কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। অন্যদিকে সচিবসহ বেশ কিছু পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, বর্তমানে শুধু সচিব ও সমপর্যায়ের পদে অন্তত ১৬ কর্মকর্তা চুক্তিতে আছেন।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ আইনজীবীকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। নতুন নিয়োগ পাওয়া পাঁচ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হলেন মো. আবদুস সামাদ, মলয় কুমার রায়, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. ইছা ও মো. ওবায়দুর রহমান (তারেক)। এই পাঁচজনের মধ্যে মো. ইছা ও মো. ওবায়দুর রহমান সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ৯৮ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রয়েছেন। পাঁচজনের যোগদানের মধ্য দিয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের সংখ্যা দাঁড়াবে ১০৩।
এদিকে নির্বাচনের পর প্রথম কর্মদিবস গত রোববার প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন নেতা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখা করে ‘বঞ্চিত কর্মকর্তাদের’ পদায়ন-পদোন্নতির জন্য দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও অতিরিক্ত সচিব বাবুল মিঞা বলেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিগত সময়ে যেসব কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছিলেন, তাঁদের পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য জনপ্রশাসন সচিবকে অনুরোধ করেছেন তাঁরা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তাদের পদায়নের সময় যেন সৎ, যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখা হয়। জনপ্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন নেওয়া হয়। রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত তাদের অনুগত কর্মকর্তা নিয়োগের চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) একজন কর্মকর্তা বলেন, নতুন সরকার আসার পর প্রশাসনে রদবদল স্বাভাবিক, সারা বিশ্বেই সেটা হয়। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা, সততা ইত্যাদি বিবেচনায় থাকা দরকার। নইলে নতুন সরকার সফল হতে কর্মী বাহিনী পাবে না। তিনি বলেন, নতুন সরকারকে পেশাদার কর্মকর্তা খুঁজে বের করতে হবে। পেশাদার কর্মকর্তারা দলের প্রতি অনুগত নন, সরকারের প্রতি অনুগত থাকেন।