নির্বাচনের পরও হলে থাকিস’ বলে হামলা করেছে ছাত্রদল অভিযোগ শিবিরের

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার গভীর রাতে এ সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় লতিফ ছাত্রবাাসে। দেশীয় অস্ত্রসশস্ত্র নিয়ে ছাত্রাবাসের ভেতরে ঢুকে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালানো হয়। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও রামদা নিয়ে পরিচালিত এ হামলায় একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এসময় নির্বাচনের পরে তোরা এখনও হলে থাকিস বলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ করছে ছাত্রশিবির। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এ প্রতিবাদ জানান।

পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে ইমরান হোসেন (২১), মারুফ মিয়া (২০), নুরুল হক (২২), আতিকুর রহমান (২২), আরিফুল ইসলাম (২২), গোলাম ওহিদ (২৩), আলামিন (২২), সরোয়ার (২৩) ও নাঈম (২১) রয়েছেন। তারা সবাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, ভোররাতে আহত কয়েকজন শিক্ষার্থী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রাবাসে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার জেরে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংশ্লিষ্টরা হস্তক্ষেপ করেন। আহতদের খোঁজ নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম হাসপাতালে যান বলে জানা গেছে। স্থানীয় একাধিক সুত্র জানায়, সোমবার দিবাগত রাত একটার দিকে এ সংঘর্ষ হয়। তাদের মধ্যে চারজনের আঘাত গুরুতর বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পরস্পরকে দোষারোপ করছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে তা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। একপর্যায়ে দেশি অস্ত্র নিয়ে লতিফ ছাত্রাবাসের কক্ষে ঢুকে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষের জেরে রাতভর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যরাতে লতিফ ছাত্রাবাসে ছাত্রদের মধ্যে মারামারির খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ ঘটনায় চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজনের আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের সবাপতি ও সেক্রাটরি এক বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনের পর থেকেই সারাদেশে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ধর্ষণ, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, হাটবাজার দখল, চাঁদাবাজি ও মব সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়েছে তারা। একদিকে সারা দেশে চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ ও অব্যাহত জননিপীড়নে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ ও বিপর্যস্ত অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে পুনরায় ছাত্রলীগীয় কায়দায় বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে এসে সশস্ত্র হামলা ও হল দখলের নোংরা মহড়া চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে প্রশাসন বরাবরের মতোই নিস্পৃহ ও আজ্ঞাবহ দাসের ভূমিকা পালন করছে বলেও মন্তব্য করেন তারা। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে নেতারা বলেন, ভয় দেখিয়ে বা অস্ত্রের ভাষায় কথা বলে ছাত্রশিবিরকে শিক্ষার্থীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। ছাত্রশিবির সবসময় ইতিবাচক ও ছাত্রবান্ধব রাজনীতির চর্চা করে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে অগ্রসৈনিক হিসেবে কাজ করে যাবে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা বা হল দখলের খায়েশ মেটাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন বলি হতে দেওয়া হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়। তারা আরও বলেন, আদর্শিক লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে যারা অস্ত্রের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। শিক্ষার্থীদের দোয়া ও ভালোবাসাই তাদের মূল শক্তি, যা কোনো পেশিশক্তির কাছে মাথানত করবে না। বিবৃতিতে অবিলম্বে হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। অন্যথায় ছাত্রসমাজকে সঙ্গে নিয়ে দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। প্রশাসনকে সতর্ক করে বলা হয়, অপরাধীদের রক্ষার পুরোনো চাটুকারিতা পরিহার না করলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায়ভার তাদেরই নিতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সরকারের প্রতি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিবাদে ঢাবিতে শিবিরের মিছিল: সংঘর্ষের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়ে হলপাড়া প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ডাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ছাত্রদলের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, যাঁরা ছাত্রলীগের, আওয়ামী লীগের দেখানো রাস্তায় দলের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তাঁদের পরিণতিও ঠিক আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মতোই হতে চলেছে। তিনি বলেন, এই ক্যাম্পাসে নতুন করে কোনো দখলদারত্বের সুযোগ রাখা হবে না। নতুন সরকার গঠন করার পরে আওয়ামী লীগের অফিস নতুন করে খুলে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে নতুন করে ছাত্রলীগের আনাগোনা বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষমতায় এসেই মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক থাকে, সেই রাষ্ট্রের মানুষকে রাস্তায় নামতে হয় না। আপনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ১২টা বাজিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা ছাত্রদলকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই, নতুন করে এই হল দখলের রাজনীতি আর সন্ত্রাসের রাজনীতি ফিরিয়ে আনার দুঃসাহস দেখাবেন না। এর পরিণতি ছাত্রলীগের মতো ভোগ করতে হবে। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ আরও বক্তব্য দেন ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন খান।

ছাত্রদলের দাবি: তবে এ ঘটনায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন তাদের দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে অভিযোগ করে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ছাত্রশিবিরের লোকজন অস্ত্র নিয়ে লতিফ হলের ভেতরে ঢুকে ছাত্রদল নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, হামলার সময় ছাত্রদলের এক কর্মীকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছর ধরে ছাত্রদলের রক্ত ঝরছে, এখন আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কিছু গণমাধ্যম এই ঘটনাকে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী বনাম ছাত্রদল’ হিসেবে প্রচার করে প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা করছে। তারা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।