জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অবজ্ঞা করে কোনো বক্তব্য দেওয়া ধৃষ্টতা বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন ছিল জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম। এটা অবজ্ঞা করে কোনো বক্তব্য দেওয়া ধৃষ্টতা। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না।

গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এ মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার শুনানির সময় তিনি এসব কথা বলেন। এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য আগামী ১২ জানুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন নির্ধারণ করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এদিন সালমান ও আনিসুলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। শুনানিতে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ গঠন না করার প্রার্থনা করেন। একইসঙ্গে তাদের অব্যাহতি চান। তবে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য ১২ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিনই জানা যাবে তাদের বিচার শুরু হবে কি না।

গতকাল সকাল ১০টার পর কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তায় প্রিজনভ্যানে করে সালমান-আনিসুলকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ।

সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে রয়েছে কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি-প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র। তাদের ধারাবাহিক এসব কর্মকাণ্ডে মিরপুর-১, ২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু ছাত্র-জনতা। কিন্তু নির্যাতন বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি তারা।

সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের পক্ষে শুনানিতে আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। শুনানিতে জনগণের জানমাল রক্ষায় জুলাইয়ে কারফিউ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় তার এমন কথার আপত্তি জানায় প্রসিকিউশন।

এ বিষয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় কারফিউ দেননি তারা। কারণ আন্দোলনকারীরা ছিলেন নিরস্ত্র মুক্তিকামী। ন্যায্য দাবির জন্য আন্দোলন করেছিলেন তারা। এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। কারণ জুলাই চার্টার, জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের মাধ্যমে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনটি জাতির মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে বিবেচিত। এই সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন বলার ধৃষ্টতা যেন কেউ না দেখায়। এটা মাথায় নিয়ে তাদের (আসামিপক্ষ) আর্গুমেন্ট করতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের মুক্তির সংগ্রামকে দমন করতে কারফিউ দেওয়া হয়েছিল। এটি কোনো আইনসম্মত ছিল না। এটি ছিল গণহত্যাকে ফ্যাসিলিটেট করার একটি নির্দেশ বা পরিকল্পনা। কেননা নিরস্ত্র মানুষকে পাখির মতো মারা হয়েছে। শিশুদের মারা হয়েছে। পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসবই প্রমাণ করে কারফিউ কোনো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ছিল না। কারফিউ ছিল গণহত্যা চালানোর জন্য।

তাজুল ইসলাম বলেন, এ মামলায় উল্লেখযোগ্য প্রমাণাদির মধ্যে একটি হলো আসামিদের পরস্পরের মধ্যে টেলিফোনে শলাপরামর্শ করা। আন্দোলন দমনে তারা একে-অপরের সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করেছেন। সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনাও দিয়েছেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় টেলিফোনে কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। এনটিএমসি থেকে তাদের ফোনালাপের রেকর্ড আমরা উদ্ধার করি। আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়াই বিরোধী দলকে দমনের উদ্দেশে সারভাইলেন্সের (নজরদারি) কাজ করতো রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান। অথচ অন্যের জন্য করে রাখা গর্তে নিজেরাই পতিত হয়েছেন। দুই কাঁধে দুই ফেরেশতা যেমন মানুষের আমলনামা লিখে রাখেন, এনটিএমসিও এই অপরাধীদের আমলনামা লিখে রেখেছিল। যা তারা বুঝতেই পারেননি।