নির্বাচন ডাকাতি যাতে আর কখনো না ঘটতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন গ্রহণের পর তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে নিজেদের মনের মতো একটা কাগজে রায় লিখে দিয়েছে-এগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। পুরো রেকর্ড থাকা দরকার। তিনি আরো বলেন, দেশের টাকা খরচ করে, মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ দেশের মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল। কিছু করতে পারেনি। ড. ইউনূস বলেন, এ দেশের জনগণ যেন কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়, সেজন্য যারা যারা জড়িত ছিল তাদের চেহারাগুলো সামনে নিয়ে আসতে হবে। কারা করল, কীভাবে করলÑসেটা জানতে হবে। নির্বাচন ডাকাতি আর কখনো না ঘটতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
জমাকৃত তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবিশষ্ট ১৪৭টিতে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৮০% কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোন কোন কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০% এর বেশি হয়ে যায়।
২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না দেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়। তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয় যা নির্বাচন সেল নামে পরিচিত লাভ করে।
তিনটি সংসদ নির্বাচনের অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি যুক্ত থাকায় এবং তদন্ত কমিশনের জন্য বরাদ্দক...ত সময় অপ্রতুল হওয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে এদের নাম ও কার কী ভূমিকা ছিল তা বের করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাবিত আইন প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা অংশে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতার একটি ব্যবস্থা থাকা জরুরী-যাতে কমিশন স্বেচ্ছাচারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে না পারে। এজন্য একটি স্থায়ী নির্বাচন তদন্ত কমিশন গঠন করা যেতে পারে। তবে এ ধরণের কমিশন গঠনে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার মাত্রা যাতে কোনভাবেই খর্ব না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। সংবিধান ও আইনে আলাদা সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন করে সীমানা নির্ধারণের পুরো ক্ষমতা সেখানে দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন শুধু প্রশাসনিক সমন্বয় করবে।
২০০৮ সাল থেকে সীমানা নির্ধারণে সিইজিআইএসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিইজিআইএসকে ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনেক আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনে। ভবিষ্যতে সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সুপারিশকৃত এতদসংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সিইজিআইএসকে সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম থেকে বিরত রাখতে হবে।
প্রতি আসনে ভোটার সংখ্যা জাতীয় গড়ের কতশতাংশ বেশি-কম হতে পারবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট আইনি বিধান থাকতে হবে। সাধারাণত তা ১০-১৫% এর মধ্যে থাকা উচিত। কোন পরিস্থিতিতে এর ব্যতিক্রম করা যাবে এবং প্রতি পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় মোট কত শতাংশ আসনের সীমানা বদলানো যাবে (যেমন ৫-১০% এর বেশি নয়) তা নির্ধারণ করে দিতে হবে।
রাজনৈতিক দল নিবন্ধন
রিপোর্টে বলা হয় ২০১৪ সালে নিবন্ধন করা দল - বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট এবং ২০১৭ সালে নিবন্ধন করা দল বিএসপি এবং বিএনএমের নিবন্ধন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুনর্যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮ এ ‘কার্যকারিতা’র সংজ্ঞা অর্šÍভুক্ত করতে হবে, ৭ (৫) বিধি সংশোধন করে ১৫ দিনের মধ্যে কার্যকারিতা প্রমাণের সুযোগ বাতিল করতে হবে এবং ১০% তথ্য নিয়ে যাচাইয়ের পদ্ধতি বাতিল করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান অনুযায়ী তথ্য যাচাইয়ে বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। বিধিমালা সংশোধন করে কেন্দ্রীয় দপ্তর, জেলা ও উপজেলা দপ্তরের মানদণ্ড নিরূপণ করতে হবে। বিধিমালায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলে সুনির্দিষ্ট ও সুষ্পষ্ট মানদণ্ড সংযুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন কার্যক্রমে সকল গোয়েন্দা সংস্থাকে দূরে রাখতে আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। আদালতের হস্তক্ষেপে নিবন্ধন বন্ধ করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পর পর দলের নিবন্ধন নবায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্বাচনের সকল কার্যক্রমে সকল গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা বন্ধ করতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশন যদি নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোন কাজে তাদের সহায়তা গ্রহণ প্রয়োজনীয় মনে করে, তা হলে তা নিতে পারবে এধরনের বিধান প্রণয়ন করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রদত্ত বৈধ কার্ডধারী সাংবাদিক সরাসরি ভোটকেন্দ্রে কারো অনুমতি না নিয়েই প্রবেশ করতে পারবেন, অর্থাৎ নতুন করে কারো কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে না। কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহ, ছবি তোলা এবং ভিডিও ধারণ করতে পারবেন, তবে কোনোক্রমমেই গোপন কক্ষের ভেতরের ছবি ধারণ করতে পারবেন না।
জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের দৃষ্টিতে, বর্তমান কাঠামোতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও ইনকোয়ারি কমিটিকে নির্বাচন-ব্যবস্থার “গণতান্ত্রিক সুরক্ষা-বলয়” হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে তাদের ক্ষমতা খর্বিত, অর্থবহ ভূমিকা সীমিত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে জিম্মি। জেলা ও দায়রা জজ এবং অন্যান্য বিচারিক কর্মকর্তাদের নির্বাচনকালীন আর্থিক দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা দরকার। তাদের মাধ্যমে যে কোনো বরাদ্দ কেবল ব্যাংকিং চ্যানেলে, প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব নম্বর ব্যবহারের মাধ্যমে এবং ডিজিটাল অডিট-ট্রেইল রেখে বিতরণ করতে হবে। নগদ অর্থ ব্যবস্থার অবসান না ঘটালে নির্বাচনি তহবিলের দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ম্যাজিস্ট্রেটদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, তার বিষয়ে আরও তদন্ত করা উচিত এবং ওই প্রশিক্ষণের জন্য যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তাদের শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ডিজিএফআই, এনএসআই সহ সকল গোয়েন্দা সংস্থার কাজে স্বচ্ছতা আনা জরুরি যাতে ভবিষ্যতে এসব সংস্থা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হতে পারে। ডিজিএফআই এবং এনএসআই এ নিয়োগ, পদোন্নতি এবং পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। বেসামরিক প্রশাসনে ডিজিএফআই এবং এনএসআই এর অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
রিপোর্টে বলা হয় কারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের স্বার্থে ভবিষ্যতে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্ত করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোর অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এস সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশন প্রধান, বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সাবেক বিচারক, হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, সদস্য কাজী মাহফুজুল হক, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন, জেলা ও ড. মোঃ আব্দুল আলীম।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মীকে জাপানে নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে চায়। রোববার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাপানের সাবেক ফার্স্ট লেডি আকিয়ে আবে ও জাপানি উদ্যোক্তাদের একটি প্রতিনিধি দল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এই আহ্বান জানান।
সাক্ষাতে আকিয়ে আবে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অধ্যাপক ইউনূসের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বৈঠকে বিনিয়োগ, সামুদ্রিক গবেষণা এবং জাপানে পরিচর্যাকারী ও নার্স নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জাপানে এসব পেশায় জনবলের চাহিদা বাড়ছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
সামুদ্রিক দূষণ রোধে সহযোগিতার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন আকিয়ে আবে। তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে যেন আবর্জনা না ফেলা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই। ভবিষ্যতে এ নিয়ে কিছু করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।’ একই সঙ্গে তিনি সমুদ্র দূষণের ক্ষতিকর দিক নিয়ে জনগণকে সচেতন করতে বড় পরিসরে প্রচারণার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।