ভেনিজুয়েলায় হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে ইরান, রাশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ। তারা এটাকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কলম্বিয়ার অনুরোধে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদের এই বৈঠক ডাকা হয়েছে। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। রয়টার্স, নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিনহুয়া, নিউ ইয়র্ক টাইমস, এপি ,সিএনএন ।

ভেনেজুয়েলায় হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরান ও রাশিয়া। ইরানের ভাষ্য, এই হামলা ভেনেজুয়েলার জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হামলাকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র আগ্রাসন বলে অভিহিত করেছে। রাশিয়া জানায়, এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য যে কোনো অজুহাত ভিত্তিহীন। আরও উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধ করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে মস্কো।

চীন নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এ ঘটনা সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং মাদুরোর বিরুদ্ধে স্পষ্টতই বলপ্রয়োগ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি-প্রধান কাজা ক্যালাস বলেছেন, আমরা ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সব পক্ষকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, ইইউ বারবার বলেছে, মাদুরোর শাসনের বৈধতার অভাব রয়েছে। সব পরিস্থিতিতে সবাইকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, আমার দেশ ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় জড়িত ছিল না। আমি ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে এবং কী ঘটেছে তার সম্পূর্ণ তথ্য জানতে চাই। আমি স্পষ্ট করে বলতে পারি, আমরা এ হামলায় জড়িত ছিলাম না। জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

এদিকে হুমকি আগেই দিয়ে রেখেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অপেক্ষায় ছিলেন ঠিক সময়ের । গত শুক্রবার রাতকে বেছে নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ভেনেজুয়েলায় হামলা চালান। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিয়ে আসেন যুক্তরাষ্ট্রে। ওই ঘটনায় বিশ্ব নেতারা উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছেন।

মার্কিন বিমান বাহিনীর হামলা ও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক ইস্যুতে সরব থাকতে দেখা গেছে চীনকে। তারা ইতোমধ্যে লম্বা এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে বেইজিং।

বিবৃতিতে চীন বলছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি এবং জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে, ভেনেজুয়েলার সরকার উৎখাতের চেষ্টা বন্ধ করতে এবং সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে।’

সংলাপের কথা জানিয়েছে রাশিয়াও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে ‘তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে এবং একটি সার্বভৌম দেশের বৈধভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও তার জীবনসঙ্গীকে মুক্ত করে দিতে’। ক্রেমলিন বলেছে, ভেনেজুয়েলা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘সংলাপ’ প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রখ্যাত যুক্তরাজ্য এই ঘটনার নিন্দা জানায়নি। বরং তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে স্বৈরশাসক বলছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কির স্টারমার বলেছেন, ‘আমরা মাদুরোকে অবৈধ রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করি এবং তার শাসনের শেষ নিয়ে আমরা কোনো দুঃখ প্রকাশ করছি না। যুক্তরাজ্য সরকার পরিস্থিতির বিবর্তন নিয়ে আগামী দিনে মার্কিন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করবে। কারণ আমরা ভেনেজুয়েলার জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো একটি বৈধ সরকারের কাছে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের চেষ্টা করছি।’

তবে জাতিসংঘ এটিকে বিপজ্জনক নজির হিসেবে অভিহিত করেছেন। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যে নিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মানবোধের অভাব মহাসচিবকে শঙ্কিত করে তুলেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।

মালয়েশিয়াও এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা জানিয়েছেন। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। বামপন্থি স্বতন্ত্র এই সিনেটর বলেছেন, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বিশ্ব কোনোটাকেই আর নিরাপদ রাখবে না। তবে জাপান মনে করে আমেরিকা ঠিক পথই বেছে নেবে।

এছাড়া ভেনেজুয়েলায় হামলা করে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়া ও ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র মতে, আহ সোমবার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। কলম্বিয়ার অনুরোধে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদের এই বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, কোনও সার্বভৌম রাষ্ট্রে সামরিক হস্তক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গত অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে দু’বার বৈঠক করেছিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। তবে সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল ও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। সম্প্রতি ট্রাম্প ভেনিজুয়েলা প্রসঙ্গে বলেছেন, যতদিন না ভেনেজুয়েলায় একটি নিরাপদ, সঠিক ও সুবিবেচিত ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা যায়, ততদিন ওয়াশিংটন দেশটি পরিচালনা করবে। তবে ভেনেজুয়েলার প্রশাসন পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের কাঠামো বা পদ্ধতি অনুসরণ করবে, সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি।

ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মোনকাদা শনিবার নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি একে ঔপনিবেশিক যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করে। তিনি বলেন, এটি ভেনেজুয়েলার জনগণের দ্বারা স্বাধীনভাবে নির্বাচিত প্রজাতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা ধ্বংস করার চেষ্টা। অপর দিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, এটি কোনও শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা নয়, এটি ন্যায়বিচার। মাদুরো ছিলেন একজন অভিযুক্ত ও অবৈধ স্বৈরশাসক, যিনি একটি ঘোষিত মাদক-সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যার কর্মকাণ্ডে মার্কিন নাগরিকরা নিহত হয়েছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সোমবারের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মার্কিনঅভিযানে নিহত ৪০ : ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনার লক্ষ্যে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। এমনটাই দাবি করেছেন ভেনেজুয়েলার একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা । নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসদস্য উভয়ই রয়েছেন। রাতে প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

ভেনেজুয়েলার একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। তবে এখনও নিহতদের পরিচয় বা বিস্তারিত সংখ্যা সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংবাদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে ব্যাপক আকারের বিমান হামলা চালায়। প্রথম ধাপে ভেনেজুয়েলার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে অভিযান পরিচালিত হয়, যাতে পরে স্থলবাহিনী নামানো সহজ হয়।যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানান, ১৫০ টিরও বেশি মার্কিন সামরিক বিমান ভেনেজুয়েলার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার কাজে অংশ নেয়, যাতে সামরিক হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সেনা নামিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অবস্থানে আক্রমণ চালানো যায়। সংবাদে আরও বলা হয়েছে, এ অভিযানে কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন এবং অভিযানের পূর্ণ পরিসর কী ছিলসে বিষয়ে এখন পর্যন্ত হোয়াইট হাউজ বা পেন্টাগনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও বক্তব্য দেওয়া হয়নি। হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কেও মার্কিন কর্তৃপক্ষ সরাসরি কোনও নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন কারাগারে মাদুরো : ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্টুয়ার্ট বিমানঘাঁটি থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিন বরোতে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) রাখা হয়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। হোয়াইট হাউজের রর্‌্যাপিড রেসপন্স অ্যাকাউন্ট থেকে এক্স-এ প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ডিইএ) কর্মকর্তারা মাদুরোকে একটি করিডোর দিয়ে হেঁটে নিয়ে যাচ্ছেন।

ব্রুকলিনের এমডিসি কারাগারটি যুক্তরাষ্ট্রের হাই-সিকিউরিটি কারাগারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।অতীতে একাধিক আলোচিত ও হাইপ্রোফাইল বন্দিকে রাখা হয়েছে।তাদের মধ্যে রয়েছেন জেফরি এপস্টেইনের সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল, সংগীত জগতে আলোচিত পি ডিডি । ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে বন্দি করে যুক্তরাষ্ট্রের স্টুয়ার্ট এয়ার ফোর্স বেস সামরিক ঘাঁটিতে আনা হয়। সেখান থেকে তাকে নিউ ইয়র্কে মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ডিইএ) দফতরে নেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অস্ত্র সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে তাকে ব্রুকলিনের এমডিসি কারাগারে পাঠানো হয়। মাদুরো অতীতে একাধিকবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজেকে কোনও মাদক কার্টেলের নেতা হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে বিচারকের সামনে হাজির করা হবে। তবে ঠিক কবে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী সপ্তাহে ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত মামলায় মাদুরোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। এর আগ পর্যন্ত তাকে এমডিসিতেই আটক রাখা হবে। এদিকে মাদুরোর স্ত্রীর বর্তমান অবস্থান ও আটক রয়েছেন কি না সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও তথ্য জানা যায়নি। উল্লেখ্য, নিউ ইয়র্ক সিটির একমাত্র ফেডারেল কারাগার এমডিসি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এই কারাগারে সহিংসতা, কঠোর বন্দিজীবন এবং পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব নিয়ে একাধিক

মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিতে কোর টিম গঠন : ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা হঠাৎ ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জটিল এই অভিযানের পরিকল্পনা চলছিল কয়েক মাস ধরেই। ছিল অভিযানের পুঙ্খানুপুঙ্খ মহড়াও। রাজধানী কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জায়গায় গত শনিবার রাতে ‘বড় পরিসরে’ হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে আনা হয়। মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি আটককেন্দ্রে আছেন। ফ্লোরেসের অবস্থান নিশ্চিত জানা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় জানান, প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ধরতে এক ‘দুঃসাহসিক অভিযান’ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জানানো হয়, সামরিক বাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ মার্কিন এলিট সেনারা মাদুরোর ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ আবাসস্থল থেকে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে আনেন।

সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ মার্কিন এলিট সেনারা মাদুরোর ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ বাসস্থলের একটি হুবহু প্রতিকৃতি তৈরি করেছিলেন। অত্যন্ত সুরক্ষিত সেই বাসভবনে তারা কীভাবে প্রবেশ করবেন, তার অনুশীলনও চালিয়েছিলেন সেনারা।

একটি সূত্রের তথ্যমতে, ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য একটি ‘কোর টিম’ গঠন করেছিলেন। তারা কয়েক মাস ধরে নিয়মিত, কখনো কখনো প্রতিদিন বৈঠক ও ফোনে আলাপ করেছেন। এ বিষয় নিয়ে তারা প্রায়ই প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি ছোট দল গত আগস্ট মাস থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল। তারা মাদুরোর জীবনযাত্রার ধরণ সম্পর্কে এমন গভীর ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিল, যা তাকে ধরার কাজটি সহজ করে দেয়।

অন্য দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, সিআইএর একজন ‘অ্যাসেট’ বা তথ্যদাতা ছিলেন, যিনি মাদুরোর খুবই ঘনিষ্ঠ। ওই ব্যক্তি মাদুরোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন। অভিযান চলাকালে তার একবারে সঠিক অবস্থানের তথ্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ বললেন মামদানি : ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে মার্কিন বাহিনীর তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। এই অভিযানকে ‘ সরাসরি ক্ষমতা পরিবর্তনের অপচেষ্টা আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতা করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি ফোন করেছেন তিনি। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে। গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র মামদানি সাংবাদিকদের বলেন, আমি প্রেসিডেন্টকে ফোন করেছি এবং এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমার আপত্তির কথা সরাসরি তাকে জানিয়েছি।

তিনি আরও জানান, তার এই প্রতিবাদের মূলে রয়েছে ক্ষমতা পরিবর্তনের চেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান। তিনি মনে করেন, এই পদক্ষেপ ফেডারেল এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি, যা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে মেনে চলা উচিত। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে মামদানি বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান এবং মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউ ইয়র্ক সিটিতে ফেডারেল কারাগারে বন্দি করার পরিকল্পনা সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছে।

মামদানি সতর্ক করে বলেন, একতরফাভাবে একটি সার্বভৌম দেশের ওপর আক্রমণ করা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল এবং এটি ফেডারেল ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই পরিবর্তনকে তিনি একটি ‘বিপজ্জনক পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। মামদানি সতর্ক করে বলেছেন, এই অভিযানের প্রভাব শুধু ভেনেজুয়েলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; নিউ ইয়র্কে বসবাসরত হাজার হাজার ভেনেজুয়েলান নাগরিকও এর ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তিনি বলেন, আমার প্রধান লক্ষ্য হলো তাদের এবং প্রত্যেক নিউ ইয়র্কবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৩ জানুয়ারি ভোরেভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গেছে মার্কিন বাহিনী। আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানের আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ : ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ও অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে আনার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

যুদ্ধবিরোধী স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড–ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন সাধারণ মানুষ। কারও কারও হাতে ভেনেজুয়েলার পতাকাও দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, বোস্টন, মিনেপোলিসসহ বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরসকে আটকের তথ্য ঘোষণা করার পর জানান, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই কাজ অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়।